প্রান্তিক খামারির হাত ধরে এগোচ্ছে প্রাণিসম্পদ

সারা বছর শ্রমিকেরা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন। কিন্তু কোরবানির সময় কেন তাঁরা অন্য খানে মাংসের জন্য যাবেন? এ বিবেচনা থেকেই কোরবানির সময় শ্রমিকদের বিনা মূল্যে মাংস দেওয়ার রীতি চালু করেছিলেন কুমিল্লার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ফরিদ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মফিজউল্লাহ। সেটা গত শতকের আশির দশকের কথা। তখন কারখানা ছোট ছিল, শ্রমিকের সংখ্যাও কম ছিল।

কোরবানির সময় দু–তিনটি গরুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন কারখানা অনেক বড় হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা মফিজউল্লাহ এখন বেঁচে নেই। তাঁর ছেলেরাই এখন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছেন দেলোয়ার হোসেন। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার চৌয়াড়া নামক স্থানে মূল কারখানার পাশে অনেকটা ফাঁকা জমিতেই গড়ে তুলেছেন গরুর খামার। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে না, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কোরবানির মাংসের বন্দোবস্ত করতেই খামার করা।

২০১৭ সালে সাত–আটটি গরু নিয়ে এ খামার গড়ে তুলেছিলেন দেলোয়ার হোসেন। আর এখন ৮টি দুধেল গরু এবং ৩০টির বেশি কোরবানির উপযোগী ষাঁড় আছে বলে জানান দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘স্রেফ শখের বশে এ খামার দিয়েছি। গরু পালন করার শখ এবং কোরবানির সময় শ্রমিকদের যেন মাংস দিতে পারি, সেই উদ্দেশ্যেই এ খামার। দেশে এখন খামার করার একটা প্রবণতা শুরু হয়েছে। দেখছি কোরবানির জন্য একসময় আমাদের নির্ভরতা ছিল ভারত বা মিয়ানমারের গরুর ওপর। সেটা কিন্তু এখন নেই, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তা বলতে পারি।’

নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও দেশের প্রাণিসম্পদ খাত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দিন দিন এ খাত বড় হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। একসময় কোরবানির প্রাণীর জন্য যে নির্ভরতা, সেটা আজ নেই। এর পেছনে আছে গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র নানা মানুষের উদ্যোগ।

গরু পালনে প্রান্তিক পর্যায়ে চেষ্টা

ইয়াসিন আরাফাত পেশায় শিক্ষক। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শেরুয়া পাঠানতোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি চাকরি করেন। চাকরির পাশাপাশি বাড়িতে তিনি গরু পালন করেন ২০২০ সাল থেকে। গরুগুলো বিক্রি করেন প্রতিবছর কোরবানি ঈদের আগে। এতে প্রতিবছর গরু বিক্রি করে তিনি বাড়তি আয় করেন অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ইয়াসিন আরাফাতের বাড়ি উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের স্বরো গ্রামে।

এই উপজেলারই খানপুর ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের খোরশেদ আলম ২০১২ সাল থেকে বাড়িতে গরু পালন করে আসছেন। এতে গরুপ্রতি খরচ বাদে আয় হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি জমি খায়খালাশি (বন্ধক) নিয়েছেন। চলতি কোরবানি ঈদ ঘিরে তিনি বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছেন পাঁচটি ষাঁড় গরু। এ বছর তাঁর আয় হবে অন্তত এক লাখ টাকা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের ৯০ ভাগের মতো ক্ষুদ্র খামারি। তাঁরা এ খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন। এতে হাল ফিরছে তাঁদের। আর শেষে লাভবান হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

বাড়ছে গবাদিপশুর সংখ্যা

খেতের কাজের পাশাপাশি বাড়িতে গরু–ছাগলের পালন এ দেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের মানুষের জীবনের অংশ। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে যেখানে দেশে গরুর উৎপাদন ছিল ২ কোটি ৩৭ লাখের মতো। এখন সর্বশেষ অর্থবছরে (২০২৪–২৫) এর পরিমাণ হয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখের বেশি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্বিদ্যালয়ের ডেইরি সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আশিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে এর বাণিজ্যিকায়ন জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে। পশুপালন অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। এখন পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ খাতে প্রধান সরকারি পরিষেবা হলো চিকিৎসাদান। কিন্তু উন্নত জাত, প্রাণিখাদ্যের জন্য উন্নততর ব্যবস্থা, প্রাণী পালনে আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতির বিস্তার—এর অনেক কিছুরই ঘাটতি রয়ে গেছে।

জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান দরকার বলে মনে করেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান। তবে তিনি বলেন, সরকার শুধু চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছে, এটা ঠিক নয়। উন্নত জাতের বিস্তার, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে অনেক কাজ করার জায়গা আছে।

প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে এলাকাভিত্তিক ম্যাপিং বা জোনিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন ভোলার প্রাণী পালনে যে ব্যবস্থাপনা, তা কিন্তু পঞ্চগড় বা ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য এক হবে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণিসম্পদের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন সিরাজগঞ্জ, পাবনা বা মানিকগঞ্জের মতো এলাকাগুলো গরুর দুধের জন্য প্রসিদ্ধ। আবার ঠাকুরগাঁও বা পঞ্চগড়ের মতো এলাকায় পোলট্রি শিল্পের বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকা ধরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়ে পরামর্শ আছে বিশেষজ্ঞদের। এ নিয়ে এখন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকার কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছে বলে জানান প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান।