করদাতার রিটার্ন তৈরি করে দেবে এনবিআর

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া নিয়ে আর ভাবনা নয়। রিটার্ন জমা দেওয়ার নতুন ধরনের অনলাইন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে এনবিআরের আয়কর বিভাগ। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে আপনি ঘরে বসে এই ব্যবস্থায় কয়েক ক্লিকেই রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। ফলে আপনাকে আগের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে ঢুকে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে রিটার্ন জমা দিতে হবে না।

তবে অনলাইনে নতুন পদ্ধতিতে রিটার্ন দিতে হলে আগে নিবন্ধন নিতে হবে। প্রথমেই আপনি মুঠোফোনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র ও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দিয়ে করদাতা হিসেবে নিবন্ধন নেবেন। তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আপনাকে একটি আইডি ও পাসওয়ার্ড দেবে। রিটার্ন দেওয়ার সময় আপনি ওই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লিংকে ঢুকবেন। এ সময় এনবিআরের সিস্টেম মানে নতুন ব্যবস্থা আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবে। আপনি শুধু উত্তর দেবেন। আপনার উত্তরের ভিত্তিতে এনবিআরের সিস্টেমেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পরিমাণ ও কর কত হবে, তা হিসাব হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে প্রস্তুত হবে আয়কর রিটার্ন। আপনি শুধু ওই রিটার্নটি ‘কনফার্ম’ করে দেবেন।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আয়কর বিভাগের একটি দল নতুন ব্যবস্থা চালু করা নিয়ে এখন কাজ করছে। সিস্টেম তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, করদাতাবান্ধব অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগটি খুবই ভালো, প্রশংসা করার মতো। এতে করদাতারা রিটার্ন দিতে উৎসাহ পাবেন। রিটার্ন ও কর দেওয়ার সময় যেন মানুষের (কর কর্মকর্তা) সংস্পর্শ না থাকে। এনবিআরের অনলাইন সিস্টেম যত বড় হবে, করদাতাদের তত বেশি সেবা দেওয়া যাবে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ভালো অনলাইন ব্যবস্থাও দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যকর না হওয়ার শঙ্কা থাকে।

যেভাবে সুবিধা মিলবে

নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় একজন করদাতাকে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় শুধু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, মুশফিক সাকিব একটি নামজাদা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় রিটার্ন দিতে গেলে প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইবে। বেতনের টাকা ছাড়া আরও কোনো আয় আছে কি না, জানতে চাওয়া হবে। বেতনের বাইরে আর কোনো আয় না থাকলে এনবিআর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুশফিক সাকিবের বার্ষিক আয়, করের পরিমাণসহ যাবতীয় তথ্য দিয়ে রিটার্ন তৈরি করে দেবে। ওই সিস্টেমেই তাঁকে রিটার্নটি দেখানো হবে, তখন তিনি শুধু কনফার্ম করে দেবেন।

এবার প্রশ্ন হলো, এনবিআর মুশফিক সাকিবের বেতন-ভাতার তথ্য কীভাবে পাবে। মুশফিক সাকিব যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, ওই প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে বেতন থেকে উৎসে কর কেটে রাখে। কোন কোন টিআইএনের কত টাকা বেতনের বিপরীতে কত উৎসে কর কাটল, প্রতিষ্ঠান তা এনবিআরকে তখন জানিয়ে দেয়। সেখান থেকেই এনবিআর স্বয়ংক্রিয় উপায়ে সব তথ্য নেবে।

একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা করদাতা হলে প্রশ্ন করা হবে, আইভাস সিস্টেমের মাধ্যমে বেতন-ভাতা পান কি না। উত্তর হ্যাঁ হলে আইভাস সিস্টেম থেকেই সব তথ্য নিয়ে রিটার্ন বানানো হবে।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে অভিন্ন উপায়ে কিছু প্রশ্ন করে তথ্য নেওয়া হবে।

পরিশোধও হবে অনলাইনে

অনলাইনে শুধু রিটার্ন জমা নয়, করও পরিশোধ করা যাবে। ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি বিকাশ, রকেট, আইক্যাশ, ইউপের মতো বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমেও কর পরিশোধ করা যাবে।

ঘরে বসেই পাবেন কর সনদ

আপনি অনলাইনে রিটার্ন জমা দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর সনদ দরকার। তাহলে কী করবেন? নতুন অনলাইন সিস্টেমে সেই ব্যবস্থাও থাকছে। নিবন্ধন নেওয়ার সময় আপনাকে যে আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে, তা দিয়েই আপনি সিস্টেমে ঢুকবেন। সেখানে সনদ প্রস্তুত করা আছে। আপনি শুধু প্রিন্ট করে নেবেন। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কোনো করদাতা যদি ব্যাংকঋণ নিতে চান, তাহলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চাইলে ওই গ্রাহকের গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য জানার সুযোগ করে দেওয়া হতে পারে। ফলে গ্রাহকের আয়-ব্যয়ের ভিত্তি কতটা মজবুত, তা জানতে পারবে ব্যাংক। অবশ্য করদাতার আয়-ব্যয় ও করের তথ্য জানার জন্য তাঁর অনুমতি নিতে হবে ব্যাংককে। একইভাবে ভিসাপ্রার্থীর আয়-ব্যয় ও করের তথ্যও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানার সুযোগ রাখা হবে।

শূন্য রিটার্নের সুযোগ

দেশে বর্তমানে ৬২ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) আছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫ লাখের মতো টিআইএনধারী বছর শেষে রিটার্ন দেন। জমি বেচাকেনা ও ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার প্রয়োজনে টিআইএন নেওয়া হলে এবং করযোগ্য আয় না থাকলে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাকি সবাইকে রিটার্ন দিতে হবে। করযোগ্য আয় নেই, এমন করদাতার রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। আয়ের ধরন, কত আয়—এমন কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাঁরা শূন্য রিটার্ন দিতে পারবেন।

এই অনলাইন সিস্টেম তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন পদস্থ কর কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদি সব টিআইএনধারী রিটার্ন দেন, তাহলে তাঁদের বার্ষিক তথা মাসে আয় কত, তা জানা যাবে। করোনার মতো সংকটে কারও আয় কমে গেলে তা-ও বোঝা যাবে। যেহেতু নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর—সব তথ্যই সংরক্ষিত থাকবে, তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি সহায়তাও পৌঁছানো সম্ভব। এমনকি উন্নত বিশ্বের মতো করের রিফান্ডের টাকাও মুঠোফোনের আর্থিক সেবার মাধ্যমে পাঠানো যাবে।

এর আগে ২০১৬ সালে অনলাইন রিটার্ন জমার ব্যবস্থা করেছিল এনবিআর। একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ওই সফটওয়্যার তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রচার-প্রচারণার অভাবে এবং ফরম পূরণ করা জটিল হওয়ার কারণে করদাতারা তখন তেমন উৎসাহ দেখাননি। বছরে পাঁচ থেকে ছয় হাজার করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দিতেন। কিন্তু গত বছর তা-ও বন্ধ হয়ে যায়।