ঈদে ক্রেডিট কার্ডে বিশেষ সুবিধা

ক্রেডিট কার্ডপ্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার কেনাকাটায় দেশের বিপণিবিতানগুলো এখন উৎসবমুখর। তবে উৎসবের এই চিরাচরিত আমেজের সমান্তরালে সাধারণ মানুষের লেনদেনের অভ্যাসে এসেছে এক বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পকেটভর্তি নগদ টাকা নিয়ে বাজারে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে আসছে। শপিং মল, নামীদামি ব্র্যান্ডের শোরুম থেকে শুরু করে অনলাইনের পশুর হাটেও এখন রাজত্ব করছে প্লাস্টিক মানি বা ক্রেডিট কার্ড। উৎসবের বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের কাছে ক্রেডিট কার্ড এখন শুধু আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং পরিকল্পিত অর্থ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

সুদবিহীন কিস্তি বা জিরো পারসেন্ট ইএমআই যেন এক ইচ্ছাপূরণের ম্যাজিক। উৎসবের এই মৌসুমে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো—যেমন সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), ডাচ্‌বাংলা ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক তাদের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য ঘোষণা করেছে আকর্ষণীয় সব অফার। বিশেষ করে আড়ং, ইয়েলো, লোটো, এপেক্স বা বাটার মতো জনপ্রিয় লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডগুলোয় কেনাকাটায় মিলছে ইনস্ট্যান্ট ক্যাশব্যাক বা সরাসরি মূল্যছাড়।

তবে ঈদের কেনাকাটায় গ্রাহকদের বেশি আকৃষ্ট করে ‘জিরো পারসেন্ট ইএমআই’ বা সুদবিহীন সহজ কিস্তি সুবিধা। গরমের তীব্রতা, ঈদের আমেজ ও আসছে বিশ্বকাপ—এসব মিলে ফ্রিজ, এসি, টেলিভিশন কিংবা ওভেনের মতো ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। ট্রান্সকম ডিজিটাল, সিঙ্গার, ওয়ালটন কিংবা স্যামসাংয়ের মতো শোরুমগুলো থেকে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পণ্য কিনে ৩ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত কোনো বাড়তি সুদ ছাড়াই কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকেরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদে পোশাকের পাশাপাশি গৃহস্থালি পণ্য বা গ্যাজেট কেনার একটি বড় প্রবণতা থাকে। এককালীন ৫০ বা ৬০ হাজার টাকা নগদ খরচ করার চেয়ে কার্ডে বিনা সুদে মাসে ৫ হাজার টাকা করে শোধ করার সুবিধা পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বড় স্বস্তি পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রিমিয়াম কার্ডগুলোতে থাকছে অভিজাত পাঁচতারা হোটেলগুলোতে বাই ওয়ান গেট ওয়ান (বোগো) বা উৎসবভেদে ‘বাই ওয়ান গেট ফোর’ ডাইনিং সুবিধা।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের সিএমএসএমই ও রিটেইল বিজনেস বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক সক্ষমতা কমলেও সচেতনতা বাড়ায় মানুষের মধ্যে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে কার্ডের সুবিধার মাত্র ১০ শতাংশ বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। লংকাবাংলার ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণসীমার বিপরীতে গ্রাহকরা এখন ৬০০ কোটি টাকা ব্যবহার করছেন। আমরা এই সেবা প্রান্তিক পর্যায়ের খামারি ও সাধারণ ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি আরও জানান, লংকাবাংলার ১ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক বর্তমানে ২ হাজার ৭০০ মার্চেন্টের কাছে ১২ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত ০ শতাংশ ইএমআই সুবিধাসহ ক্যাশব্যাক, মূল্যছাড় ও ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার উপভোগ করছেন।

অনলাইন ও পশু কেনায় ভরসা কার্ড

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা থাকায় অনলাইনের ডিজিটাল পশুর হাট এবং বিভিন্ন অ্যাগ্রো ফার্মেও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হাটের কাদা-ময়লা পরিবেশ, জাল টাকা এবং ছিনতাইয়ের ঝুঁকি এড়াতে অনেকেই ঘরে বসে কার্ডের মাধ্যমে কোরবানির পশু বুকিং বা সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করছেন। নির্দিষ্ট ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারে মিলছে বিশেষ রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ফ্রি হোম ডেলিভারি বা কসাই–সুবিধা। 

লেনদেনের নতুন রেকর্ড

উৎসবের সময়ে কার্ডভিত্তিক লেনদেন কতটা গতিশীল হয়, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ই-ব্যাংকিং ও ই–কমার্স স্ট্যাটিস্টিকস ইউনিটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে (যা মূলত ঈদের কেনাকাটার মৌসুম ছিল) দেশের কার্ডভিত্তিক (এটিএম, পস, ই-কমার্স ও সিআরএম) সামগ্রিক লেনদেনে সর্বকালের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে কার্ডভিত্তিক মোট লেনদেন ছিল ৪৭,৯৯৮.৪৯ কোটি টাকা, সেখানে মার্চ মাসে তা এক ধাক্কায় ১২,৪৭৯.৪৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০,৪৭৮ কোটি টাকায়। এই মাসে মোট লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২৫ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৪। মার্চ ২০২৬-এর খাতভিত্তিক চিত্রটি পর্যালোচনায় দেখা যায়:

এটিএম: উৎসবের কেনাকাটায় নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে এটিএম বুথগুলো থেকে ২ কোটি ৭৬ লাখের বেশিবার লেনদেনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়।

সিআরএম: আধুনিক ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিনের মাধ্যমে টাকা জমা ও তোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। 

পস: বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপ ও বিপণিবিতানে সরাসরি কার্ড সোয়াইপ করে কেনাকাটা হয়েছে ৪ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা।

ই-কমার্স: ঘরে বসে অনলাইনে কেনাকাটা ও ট্রাভেল টিকিট বুকিং বাবদ ই-কমার্সে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।