বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে সুপারিশ, ভোক্তার বিরোধিতা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তন, ঢাকা; ২০ মে ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গঠিত কারিগরি কমিটি। পাইকারি দাম বাড়লে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়াতে হবে। এটি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে ভোক্তা প্রতিনিধিরা বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের অযৌক্তিক খরচ ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এমন দাবি করা হয়েছে। আজ বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ শুনানির আয়োজন করে বিইআরসি।

গণশুনানিতে বক্তারা বলেন, একের পর এক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প করে খরচ বাড়িয়েছে পিডিবি, যা কাজে লাগছে না। এতে তাদের ঘাটতি বেড়েছে; এ দায় ভোক্তার নয়।

সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কমে সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে কোম্পানি চালায়। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের খুচরা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে শুনানির কথা রয়েছে।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। এটি মূল্যায়ন করে কারিগরি কমিটি বলেছে, বর্তমান দামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে পিডিবির ঘাটতি হবে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। এটি মেটাতে হলে ভারিত গড়ে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ দাম বাড়ানো প্রয়োজন। তবে আগের ধারাবাহিকতায় সরকারের ভর্তুকি বিবেচনায় নিয়ে মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। বর্তমান দামে পিডিবির ঘাটতি হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা।

গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এটি পড়ে শোনানো হয় শুনানিতে। এতে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের (বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া) বোঝা সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো উচিত নয়।

শুনানি শেষে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকির পরিমাণ জানতে চাইবে বিইআরসি। সরকারের ভর্তুকি জানার পর বাকি ঘাটতি সমন্বয়ে দাম বাড়ানো হতে পারে। আগামী জুন থেকেই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। এ নিয়ে কোনো মত দেয়নি কারিগরি কমিটি।

তবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) লাভজনক ২১টি সমিতির জন্য আলাদা পাইকারি দাম নির্ধারণের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে কারিগরি কমিটি। একইভাবে আরইবির বড় গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জ পিডিবিকে দেওয়ার প্রস্তাবেরও যৌক্তিকতা দেখছে না কমিটি। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয় বলে পিডিবির প্রস্তাবিত মাল্টি ইয়ার ট্যারিফ (কয়েক বছরের দাম) নির্ধারণের প্রস্তাব আমলে নেয়নি কমিটি।

দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে

গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এটি পড়ে শোনানো হয় শুনানিতে। এতে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের (বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া) বোঝা সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো উচিত নয়।

সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়ে ভোক্তাদের লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প, কৃষি, পরিবহনে খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে, তাদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে।

গণশুনানিতে অংশ নেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তন, ঢাকা;  ২০ মে ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

দেড় দশক ধরে গণশুনানিতে নিয়মিত হাজির হয়ে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। বর্তমান কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তিনি শুনানি বর্জন করেছেন। তবে শুনানিতে অধিকাংশ বক্তার কণ্ঠে বারবার এসেছে তাঁর নাম। কমিশনের চেয়ারম্যানও শামসুল আলমের অনুপস্থিতির কথা স্মরণ করেছেন।

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, জ্বালানি উপদেষ্টা বর্জন করেছেন। প্রান্তিক মানুষের কথা চিন্তা করে দাম বাড়ানো উচিত নয়। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার ভর্তুকি দেয় জনগণের টাকা থেকে। সরকারের মুনাফা করার চিন্তা থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিইআরসির উচিত দেশের স্বার্থে কাজ করা। ভোক্তাদের পক্ষ থেকে দাম কমানোর শুনানি আয়োজনের দাবি করেন সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, গণশুনানি মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে। জনগণের ওপর দাম বাড়ানোর প্রভাব হবে মূল আলোচনার বিষয়; অথচ প্রস্তাবে এটি নেই। দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বিইআরসিও জনস্বার্থ দেখে না। কোনো অজুহাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। বিদ্যুতের দাম বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, মানুষের অবস্থা ভয়াবহ হবে।

তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে তৈরি পোশাক। এমনিতেই রপ্তানি কমছে। তাই বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎকেন্দ্র না চলায় সঞ্চালনের আয় কমে

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিয়ে বিতরণ সংস্থার কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসি। লোকসান ঠেকাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের চার্জ ১৮ পয়সা বাড়ানোর দাবি করেছে তারা। এটি প্রায় ১৪ পয়সা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে বিইআরসির কারিগরি কমিটি। তবে পিজিবি পিএলসির কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ভোক্তারা।

পিজিবি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশীদ বলেন, বিতরণ সংস্থার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আর নতুন নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নিতে প্রকল্প তৈরি করা হয়। পায়রা থেকে একটা নতুন লাইন করার চাপ আছে, ১০০ কোটি ডলার খরচ হবে। মাতারবাড়ি থেকে আরেকটা প্রকল্প করার চাপ আছে। পিজিবি নিজ থেকে প্রকল্প করে না। প্রতিনিয়ত পিডিবির থেকে চাহিদা আসতেই থাকে। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায়ই বন্ধ থাকে। এতে সঞ্চালন লাইন অব্যবহৃত পড়ে থাকে; আয় কমে পিজিবির।

এর জবাবে ভোক্তা প্রতিনিধি শুভ কিবরিয়া বলেন, পিজিবি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে কার অনুমতিতে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিইআরসিকে জানানোর কথা, সেটা জানানো হয়নি। তাহলে কেন এ দায় ভোক্তা নেবে।

প্রথম দিনের শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, পাওয়ার গ্রিডের চলমান সব প্রকল্পের ব্যয় হিসাবে নেওয়া হয়নি। যতটুকু খরচ হয়েছে, ততটুকুই হিসাবে নেওয়া হয়েছে। সবার অংশগ্রহণ শুনানিকে ফলপ্রসূ করেছে। কাল খুচরা দামের শুনানি হবে। এরপরও কেউ চাইলে লিখিত মতামত দিতে পারবে। সবার মতামত ও বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।