গুলিবিদ্ধ শিশু সুশান্নার সিটিস্ক্যান সম্পন্ন, চিকিৎসা চলছে
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ শিশু সুশান্না ত্রিপুরার সিটিস্ক্যান করানো হয়েছে। আজ রোববার দুপুরে হাসপাতালেই তাঁর সিটিস্ক্যান করান চিকিৎসকেরা। তার মাথায় ও বুকে ছররা গুলি লেগেছে। গতকাল কান্নার জন্য তার পরীক্ষা করানো যায়নি।
সুশান্নার ভাই অনন্ত ত্রিপুরাও হাসপাতালে ভর্তি আছে। তারও চিকিৎসা চলছে। সুশান্না ত্রিপুরা ও অনন্ত ত্রিপুরা হাসপাতালে আসে গত শুক্রবার সন্ধ্যায়। তাদের বাড়ি রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা সাইজামপাড়ায়।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ পাড়ায় দুর্বৃত্তের গুলিতে তিনজন নিহত হন। এর মধ্যে এই দুই শিশুর বাবা সুভাষ ত্রিপুরা ও দাদা বিছাই চন্দ্র ত্রিপুরা আছেন। আরেকজন হলেন এলাকার বাসিন্দা ধনরাং ত্রিপুরা।
সুশান্না ত্রিপুরার মা রুংদতি ত্রিপুরা হাসপাতালে বিছানায় বসে আজ প্রথম আলোকে বলেন, ব্যথার জন্য কান্না থামানো যাচ্ছিল না এক বছর চার মাস বয়সী সন্তান সুশান্নার। আজ ঘুমের ওষুধ দিয়ে সিটিস্ক্যান করানো হয়েছে। রিপোর্টও পাওয়া গেছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁরা চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা বলেন, সুশান্নার বুকে ও মাথায় ছররা গুলি রয়েছে। এক্স-রে করানো হয়েছে। সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাইজামপাড়ায় এ হামলার জন্য পাহাড়ের নতুন সংগঠন কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) দায়ী করেছেন স্থানীয় লোকজন। অন্যদিকে কেএনএফের ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়, ‘সাইজাম পাড়ায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ক্যাম্পে সফলভাবে হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় তিন জেএসএস সদস্য মারা গেছেন।’
সাইজামপাড়া বড়থলির সবচেয়ে দুর্গম এলাকা। হামলার পর থেকে এখনো পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
আজ রোববার সকালে সেখানে পুলিশের যাওয়ার কথা বলে গতকাল জানিয়েছিলেন রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ আহমেদ। তবে আজ সকালে তাঁকে কয়েকবার ফোন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার দুই শিশুর মা রুংদতি ত্রিপুরা সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন প্রথম আলোকে। তিনি বলেছিলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বাসার উঠানে হামাগুড়ি দিয়ে খেলছিল সুশান্না ত্রিপুরা। তার বয়স এক বছর চার মাস। সঙ্গে ছিল তার ভাই অনন্ত ত্রিপুরা। এমন সময় ২৫ থেকে ৩০ ব্যক্তি এসে বাসায় এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
সুশান্না ও অনন্তের মাথায়, বুকে ও চোয়ালে ছররা গুলি লাগে। ঘটনার সময় বাসার পাশেই গোসল সারছিলেন তাঁর স্বামী সুভাষ ত্রিপুরা (২২)। বাসায় ছিলেন শ্বশুর বিছাই চন্দ্র ত্রিপুরাও। গুলিতে তাঁরাও নিহত হন। আর তিনি রান্নাঘরে থাকায় বেঁচে যান। পরে দুই সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে পালিয়ে হাসপাতালে চলে আসেন।
সংঘাতের ভয়ে পাড়া ছেড়েছিলেন সাইজামপাড়াবাসী
বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়নের সাইজামপাড়ার বাসিন্দাদের দাবি, কেএনএফ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এর সদস্যরা সাইজামপাড়ার আশপাশে অবস্থান নিয়ে আছেন। গত ১৬ এপ্রিল সেখানে গোলাগুলি হয়। গোলাগুলির পর পাড়ার সবাই চলে যান বিভিন্ন জায়গায়। ত্রিপুরারা চলে যান ফারুয়া গ্রামে। কিন্তু তাঁরা সঙ্গে করে কিছুই নিয়ে যেতে পারেননি। ধান, গরু, ছাগল, চাষের জিনিসপত্র—সবই পড়ে ছিল গ্রামে। মূলত হামলার ভয়ে তাঁরা গ্রাম ছেড়েছিলেন।
বড়থলি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা ও নিহত ধনরাং ত্রিপুরার ভাই বীর কুমার ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, বড়থলি ইউনিয়নের সাইজামপাড়ায় ২২ পরিবারের বসবাস। তাঁদের মধ্যে আছেন খেয়াং, বম, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা। উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম এলাকা বড়থলি ইউনিয়নের সাইজামপাড়া।
বীর কুমার ত্রিপুরা বলেন, তাঁরা ভেবেছিলেন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেছে। আর কোনো সমস্যা হবে না। এ কারণে জুনের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা দুই পরিবার (রুংদতির পরিবারসহ) সাইজামপাড়ায় চলে আসেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। ফিরে এসেই খুন হন তাঁর ভাই ও আত্মীয়রা। মঙ্গলবার হঠাৎ হামলা চালানো হয়। এখন তাঁরা পালিয়ে আছেন।
ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বীর কুমার ত্রিপুরা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন তাঁর ভাই ধনরাং ত্রিপুরা, বাবা চিতারাং ত্রিপুরা, মা সজরুং ত্রিপুরা ও মামি পূর্বতি ত্রিপুরা।
তাঁর বাবা, মা ও মামি ওই দিন ঘরের উঠানে বসে কথা বলছিলেন। বাসার পেছন থেকে এসে গুলি ছোড়েন ওই ব্যক্তিরা। গোলাগুলি শুরু হলে তাঁরা সবাই সামনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সবাই বেঁচে গেলেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ভাই ধনরাং ত্রিপুরা। তাঁরা লাশও আনতে পারেননি। ঘটনার পর থেকেই এলাকাছাড়া। লাশ পড়ে আছে সাইজামপাড়ায়।