দমবন্ধ সংসারজীবনে মানিয়ে নিতে না পারা এক নববধূর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন ঠিক কী হতে পারে? পরিচালক করণ কান্ধারি তাঁর প্রথম সিনেমা ‘সিস্টার মিডনাইট’-এ এ প্রশ্নেরই একটি অদ্ভুত, পরাবাস্তব এবং ডার্ক কমেডি ঘরানার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া রাধিকা আপ্তে অভিনীত এই সিনেমাকে প্রথাগত কোনো হরর মুভি নয়, বরং ওয়েস্টার্ন ভ্যাম্পায়ার মিথলজির সঙ্গে এই উপমহাদেশের ডাকিনী, রক্তচোষা পিশাচ বা পেতনির এক এক্সপেরিমেন্টাল ফিউশন বলা চলে।
সিনেমা: ‘সিস্টার মিডনাইট’
ধরন: ডার্ক, হরর, কমেডি
পরিচালনা: করণ কান্ধারি
অভিনয়: রাধিকা আপ্তে, অশোক পাঠক, ছায়া কদম
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট
স্ট্রিমিং: ডিজনি প্লাস
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে উমা (রাধিকা আপ্তে), যার সদ্য বিয়ে হয়েছে গোপালের (অশোক পাঠক) সঙ্গে। গোপাল স্বভাবগতভাবে একটু ভীতু, লাজুক এবং চরম অগোছালো একজন মানুষ। রাতের বেলায় মদ্যপানের বদভ্যাস রয়েছে। অন্যদিকে উমা এমন এক নারী, যে বিবাহিত জীবনের শারীরিক, মানসিক বা সাংসারিক—কোনো দায়িত্বের সঙ্গেই নিজেকে মেলাতে পারে না। উমা রান্না করতে পারে না, ঘরকন্নার কাজে তার চরম অনীহা। দুজনের মধ্যে কোনো প্রেমের রসায়ন তো নেই-ই, এমনকি তাদের যৌনতার চেষ্টাও অত্যন্ত অস্বস্তিকরভাবে বিফলে যায়। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে উমা তার প্রতিবেশী শীতল (ছায়া কদম) এবং এক সহকর্মীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি খোঁজে। কিন্তু দিনের পর দিন চলতে থাকা এই অস্বস্তি উমাকে মানসিকভাবে এক অদ্ভুত পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।
সিনেমাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো উমার রূপান্তর। মানসিক অবসাদ ও হতাশা থেকে উমা ধীরে ধীরে এক বন্য, আদিম প্রাণীতে পরিণত হতে থাকে। সে সাধারণ খাবার খেতে পারে না, খেলেও বমি করে দেয়। একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধায় সে রাস্তার একটি ছাগলের ঘাড় মটকে রক্ত পান করে এবং কিছুটা স্বস্তি পায়। এর পর থেকেই তার মধ্যে ভ্যাম্পায়ার–সুলভ লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। সে রোদে বের হতে পারে না, দিনের বেলায় পুরো শরীর ঢেকে রাখে এবং পশুপাখির রক্ত খাওয়া শুরু করে। মজার বা অদ্ভুত বিষয় হলো, উমা যেসব প্রাণীর রক্ত পান করে, তারা আবার জীবিত হয়ে তার পিছু নিতে থাকে!
গল্পের শেষ দিকে উমা তার এই অবস্থার কথা গোপালকে জানায়। গোপাল, যে কিনা স্বামী হিসেবে কিছুটা ব্যর্থ হলেও ভেতরে–ভেতরে স্ত্রীকে খুশি করতে চায়, সে নিজের রক্ত উমাকে পান করতে দেয়। কিন্তু রক্তশূন্য হয়ে গোপাল মারা যায় এবং প্রাণীদের মতো সে আর ফিরে আসে না। এরপর গোপালের লাশ পুড়িয়ে ছাই গায়ে মেখে উমা বেরিয়ে পড়ে এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়। ট্রেনের দরজায় তার শ্বদন্ত প্রদর্শন এবং ট্রেনের পেছনে ছুটে চলা সেই জীবিত প্রাণীগুলো এক অদ্ভুত পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে।
সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রাধিকা আপ্তের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। সংলাপ কম হওয়া সত্ত্বেও কেবল শরীরী ভাষা ও এক্সপ্রেশন দিয়ে তিনি উমার ভেতরের রাগ, হতাশা ও বন্যতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এ যেমন দেখানো হয়েছিল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এক পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক পতন, ঠিক তেমনি ‘সিস্টার মিডনাইট’ দেখিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জাঁতাকলে পিষ্ট একজন নারীর দানবে পরিণত হওয়ার গল্প। পরিচালক এখানে কিছুটা কোয়ার্কি স্টাইল ব্যবহার করেছেন, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ডার্ক হিউমার।
তবে নিরীক্ষাধর্মী সিনেমাটি বেশ কিছু জায়গায় খেই হারিয়েছে। গল্পের বুননে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। যেমন উমার বয়সী একজন ভারতীয় নারী কেন রান্নার অ আ ক খ–ও জানবে না, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি পরিচালক দেখাননি। সে কেন সাধারণ খাবার হজম করতে পারছিল না, তারও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
এ ছাড়া সিনেমাটিতে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজ অত্যন্ত দুর্বল, যা অনেক সময় চোখের আরাম নষ্ট করে। বন্দিজীবন থেকে নারীর বের হয়ে আসার যে রূপকধর্মী বার্তা পরিচালক দিতে চেয়েছেন, তা আইডিয়া হিসেবে চমৎকার হলেও চিত্রনাট্যের দুর্বলতার কারণে তা দর্শকমনে খুব একটা জোরালো প্রভাব তৈরি করতে পারে না। প্রথমার্ধের পর সিনেমাটি কিছুটা ধীরগতির ও একঘেয়ে হয়ে পড়ে।
‘সিস্টার মিডনাইট’ সবার জন্য নয়। আপনি যদি টিপিক্যাল ভূতের সিনেমা বা জ্যাম্প-স্কেয়ার হরর খোঁজেন, তবে এই মুভি আপনাকে হতাশ করবে। কিন্তু আপনি যদি ডার্ক কমেডি, সাইকোলজিক্যাল ফ্যান্টাসি এবং এক্সপেরিমেন্টাল কাজের ভক্ত হন, তবে রাধিকা আপ্তের দুর্দান্ত অভিনয় এবং মুম্বাইয়ের অলিগলির সুন্দর চিত্রায়ণের জন্য এটি অন্তত একবার দেখা যেতে পারে।