বলিউডে দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, দক্ষিণে মাতালেন

সিনেমার দৃশ্যে জ্যোতিকা। আইএমডিবি

প্রথম সিনেমা মুক্তির পরই বলিউডের দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ একই সময়ে দক্ষিণি চলচ্চিত্রশিল্প তাঁকে শুধু গ্রহণই করেনি, বরং একসময় তাঁকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল আলাদা এক তারকাখ্যাতি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তামিল সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জ্যোতিকা।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জ্যোতিকা নিজেই বলেন, বলিউডে যদি থেকে যেতেন, তাহলে হয়তো তিনি এত দূর আসতে পারতেন না। কারণ, তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁকে আর সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু তামিল সিনেমায় একই রকম ব্যর্থ অভিষেকের পরও নির্মাতারা তাঁর অভিনয় দেখেছিলেন, সম্ভাবনা দেখেছিলেন। আর সেই বিশ্বাসই তাঁকে বানিয়েছে দক্ষিণি সিনেমার অন্যতম সফল অভিনেত্রী।

ব্যর্থ অভিষেক, তবু থেমে না যাওয়া
১৯৯৮ সালে পরিচালক প্রিয়দর্শনের হিন্দি ছবি ‘ডোলি সাজা কে রাখনা’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক হয় জ্যোতিকার। মালয়ালম হিট ‘আনিয়াথিপ্রভু’র  রিমেক ছিল ছবিটি। কিন্তু সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। সাধারণত নবাগত অভিনেত্রীদের জন্য এমন ব্যর্থতা ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়, জ্যোতিকার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।

জ্যোতিকা নিজেই বলেন, প্রথম হিন্দি ছবি ফ্লপ করার পর বলিউডে তাঁর জন্য দরজাগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রযোজক-পরিচালকেরা আর আগ্রহ দেখাননি। অথচ একই সময়ে তাঁর প্রথম তামিল ছবিও ব্যবসাসফল হয়নি। কিন্তু সেখানে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দক্ষিণি চলচ্চিত্রশিল্প তাঁর অভিনয়ের দিকে তাকিয়েছিল। ছবির ব্যর্থতা নয়, বরং একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একের পর এক ছবির প্রস্তাব পেতে শুরু করেন। সেই সময়ের তামিল সিনেমায় নায়িকাদের জন্য যেভাবে ভিন্নধর্মী চরিত্র লেখা হচ্ছিল, জ্যোতিকা তার পূর্ণ সুবিধা পেয়েছিলেন।

মুম্বাইয়ের মেয়ে থেকে দক্ষিণের তারকা
দক্ষিণে সাফল্য পেলেও অনেকেই জানেন না, জ্যোতিকার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ে। তাঁর পরিবার মূলত পাঞ্জাবি-মহারাষ্ট্রীয়। তাঁর বোন নাগমা নব্বইয়ের দশকে বলিউড ও দক্ষিণি সিনেমার পরিচিত মুখ ছিলেন। সেই সূত্রেই বিনোদনজগতের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হয় জ্যোতিকার।

কিন্তু দক্ষিণি সিনেমায় পা রাখার পর তাঁকে সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল, তা হলো ভাষা। তামিল ভাষা জানতেন না বললেই চলে। শুরুতে ডাবিং শিল্পীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে ভাষা শিখেছেন, সংস্কৃতিকে বুঝেছেন, স্থানীয় দর্শকের আবেগ ধরতে শিখেছেন।
এই অভিযোজনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। অনেক বলিউড অভিনেত্রী দক্ষিণে গিয়ে কয়েকটি ছবি করে ফিরে এলেও জ্যোতিকা সেখানে নিজের ঘর তৈরি করেছিলেন।

একের পর এক সাফল্য
দুই হাজারের দশকে জ্যোতিকা হয়ে ওঠেন তামিল সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের একজন। রোমান্টিক, কমেডি, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, পারিবারিক নাটক—সব ধরনের চরিত্রেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন।

‘চন্দ্রকুমারী’ ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দক্ষিণি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত পারফরম্যান্স। মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত এক নারীর চরিত্রে তাঁর অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও ভয়ংকর রূপান্তর দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। অনেকে মনে করেন, ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন জ্যোতিকা নিজেই।

