তিন দফা স্থগিত, আইনি জটিলতা, ব্যবসায়ীদের পাল্টাপাল্টি রিটের ঘটনার পর অবশেষে শনিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে চট্টগ্রাম চেম্বারের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। ইতিমধ্যে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চেম্বার কর্তৃপক্ষ। এদিকে নির্বাচনের আগের দিন গতকাল শুক্রবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ। তবে সরে দাঁড়ালেও ব্যালটে তাঁদের নাম থাকছে।
সর্বশেষ এই চেম্বারের ভোট হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর সব কমিটি গঠিত হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এবারের নির্বাচন ঘিরে দুটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। একটি বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ এবং অন্যটি এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম চেম্বারে ব্যবসায়ীদের ভোটে ১২ জন সাধারণ শ্রেণিতে, ছয়জন সহযোগী শ্রেণিতে ও তিনজন করে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণি থেকে পরিচালক নির্বাচিত হয়ে থাকেন। পরিচালকদের ভোটে নির্বাচিত হন সভাপতি ও দুই সহসভাপতি। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণিতে এবার পরিচালক হওয়ার পথে আছেন তিনজন করে মোট ছয়জন।
‘আদালতের রায় আমরা সব সময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলেছি এবং ভবিষ্যতেও আইনগত কাঠামোর ভেতর থেকেই আমাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আমরা চাই তৃণমূল ভোটারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে চেম্বারের নেতৃত্ব নির্বাচিত হোক। এখনো আমরা সেই নীতিতে আছি।’
চেম্বার জানিয়েছে, চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী সাধারণ শ্রেণি থেকে এবার ৩৭ জন নির্বাচন করছেন। দুই প্যানেলের ২৪ জন ছাড়া আরও ১৩ জন প্রার্থী আছেন। অন্যদিকে সহযোগী শ্রেণিতে নির্বাচন করছেন ১৬ জন। দুই প্যানেলের ১২ জন ছাড়া আছেন ৩ জন। তফসিল অনুযায়ী, সময়সীমার মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় সরে দাঁড়ালেও ভোটের ব্যালটে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের সবার নাম ও ব্যালট নম্বর উল্লেখ থাকবে।
নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘ জটিলতা, আদালতের স্থগিতাদেশ ও দুই প্যানেলের অনিশ্চিত অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম চেম্বারের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বশূন্যতার কারণে কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বারবার স্থগিতাদেশ ও আইনি টানাপোড়েনের ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক যুগ পর চেম্বারে ভোটের আমেজ তৈরি হলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি বারবার জটিল হয়ে উঠেছে। একটি পক্ষ একাধিকবার আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কারণে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। প্রায় ২০ মাস ধরে চেম্বারটি নেতৃত্বশূন্য। চেম্বার ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় দুই প্যানেলেরই সমঝোতার পথে আসা দরকার।
ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের দলনেতা আমিরুল হক বলেন, ‘আদালতের রায় আমরা সব সময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলেছি এবং ভবিষ্যতেও আইনগত কাঠামোর ভেতর থেকেই আমাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আমরা চাই তৃণমূল ভোটারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে চেম্বারের নেতৃত্ব নির্বাচিত হোক। এখনো আমরা সেই নীতিতে আছি।’
আদালতে ৯ মাসের ‘ঘুরপাক’
চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছিল গত বছরের ১১ আগস্ট। তফসিল অনুযায়ী সে বছর ১ নভেম্বর ভোট হওয়ার কথা ছিল। তবে চেম্বার নির্বাচন থেকে ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন শ্রেণি দুটি বাদ দিতে শুরু হয় চিঠি–চালাচালি। একপর্যায়ে এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও এই শ্রেণি দুটিকে বাদ দেওয়ার আবেদন করেন চার ব্যবসায়ী। পরে আদালতে রিট করেন মোহাম্মদ বেলাল নামের এক ব্যবসায়ী।
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্টের এক আদেশের পর নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থার অবসান হয়। জাতীয় নির্বাচনের কারণে চেম্বার নির্বাচন পেছানো হয়। পরে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ চেম্বার আদালতে শুনানির পর আবার ঝুলে যায় নির্বাচন। ২২ এপ্রিল এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালে শুনানির পর তফসিলজনিত জটিলতায় পড়ে চেম্বার।
চেম্বার সূত্র জানায়, আগের নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে নতুন তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দেয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনাল। নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন তফসিল ঘোষণা করতে হবে ২০২৫ সালের বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার আলোকে। এরপর আরেক দফা উচ্চ আদালতে শুনানি হয়। শুনানির পর আইনগত মতামতের ভিত্তিতে আগের তফসিলে ২৩ মে ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়।
১৮ মে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। এর দুদিন পর গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে রিট করেন ব্যবসায়ী এস এম নুরুল হক ও মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম। আদালত ছয় মাসের জন্য নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। একই দিন বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ। এদিন চেম্বার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চট্টগ্রাম চেম্বারকে নির্দেশ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
নির্বাচন প্রত্যাখ্যান এক প্যানেলের
গতকাল চেম্বারের এই নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন আখ্যা দিয়ে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ। এদিন বিকেলে র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউতে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের দলনেতা এস এম নুরুল হক। তাঁর দাবি, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করা এই নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। সে জন্য এই নির্বাচনে তাঁরা থাকবেন না।
এস এম নুরুল হক অভিযোগ করেন, এফবিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। একটি মহল জালিয়াতির মাধ্যমে কিছু পরিচালককে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার চেষ্টা করে। এ নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হলে পরবর্তী আদালতের নির্দেশনায় নতুন তফসিল ঘোষণার রায় আসে।
এস এম নুরুল হক দাবি করেন, আদালতে ৮ জুন চূড়ান্ত শুনানির দিন আছে। কিন্তু তার আগেই তড়িঘড়ি নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে। ঈদুল আজহার আগমুহূর্তে ও হজ মৌসুমে মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে ২৩ মে নির্বাচন আয়োজন করলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ভোট দিতে পারবেন না। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে পুরোনো তফসিলে নির্বাচন আয়োজন বেআইনি, পক্ষপাতমূলক ও প্রহসনের। সে জন্য এই নির্বাচন তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
চেম্বারের নির্বাচনী বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা, আইনগত মতামত ও সব আইন মেনে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যে যাঁরা প্রত্যাহার করেননি, তাঁদের সবার নাম ব্যালটে থাকবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব আয়োজন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।