ব্যবসা সহজ করতে যেসব রাজস্ব সংস্কার জরুরি
দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ‘ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ’, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এই পরিবেশ তৈরির পথে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক আইনের কী কী বাধা আছে, তা দূর করতে সবার পরামর্শ চেয়েছেন। এটি সত্যিই একটি দারুণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
সত্যি বলতে, সরকার অনেক উদ্যোগ নিচ্ছে, কিন্তু আমাদের বর্তমান রাজস্বব্যবস্থা এখনো কাগজের ফাইলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অতিরিক্ত নিয়মকানুন আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে উদ্যোক্তাদের অহেতুক সময় ও অর্থের অপচয় হয়। দেশকে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করতে হলে এই তিন খাতে (আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক) অবিলম্বে কিছু বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আনা দরকার।
আয়কর বিষয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত
১. নিরীক্ষার নামে ভয়ভীতি দূর করা
উৎসে করের নিরীক্ষা করার সময় কর্মকর্তারা অনেক সময় পাঁচ-ছয় বছরের পুরোনো হিসাব চেয়ে বসেন। এতে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন। নিয়ম করে দেওয়া উচিত, যেন শুধু চলতি বছর বা বড়জোর গত দুই বছরের হিসাব চাওয়া যায়। এ ছাড়া একবার কোনো হিসাব নিরীক্ষা বা অডিট হয়ে গেলে অন্য কোনো আইনে তা আবার তলব করা বন্ধ করতে হবে।
২. কোম্পানির কর রিটার্ন অনলাইনে
সাধারণ মানুষ এখন সহজেই অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেন। কিন্তু কোম্পানিগুলোর জন্য কাজটা এখনো বেশ সনাতনী ও কাগুজে। কাগজের বদলে তাদের কর রিটার্নও দ্রুত ও সহজে অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. করের স্বয়ংক্রিয় হিসাব
সরকারি চালান (এ-চালান) এবং ই-ট্যাক্স সিস্টেমকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক সুতায় গাঁথতে হবে। ইটিডিএস প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে সেটিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-ট্যাক্স পোর্টালের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। এতে কোম্পানিগুলো প্রতি মাসে যে কর জমা দেয়, তার হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যাবে। ত্রৈমাসিক উৎসে করের রিটার্ন প্রদানের সময় তাদের শুধু অনলাইনে ঢুকে তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখে জমা দিলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।
৪. কর ছাড়ের ব্যবস্থা অনলাইনে
যাঁরা নিয়মানুযায়ী কর ছাড় পান (যেমন আন্তর্জাতিক কর অব্যাহতি, করপোরেট কর ছাড়, দাতব্য সংস্থা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড), তাঁদের সব কার্যক্রম অনলাইনে সম্পাদন করতে হবে। কাগজের সনদের বদলে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল সার্টিফিকেট দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমাতে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি সব দপ্তরের সার্ভার (যেমন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) এপিআই সংযোগ এক থাকলে ব্যবসায়ীদের এই সনদের জন্য বারবার আবেদন করতে বা দৌড়াতে হবে না। এনবিআর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট আয়কর, মূসক ও শুল্ক সুবিধাগুলো তাদের সিস্টেমে কার্যকর করবে।
৫.ডিজিটাল কাগজপত্রের আইনি স্বীকৃতি
এখন সব ব্যবসার হিসাব কম্পিউটারে হয়। তাই কাগজে প্রিন্ট করা ভাউচারের বদলে কম্পিউটারের সফটওয়্যারে রাখা হিসাব, স্ক্যান করা কপি বা ডিজিটাল ব্যাংক বিবরনীকে আয়কর আইনে বৈধ আইনি প্রমাণ হিসেবে মেনে নিতে হবে।
মূসক ব্যবস্থায় যা করা উচিত
১. কাঁচামালের হিসাব সহজ করা
কারখানায় কোনো পণ্য বানাতে কী পরিমাণ কাঁচামাল লাগে, তার একটি হিসাব (যাকে মূসক-৪.৩ বলে) সরকারকে দিতে হয়। কাঁচামালের দাম সামান্য বাড়লে বা কমলেই নতুন করে হিসাব দিতে হতো। বাজারের এই ওঠানামার মধ্যে বারবার হিসাব দেওয়া খুব ঝামেলার। তাই দামের বদলে শুধু কাঁচামালের ‘পরিমাণটা’ উল্লেখ করার নিয়ম করা উচিত এবং ১০ শতাংশ পরিবর্তন হলে নতুন করে হিসাব দিতে হবে।
২. উৎসে করের বাইরে
এসআরও এবং আদেশের মাধ্যমে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হলে তা যেন উৎসে কর্তনের আওতাবহির্ভূত থাকে।
৩. মূসক রিটার্ন ফরম সহজ করা
মাস শেষে ভ্যাটের যে হিসাব (মূসক-৯.১) দিতে হয়, তার ফরমটি অনেক বড় ও জটিল। এটিকে অনলাইনে সহজ করে সাজাতে হবে, যাতে একজন ব্যবসায়ী শুধু তাঁর ব্যবসার জন্য যেটুকু দরকার, সেটুকু পূরণ করেই সহজে কাজ শেষ করতে পারেন। মূসক ফরম সংস্কার করে মূল্য–সংক্রান্ত কলামসমূহ বিলুপ্ত করা হোক এবং এগুলোকে শুধু ‘পরিমাণভিত্তিক স্টক রেজিস্টার’ হিসেবে ব্যবহারের বিধান করা হোক।
৪. রিফান্ড দ্রুত ফেরত
ব্যবসায়ীরা অনেক সময় নিয়ম অনুযায়ী সরকারের কাছে ভ্যাট বাবদ পাওনা টাকা (রিফান্ড) পান। কিন্তু এই টাকা ফেরত পেতে অনেক সময় লাগে। ছয় মাস ঘোরানোর বদলে এটি সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে এবং সম্পূর্ণ পদ্ধতি অনলাইনে সম্পাদন করে সরাসরি ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়ার নিয়ম করতে হবে।
৩. ঝুঁকিভিত্তিক সমন্বিত নিরীক্ষা
বর্তমান ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষাপদ্ধতি পেশাজীবীদের পরামর্শ গ্রহণ করে চূড়ান্ত করতে হবে। অনলাইনে ঝুঁকি নিরূপণ করতে শুধু সন্দেহভাজন বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অডিট করতে হবে। আয়কর ও মূসক নিরীক্ষা আলাদা আলাদা না করে কেন্দ্রীয় কর গোয়েন্দার (সিআইসি) মতো সমন্বিত নিরীক্ষা করতে হবে। এতে ব্যবসায়ীদের ও সরকারের সময় এবং ব্যয় সাশ্রয় হবে।
শুল্কব্যবস্থায় আধুনিকায়ন
১. পণ্যের সঠিক দাম নির্ধারণ
বিদেশ থেকে পণ্য আনলে শুল্কায়ন করার সময় এর দাম ধরার জন্য পুরোনো স্থানীয় হিসাবের ওপর নির্ভর করা হয়। এতে অনেক সময় পণ্যের দাম বেশি বা কম ধরা হয়ে যায়। এর বদলে আন্তর্জাতিক বাজারদরের (যেমন রয়টার্স বা প্ল্যাটস) সঙ্গে কাস্টমসের সিস্টেম সরাসরি যুক্ত করতে হবে। এতে পণ্যের সঠিক দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসবে।
২.অনিচ্ছাকৃত ভুলে ছাড় দেওয়া
বিদেশ থেকে পণ্য আনার সময় প্রতিটি পণ্যের একটি নির্দিষ্ট কোড (এইচএস কোড) দিতে হয়। অনেক সময় নতুন আমদানিকারকেরা এই কোড লিখতে ভুল করে বসেন। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য শুরুতেই কড়া জরিমানা না করে তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। এ ছাড়া পণ্য দেশে আসার আগেই কোড সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থাকে (যাকে অগ্রিম রায় বা অ্যাডভান্স রুলিং বলে) আরও সহজ করতে হবে।
৩. এক জায়গা থেকে সব সেবা
একজন আমদানিকারক বা রপ্তানিকারককে কাজের প্রয়োজনে ৩৮টির বেশি সরকারি সংস্থার কাছে দৌড়াতে হয়। এই ভোগান্তি কমাতে ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ নামের প্রকল্প দ্রুত চালু করতে হবে। এর মানে হলো এক জায়গাতেই সব দপ্তরের কাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে।
শেষ কথা
অর্থমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী উদ্যোগ সফল করতে হলে সবার আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কাগজের ফাইলের ওপর নির্ভরতা এবং অতিরিক্ত খবরদারির মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সার্ভারগুলো যদি ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে, তবে কর ফাঁকি দেওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি সৎ ব্যবসায়ীদের খরচ ও হয়রানি অনেক কমে যাবে। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক আইনের এই আধুনিক পরিবর্তনগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বের বুকে একটি স্মার্ট ও বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
• স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস