নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা
আগামী ৩৫ বছরে আমেরিকার সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হবে বাংলাদেশিরা: রেহমান সোবহান
উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আয়োজন ‘৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চার দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ‘যত বই তত প্রাণ’। মেলা চলবে আগামী সোমবার (২৫ মে) পর্যন্ত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে।’ দেশের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সঠিক ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।’
বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহানকে মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা ও আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।
বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, তাঁদের প্রজন্মের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ধারণা ভিত্তিমূলের মতো দৃঢ় ছিল; কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তিনি বাংলা বই অনুবাদের একটি বড় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন। এর আগে স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক সংস্থা মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিৎ সাহাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। ১৯৯২ সালে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নিউইয়র্কে এই বইমেলার সূত্রপাত হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
গুণীজন স্মরণ ও সাংস্কৃতিক অধ্যায়
ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাদ্য ও রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে প্রাক্-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। উদ্বোধনী দিনে ছিল আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও বিশেষ স্মরণানুষ্ঠান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির তিন ব্যক্তিত্ব মহাশ্বেতা দেবী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও তপন রায়চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
মেলায় বাংলাদেশ ও কলকাতার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিয়েছে। অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক বলেন, ‘নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা এখন শুধু বই বিক্রির আয়োজন নয়; বরং এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আবেগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।’
মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন (নিউইয়র্ক), ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রথমা প্রকাশন, আহমেদ পাবলিশার্স, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, অঙ্কুর প্রকাশনী, অন্বয় প্রকাশ, কথাপ্রকাশ, কবি প্রকাশনী, নালন্দা, বাতিঘর, গ্রন্থকুঠির ও জলধি।
চার দিনের এ আয়োজনে প্রতিদিন থাকছে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং প্রবাসী সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা।
বাংলাদেশ, ভারত ও উত্তর আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা) বিশিষ্ট লেখক, কবি ও শিল্পীরা এতে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, দীপেন ভট্টাচার্য, তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, সাদাত হোসাইন, মনিরুল হক, মোস্তফা সারওয়ার, জাফর আহমদ রাশেদ, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, ফারুক আহমেদ, রোকেয়া হায়দার, ফেরদৌস সাজেদীন, খোরশেদুল ইসলাম, আশরাফ কায়সার, গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, রাজু আলাউদ্দিন, সৈয়দ জাকি হোসেন, বিরূপাক্ষ পাল, নজরুল মিন্টু, আশরাফ আহমেদ, মহিতোষ তালুকদার প্রমুখ।