এ ছাড়া ‘মোঝি’–তে বাক্‌প্রতিবন্ধী এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ান। বাণিজ্যিক সিনেমার ভিড়েও অভিনয়নির্ভর চরিত্রে যে দর্শক টানা যায়, তা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীকেন্দ্রিক ছবিতে সাফল্য। যখন দক্ষিণি সিনেমা মূলত নায়কনির্ভর ছিল, তখনো জ্যোতিকা নিজের অভিনয় দিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

জ্যোতিকা ও সুরিয়া। ইনস্টাগ্রাম থেকে

সুরিয়ার সঙ্গে প্রেম ও সংসার
জ্যোতিকার ব্যক্তিজীবনও সব সময় আলোচনায় ছিল। অভিনেতা সুরিয়ার সঙ্গে একাধিক ছবিতে কাজ করতে করতেই তাঁদের সম্পর্ক গভীর হয়। দক্ষিণি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হিসেবে পরিচিতি পান তাঁরা। ২০০৬ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। এরপর কিছু সময় অভিনয় থেকে দূরে সরে যান জ্যোতিকা। সন্তান ও পরিবারকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দক্ষিণ ভারতীয় সমাজে তখনো বিবাহিত অভিনেত্রীদের ক্যারিয়ার নিয়ে নানা ধরনের ধারণা ছিল। অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁর অভিনয়জীবন শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু কয়েক বছর পর জ্যোতিকা যেভাবে ফিরে এলেন, তা ভারতীয় সিনেমায় বিরল উদাহরণ।

দ্বিতীয় ইনিংস: আরও পরিণত, আরও শক্তিশালী
বিয়ের পর বিরতি ভেঙে জ্যোতিকা যখন আবার অভিনয়ে ফেরেন, তখন তিনি আর আগের সেই গ্ল্যামার–নির্ভর নায়িকা নন; বরং সমাজ, পরিবার ও নারীর বাস্তব জীবন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের মুখ হয়ে ওঠেন।
‘৩৬ ভায়াধিনিলে’, ‘রাতচেছি’ বা ‘পনমাগল ভানধাল’–এর মতো ছবিতে তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেখানে একজন মধ্যবয়সী নারীর সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্ন উঠে এসেছে। বলিউড সম্পর্কে সাম্প্রতিক মন্তব্যে জ্যোতিকা স্বীকার করেছেন, বর্তমানে হিন্দি সিনেমায় চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের জন্য যেভাবে শক্তিশালী চরিত্র লেখা হচ্ছে, দক্ষিণে এখনো সেই জায়গায় পুরোপুরি পৌঁছানো যায়নি। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেন, দক্ষিণি সিনেমা তাঁকে যে ধরনের সুযোগ দিয়েছে, তা হয়তো বলিউডে পেতেন না।

আরও পড়ুন

কেন আলাদা জ্যোতিকা
জ্যোতিকার সাফল্যের পেছনে শুধু সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তা নয়, তাঁর অভিনয়ের সততা বড় কারণ। তিনি কখনো নিজেকে নির্দিষ্ট একধরনের চরিত্রে আটকে রাখেননি। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি অভিনয়নির্ভর গল্পেও সমান স্বাচ্ছন্দ্য দেখিয়েছেন। তামিলনাড়ু স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে পাঁচবার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতা তাঁর দক্ষতারই প্রমাণ। দক্ষিণি সিনেমায় নারী অভিনেত্রীদের মধ্যে এমন ধারাবাহিক সাফল্য খুব কমই দেখা গেছে।

এ ছাড়া ব্যক্তিজীবন ও ক্যারিয়ারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ক্ষেত্রেও তিনি ব্যতিক্রম। পরিবার, সন্তান, অভিনয়—সবকিছু সামলে তিনি যেভাবে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন, তা অনেক অভিনেত্রীর জন্য অনুপ্রেরণা।

নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক
ওটিটি যুগে জ্যোতিকা আবারও নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে গেছেন। ‘ডাব্বা কার্টেল’–এ তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। সামনে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘সিস্টেম’, যেখানে তাঁর সঙ্গে আছেন সোনাক্ষী সিনহা ও আশুতোষ গোয়াড়িকর।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে