মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগ, দিলেন খোলাচিঠি

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর পদত্যাগ করেছেন কমিশনের সদস্যরা।

পদত্যাগের পর তাঁরা একটি খোলাচিঠিও লিখেছেন, যেখানে এই অধ্যাদেশ বাতিলে নতুন সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেছেন, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় “স্বয়ংক্রিয়ভাবেই” আগের কমিশন আর নেই।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনরায় চালু হলো।

সংসদ অধ্যাদেশটি বাতিলের পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ কমিশনের সদস্যরা।

বিদায়ী কমিশনের সদস্য নূর খান অবশ্য বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের পদত্যাগ করতে বলা হয়নি। তবে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রাখা হয়েছে তাঁদের।

তিনি আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু তাঁরা আগের অধ্যাদেশের পরই দায়িত্ব পেয়েছিলেন, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাঁদের পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই পদত্যাগ করাকেই সমীচীন মনে করেছেন তাঁরা।

খোলা চিঠিতে বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে।

তবে কমিশন সদস্যদের ‘খোলাচিঠি’ তিনি পড়েননি বলে জানান কুদরত–ই–ইলাহী।

খোলাচিঠিতে যা আছে

বিদায়ী কমিশনের সদস্যরা এই খোলা চিঠির দেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে চিঠিটি শুরু করেছেন। চিঠির শুরুতে লেখা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন– “এখন আমাদের কী হবে?” তাঁদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।’

‘কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’

চিঠিতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তিসমূহ’ এবং ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা’—এমন তিন উপশিরোনামে নিজেদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বিদায়ী কমিশনাররা।

তাঁরা দাবি করেছেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটির যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংসদে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে আসবে।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০০৯ সালে মানবাধিকার কমিশন আইনটি হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রয়াসে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই অধ্যাদেশটি বাতিল হলো।

আরও পড়ুন

অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ভুল কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে খোলাচিঠিতে দাবি করেন বিদায়ী কমিশনাররা। তাঁরা মানবাধিকার অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এব্ং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ নিয়ে সমন্বিত একটি বক্তব্য দেন।

চিঠিতে বলা হয়, সংসদে বলা হয় যে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর কারাদণ্ড, অথচ গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ পাস করে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করলেও প্রকৃত অর্থে ভবিষ্যতে জুলাই যোদ্ধারা মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

কমিশন সদস্যরা বলেছেন, এক দিকে বলা হচ্ছে, যাচাই–বাছাইয়ের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী আইন প্রণীত হবে, অন্যদিকে বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে নথিভুক্ত সরকারের প্রকৃত আপত্তিগুলো মানলে অনিবার্যভাবে ২০০৯ সালের মতো দুর্বল আইন হবে, যা জন্মলগ্ন থেকে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।

Open Letter_NHRC former commissioners BN.pdf

২০০৯ সালের আইনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ে কমিটিতে সরকারি দলের প্রাধান্য ছিল। বাছাই কমিটি ছিল স্পিকারের সভাপতিত্বে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে রাখা হয়েছিল প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে একজন অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার সুযোগও তৈরি করা হয়।

আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনের ছিল না। অধ্যাদেশে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

এখন অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় মানবাধিকার কমিশনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে বলে সমালোচনা উঠেছে।

দুই মাসেই বিদায়

অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার একেবারে শেষ দিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করেছিল।

চেয়ারম্যান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হাইকোর্টের সাবেক বিচারক মইনুল ইসলাম চৌধুরী গুম কমিশনের প্রধান ছিলেন। সদস্য মো. নূর খান, নাবিলা ইদ্রিসও গুম কমিশনের সদস্য ছিলেন। শরিফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক, ইলিরা দেওয়ান ও মানবাধিকারকর্মী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সরকারের সময়ে গঠিত কমিশন টিকে ছিল নভেম্বর মাস পর্যন্ত।

ওই বছরের ৭ নভেম্বর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে যান। তাঁরা দিনভর সেখানে থাকেন। সন্ধ্যার দিকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমদ, সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজা এবং অন্য চার সদস্য বিশ্বজিৎ চন্দ, অধ্যাপক তানিয়া হক, আমিনুল ইসলাম ও কংজুরী চৌধুরী। আরেক সদস্য কাওসার আহমেদ এর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।

কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘জোর করেই’ এসব সদস্যকে পদত্যাগ করানো হয়।

এরপর দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগ বন্ধ ছিল। এরপর জারি হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদে তা চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। সেই অধ্যাদেশের আলোকেই চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সদ্য বিদায়ী সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।