দেশের ভালো ভালো কোম্পানি এখন পুঁজির ঘাটতিতে: অর্থমন্ত্রী

বক্তব্য দিচ্ছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীছবি: অর্থ মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

দেশের ভালো ভালো কোম্পানি এখন পুঁজির ঘাটতিতে আছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ন্যায্য প্রতিযোগিতা না থাকার কারণে এমনটা হয়েছে। ব্যাংকে টাকা রাখেন আমানতকারীরা। শেয়ারের মালিকানা থাকায় পর্ষদে বসে উদ্যোক্তারা ঋণ আবেদন মঞ্জুর করে দেন। অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি আছে।

আজ বুধবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দেশের প্রথম ‘ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং (এফএআর) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কথা বলেন। যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন: আসল গুরুত্ব কোথায়।’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দুটি অধিবেশন রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), নিরীক্ষক ও নীতিনির্ধারকেরা এতে অংশ নিয়েছেন।

প্রতিদিন কোনো না কোনো তহবিল ব্যবস্থাপক যোগাযোগ করছে, কেউ হংকং থেকে, কেউ আবার লন্ডন থেকে, জেপি মরগান থেকেও করছে। তবে জাতিগতভাবে আমরা এমন হয়ে গেছি যে মনে হয় কাল-পরশুর মধ্যেই সবকিছু করে ফেলতে হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী

স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হিসাববিদদের ‘স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ’ বা সেলফ রেগুলেশনের আহ্বান জানান। দেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউটিলাইজেশন সনদ দেওয়ার এখতিয়ার বিজিএমইএর হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে স্মরণ করেন। বিএনপির আগের সরকারের সময় তিনি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বিরুদ্ধে এ সনদ দেওয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বিজিএমইএর হাতে দেওয়ার পর থেকে তা ভালো চলছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ৭ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএর নিবন্ধন নিয়েছিল। এখন আছে ২ হাজার ৫০০টি, বাকিরা নেই, কারণ, তারা ঠিকভাবে হিসাব সংরক্ষণ করেনি। ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে হিসাব তৈরি করলে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়। উদাহরণ দিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সম্প্রতি এক তালিকাভুক্ত কোম্পানি কেনার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি দেখলেন, এর সম্পদ ও দায়ের মধ্যে অসংগতি আছে। তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় কোম্পানিটি তথ্য ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে হিসাব বিবরণী তৈরি করেছিল। তারা পুঁজিবাজার থেকে বেশি প্রিমিয়াম নেওয়ার জন্য এটা করেছিল।

হিসাব পদ্ধতি স্বচ্ছ না থাকলে বিদেশি ক্রেতারা এখন পণ্য কিনতে চান না বলেও জানান মাহমুদ হাসান খান।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে। এফআরসি, আইসিএবি ও আইসিএমএবিএর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে, তার ওপরই আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষেই প্রতিদিন গিয়ে ভুলত্রুটি ধরা সম্ভব নয়। তাই হিসাববিদদের নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সবার আগে স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা নিতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। পেছনের কারণগুলো সবারই জানা। আমরা যে জায়গায় এসেছি এবং সামনে যেখানে যেতে চাই, সে জন্য সব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হবে। এফআরসি ২০১৫ সালে গঠিত হয়েছে। এখন ২০২৬ সাল। এত বছরে এফআরসি কী করেছে, তা জানি না। তবে এত বছর দেশে যে ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে ও ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের হয়ে গেছে, তা অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা হিসাব বিবরণীর কারণে সম্ভব হয়েছে। আবার ভুয়া তথ্য দিয়ে অনেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।’

বিনিয়োগের জন্য যথাযথ হিসাবব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন কোনো না কোনো তহবিল ব্যবস্থাপক যোগাযোগ করছে, কেউ হংকং থেকে, কেউ আবার লন্ডন থেকে, জেপি মরগান থেকেও করছে। তবে জাতিগতভাবে আমরা এমন হয়ে গেছি যে মনে হয় কাল-পরশুর মধ্যেই সবকিছু করে ফেলতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘অতীতে দেখা গেছে নিরীক্ষা ফার্মগুলো নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়েছে। হিসাবরক্ষণ অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বাইরে থেকে গেছে এবং এ কারণেই আজকের সভা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের গাফিলতিগুলো পুরো অর্থনীতিকে একধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজ ব্যাংক খাতের যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, তা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।’

রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়েছেন। ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে টাকা হারিয়েছেন। শেয়ারের দাম পড়ে গেছে, বিনিয়োগকারীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। পরে দেখা গেছে, সেই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা অন্য রকম।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা জানি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত কীভাবে দুর্বল করা হয়েছে। অথবা আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংক বড় বড় আকারের ঋণ দিয়েছে। পরে তারা ঋণখেলাপি হয়েছে এবং ব্যাংক সংকটে পড়েছে। এসবের মাধ্যমে সৎ উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অসৎ প্রতিযোগীরা বেশি বেশি লাভ দেখিয়ে বিনিয়োগ খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন। এমন পরিস্থিতি দেখলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসতে চান না। আমি যদি কাউকে টাকা দিই তাহলে জানতে চাইব, তার ব্যবসার অবস্থা কেমন। আর্থিক প্রতিবেদন সেই তথ্যই দেয়, বিনিয়োগ আকর্ষণে তাই নিরীক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, যাঁর ঋণ পাওয়ার কথা নয়, তিনি ঋণ পেয়ে যান। যাঁর ঋণ পাওয়া উচিত, তিনি ব্যাংকে ব্যাংকে ঘুরছেন—এই হচ্ছে ব্যাংকের চিত্র। ব্যাংকে গেলে ঋণ পাওয়ার জন্য তাঁরা একধরনের হিসাব দেন। আবার কর দেওয়ার সময় লোকসান দেখিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেন আরেক ধরনের হিসাব। এ অবস্থা থেকে বের হতে হবে।

প্রবন্ধে যা বলা হয়

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে যোগ্যতার বদলে পরিচিতি, পারিবারিক প্রভাব কাজ করা, ভয়ভীতি ও চাপের কারণে সিইও ও সিএফওদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়া—এসবই বড় চ্যালেঞ্জ।

সংস্কারের লক্ষ্যে কী কী করা উচিত, সে বিষয়ে প্রবন্ধে বলা হয়, সংস্থাটিতে বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগ করতে হবে। আইনের অধীন বিধিমালা চূড়ান্ত করতে হবে। এফআরসির জন্য আলাদা অবকাঠামোগত সুবিধা, নৈতিক করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মানসম্পন্ন ও তথ্যভিত্তিক আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা, এফআরসি ও হিসাব পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি, তদারকি ও বিশ্লেষণে প্রযুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবহার বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমাতে সম্পদ ও দায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা, ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং চালু করা, শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ নিরীক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি।

এফআরসি চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশাজীবীদের মধ্যে সমন্বিত বোঝাপড়ার অভাব আছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আছে যোগাযোগ ঘাটতি। তিনি জানান, তিন লাখের কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকলেও রিটার্ন দাখিল করে ৩৫ হাজার।