ডাবিং রুমে চুরির পর এফডিসির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

ডাবিং রুমে চুরির পর এফডিসির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নকোলাজ

ডাবিং রুম থেকে চিত্রনায়িকা তানহা তাসনিয়ার মুঠোফোন চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিন দেখা গেছে, চুরির ঘটনার পরও এফডিসির প্রবেশ ও নিরাপত্তায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

এফডিসির প্রধান ফটক
ছবি : মনজুর কাদের

চুরির দুই দিন পর গত রোববার দুপুরে এফডিসির প্রধান ফটকে গিয়ে দেখা যায়, কে ঢুকছে, কে বের হচ্ছে—তা নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি কোনো সতর্কতাই নেই। দর্শনার্থীদের নাম নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেই, পরিচয়পত্র যাচাইয়ের বালাইও নেই। শুটিংয়ের কথা বললেই যাচাই না করেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এফডিসি কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান, অথচ এখানে প্রবেশে কার্যকর কোনো নীতিমালাই নেই। এ কারণে যে কেউ সহজেই আসা–যাওয়া করছে।

ডাবিংয়ের সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে তানহা তাসনিয়ার মুঠোফোন চুরি হয়ে যায়। পরে নিকটস্থ থানায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বহিরাগত কেউ ইউনিটের সঙ্গে মিশে ডাবিং রুমে ঢুকে ফোনটি নিয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এই এফডিসি থেকেই বছর দুয়েক আগে একটি ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ের সময় তাসনিয়া ফারিণের দামি মোবাইল ফোন চুরি হয়। অরুণা বিশ্বাসের ব্যাগ চুরি হয়, সেই ব্যাগে ছিল আইফোন, স্যামসাং ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক কার্ড, বাসার চাবিসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র।

রোববার দুপুরের পর এফডিসির প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিজ্ঞাপনচিত্রের সেট নির্মাণের কাজ চলছিল
ছবি : প্রথম আলো

ওই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে অরুণা বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘এফডিসিতে একটা চক্র তৈরি হয়েছে, সুযোগ পেলেই যারা চুরি করে। বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ না করলে এমন ঘটনা চলতেই থাকবে।’

নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বহিরাগতদের প্রধান ফটক পার করানোর অভিযোগ বহু পুরোনো। এফডিসিতে ‘গেট-বাণিজ্য’ চালু রয়েছে—অনেকবার কর্তৃপক্ষকে এ অভিযোগ জানিয়েছেন শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালকেরা। অভিযোগের পর কিছুদিন কড়াকড়ি থাকে, এরপর আবার সেই আগের অবস্থা। একাধিকবার প্রবেশের পাস–ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় নিরাপত্তাকর্মীকে শোকজ করা হয়েছিল। কাউকে কাউকে বদলি করা হয়। এরপর কিছুদিন পরিস্থিতি বদলালেও পরে আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

এফডিসির ৩৪ সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে ১৮টিই নষ্ট
ছবি : মনজুর কাদের

৩৪ সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে ১৮টিই নষ্ট

ঘটনার দিন ডাবিং রুমে উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা গাজী মাহবুব। চুরির পর বিষয়টি নিয়ে তিনি এফডিসির সিসিটিভি বিভাগের কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তাঁরা জানান, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা থেকেই ডাবিং রুমের সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল ছিল। ফলে সন্ধ্যার চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়নি। এফডিসির সহকারী পরিচালক (নিরাপত্তা) এ কে এম আমিনুল করিম খান জানান, বর্তমানে এফডিসিতে ৩৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে, যার মধ্যে ১৮টিই দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। এমনকি তাঁর কক্ষে থাকা মনিটরটিও প্রায় এক বছর ধরে অকেজো। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এফডিসিতে শুটিং বেড়েছে। বড় বাজেটের ছবির কাজ হচ্ছে। সে অনুপাতে নিরাপত্তাকর্মী বাড়েনি। সাত একরের বেশি জায়গায় ইনচার্জসহ মাত্র চারজন নিরাপত্তাকর্মী। এত বড় এলাকার জন্য এই জনবল মোটেও যথেষ্ট নয়। আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। লোকবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’

এরপরও নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, স্বীকার করলেন তিনি, ‘আমরা সঠিক সাপোর্ট দিতে পারছি না বলেই চুরির মতো ঘটনা ঘটছে। আগে আরও কমসংখ্যক সিসিটিভি ছিল, ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়েছে। তবে সার্ভার সমস্যাও আছে। এখানে যাঁরা কাজ করতে আসেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

এফডিসির পরিচালক সমিতির সামনের দৃশ্য
ফাইল ছবি

বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে শিগগিরই গেটপাস চালু করা হবে বলেও জানান তিনি। পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী, সংবাদকর্মী, কলাকুশলীসহ এফডিসিতে নিয়মিত কাজ করেন—এমন সবাইকে পাসের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

একাধিক প্রযোজক–পরিচালকের সঙ্গেও কথা হলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই প্রযোজক–পরিচালকেরা বলেন, শুটিং চলাকালে ইউনিট সদস্যদের পরিচিতজন, অপ্রয়োজনীয় লোকজনও প্রায়ই সেটে আসেন। এতে বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে। ভবিষ্যতে ইউনিটভিত্তিক ছবিসহ পরিচয়পত্র চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে, শুটিং চলাকালে অচেনা কেউ যাতে ঢুকতে না পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এদিন দায়িত্বে থাকা এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘অনেক সময় প্রভাবশালীদের চাপে কাউকে আটকালেও সমস্যা হয়। এরপরও আমরা চাই, লোকবল বাড়ুক, গেট পাসের ব্যবস্থা চালু হোক। তাহলে বহিরাগত প্রবেশ বন্ধ হবে।’ এফডিসিতে বিভিন্ন সমিতির কার্যালয় ও নির্বাচন ঘিরেও বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে বলেও জানিয়েছেন প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তারা। এ বিষয়টি নিয়েও ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।