ব্যাংকগুলো এখন ঋণের বদলে ট্রেজারি বন্ডে বেশি বিনিয়োগে আগ্ৰহী
ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ঋণ আদায় করছে, তার তুলনায় নতুন ঋণ বিতরণ কম কমছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে দেশের বেসরকারি খাতে ২০০৩ সালের পর থেকে গত মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসেই বেসরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা এর আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে প্রবৃদ্ধি তারও অনেক নিচে নেমে গেছে, অর্থাৎ ঋণ বিতরণের চেয়ে আদায়ের পরিমাণ বেশি। তাঁদের মতে, ব্যাংকগুলো এখন ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, এটি তুলনামূলক নিরাপদ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও ঋণ বিতরণ কমা ও আদায় বেশি হওয়ার চিত্র দেখা গেছে। যেমন ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাংকের ঋণ থেকে আয় হয়েছে ৭ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা।
* উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় ঋণের চাহিদা কমেছে।
* ঋণের বদলে বিল-বন্ড ও বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো।
একই বছরে ব্র্যাক ব্যাংক ঋণের সুদ থেকে আয় করেছে ৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংক ঋণের সুদ থেকে ৫ হাজার ৪৭১ কোটি টাকার আয়ের বিপরীতে বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় করেছে ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ব্যবসায়ী জেলে আছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউবা বিদেশে চলে গেছেন। ব্যাংকঋণের সুদহার ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির চেয়ে সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বর্তমান বিএনপি সরকার বন্ধ কলকারখানা চালু ও এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। এসব মিলিয়ে ঋণের চাহিদা কমে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ে আস্থার ঘাটতি এবং শিল্পে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।মো. এজাজুল ইসলাম, মহাপরিচালক, বিআইবিএম
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ে আস্থার ঘাটতি এবং শিল্পে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মো. এজাজুল ইসলামের মতে, ঋণে ১০–১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে অর্থ পাচার হওয়া বা অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাওয়ার চেয়ে উৎপাদনশীল খাতে ৫ শতাংশ ঋণপ্রবাহ অর্থনীতির জন্য ভালো। তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ, উৎপাদনসক্ষমতা, প্রবাসী আয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে ঋণে আবার প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও উন্মুক্ত করতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ও মানসিক বাধা দূর করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য মেধার ভিত্তিতে পুঁজি বা ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। পাশাপাশি করহার ও পণ্যের দাম কমিয়ে মানুষের ভোগের ব্যয় বাড়াতে হবে। এতে উৎপাদন বাড়বে এবং ঋণের চাহিদাও বাড়বে।
শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় ঋণের চাহিদা কমেছে। বেসরকারি খাতের বন্ধ কারখানাগুলো চালু হতে শুরু করলে ঋণপ্রবাহে আবার গতি ফিরবে। তবে নিশ্চিত করতে হবে, অর্থের যেন অপব্যবহার না হয়।