চট্টগ্রাম নগরের বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থান সম্প্রতি ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় টানা সাত দিন পানিতে ডুবে ছিল। বৃষ্টি থামার তিন দিন পরও এসব এলাকা থেকে পানি নামেনি। এভাবে পানি জমে থাকার পেছনে খালে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, খাল ভরাট হয়ে যাওয়াসহ ছয়টি কারণ খুঁজে পেয়েছে জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটি। সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করায় গত বুধবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (সিডিএ) বিভিন্ন সেবা সংস্থা এক জরুরি সভায় বসে। সভায় জলাবদ্ধতার কারণ খুঁজতে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে। কমিটি গতকাল শনিবার কাজ শুরু করেছে। প্রথম দিন কমিটির সদস্যরা নগরের জলাবদ্ধপ্রবণ বাকলিয়া এলাকা ঘুরে দেখে কারণগুলো চিহ্নিত করেন।
কমিটির প্রধান কাজী হাসান বিন শামসের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সদস্য সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিটির সভাপতি মোবারক আলী, সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনের সবচেয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও প্রকল্প পরিচালক মো. শাহ আলী। এ সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সিটি করপোরেশনের মেয়রের একান্ত সচিব ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুহাম্মদ আবুল হাশেম ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা।
চট্টগ্রাম নগরে ১৬ জুন ভারী বর্ষণ শুরু হয়। থেমে থেমে এই বর্ষণ চলে ২০ জুন পর্যন্ত। টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে এবার নগরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ডুবে যায়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পূর্ব ষোলশহর, পূর্ব বাকলিয়া, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, চকবাজার ও চাক্তাই ওয়ার্ডের কিছু এলাকায় পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত পানি জমে ছিল। এসব ওয়ার্ডে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস করেন। ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
বাকলিয়ার ওয়াজের পাড়া, পুলিশ বিট ও বজ্রঘোনা এলাকায় এবার প্রথম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পূর্ব ষোলশহরের বহদ্দারহাটে অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বাড়িও পানিতে তলিয়ে যায়।
জলাবদ্ধতার যত কারণ ও সুপারিশ
কমিটি বাকলিয়া এলাকায় পানি জমে থাকার কারণগুলো চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এই প্রতিবেদনের নথি প্রথম আলোর হাতে এসেছে।
কমিটির চিহ্নিত করা সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব বাকলিয়ার কৃষি খালের জায়গা দখল করে চারটি পাকা ও আধা পাকা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ। এসব স্থাপনা সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত অপসারণের সুপারিশ করেছে কমিটি।
নগরের পানিনিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম রাজাখালী খালের শাখা কৃষি খাল–১ ও কৃষি খাল–২ ভরাট হয়ে গেছে। নাব্যতা না থাকায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে আজ রোববার থেকে সিটি করপোরেশনের ১০০ শ্রমিক ময়লা–আবর্জনা ও কাদা অপসারণের কাজ করবেন।
নগরের বীর্জা খাল ও রাজাখালী খালের সংযোগস্থলে দেওয়া বাঁধ খুলে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া রাজাখালী খালের ৫ নম্বর ব্রিজের পাশে খালে দেওয়া বাঁধ যেটুকু উন্মুক্ত করা হয়েছে, তা পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মত দেন কমিটির সদস্যরা। উন্মুক্ত অংশের পরিমাণ আরও চার গুণ করার পরামর্শ দেন তাঁরা। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই কাজ শেষ করতে হবে। কাজটি করবে সিডিএ।
চাক্তাই ডাইভারশন খালের তক্তার পোল এলাকায় সেতু নির্মাণের জন্য দেওয়া খুঁটি অপসারণ না করার কারণে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন এগুলো অপসারণের পাশাপাশি এ অংশে খালের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য খননকাজ করতে হবে। এ কাজ করবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
এদিকে চন্দনপুরায় নির্মাণাধীন বাকলিয়া সংযোগ সড়কের জন্য চাক্তাই খালের ওপর নির্মিত সেতুর নিচ থেকে মাটি অপসারণ করা প্রয়োজন। সিডিএ এই কাজ করবে।
কমিটির অন্যতম সদস্য ও সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিটির সভাপতি মোবারক আলী বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করে কমিটি কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার পানিপ্রবাহ নির্বিঘ্ন করতে কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও সিডিএ নিজ নিজ অংশের কাজগুলো করবে। তিন দিনের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কাজ হলে এ এলাকাগুলোতে পানি আর বেশিক্ষণ জমে থাকবে না বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। একটি প্রকল্পও নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেনি সংস্থাগুলো। বারবার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।