কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ‘পানিশার’! ফিরল চেনা রূপেই
মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের (এমসিইউ) কনটেন্ট মানেই ধরে নেওয়া হয় ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি বা সব বয়সীর উপযোগী। বিশেষ করে ২০০৯ সালে ডিজনির হাতে মার্ভেলের মালিকানা যাওয়ার পর ‘আর-রেটেড’ কনটেন্ট তারা এড়িয়েই চলত। আর-রেটেড বা রেস্ট্রিকটেড মানে হলো এমন কনটেন্ট, যেখানে মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত, সহিংসতা, গালিগালাজ বা প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী দৃশ্য থাকে। ছোটদের এটি দেখার অনুমতি নেই। ডিজনির মূল লক্ষ্য থাকে খেলনা বিক্রি আর থিম পার্কের ব্যবসা। তাই গল্পে বেশি সহিংসতা থাকলে সব বয়সের দর্শক তা দেখতে পারে না, ফলে ব্যবসায় টান পড়ে।
একনজরে
স্পেশাল প্রেজেন্টেশন: দ্য পানিশার—ওয়ান লাস্ট কিল
ধরন: ক্রাইম ড্রামা, সুপারহিরো, অ্যাকশন–অ্যাডভেঞ্চার
পরিচালনা: রেনাল্ডো মার্কাস গ্রিন
অভিনয়: জন বার্নথাল, ডেবোরা অ্যান ওল, জেসন আর. মুর, জুডিথ লাইট
দৈর্ঘ্য: ৫১ মিনিট
স্ট্রিমিং: ডিজনি প্লাস
এ কারণে শুরু থেকে মার্ভেল কমিকসের কট্টর ভক্তরা বেশ হতাশ ছিলেন। তাঁদের ভয় ছিল, কমিকসের অন্ধকার ও রক্তপিপাসু চরিত্রগুলোর আসল রূপ হয়তো পর্দায় আর দেখা যাবে না। তবে সম্প্রতি মার্ভেল ধীরে ধীরে সেই ছক ভাঙতে শুরু করেছে। ‘ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন’–এর মতো আর-রেটেড সিনেমা বানিয়ে তারা বক্স অফিস কাঁপিয়েছে। পাশাপাশি ‘ডেয়ারডেভিল: বর্ন এগেইন’ বা ‘ইকো’–র মতো সিরিজেও ডার্ক ও পরিণত গল্পের ছোঁয়া রেখেছে মার্ভেল। বছর দুই আগে মার্ভেল স্টুডিওজের প্রধান (সিইও) কেভিন ফাইগি কথা দিয়েছিলেন যে যদি চরিত্র ও গল্পের জন্য আর-রেটিং প্রয়োজন হয়, তবে তারা এখন থেকে সেই স্বাধীনতা বজায় রাখবেন। ফাইগির সেই কথারই আরও একবার সত্যতা মিলল ডিজনি প্লাসে মুক্তি পাওয়া নতুন স্পেশাল প্রেজেন্টেশন ‘দ্য পানিশার: ওয়ান লাস্ট কিল’–এ।
এই শোর শুরু হয় একটি দর্শকদের জন্য সতর্কবার্তা দিয়ে। আর তা হলো স্পেশাল প্রেজেন্টেশনটি কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত হয়েছে। ৫১ মিনিটের এই আয়োজনে নেই কোনো গতানুগতিক সুপারহিরোর গল্প। আছে ফ্রাঙ্ক ক্যাসল ওরফে পানিশারের অন্ধকার জীবনের ছায়া। যাঁরা মার্ভেল কমিকস পড়েন, তাঁরা জানেন এই চরিত্রটি কতটা ভয়ংকর।
সামনেই টম হল্যান্ডের ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ সিনেমায় দেখা যাবে পানিশারকে। স্পাইডার-ম্যানের দুনিয়া সাধারণত সব বয়সীর জন্য বানানো হয়। তাই সেখানে পানিশারকে হয়তো একটু কম নৃশংস রূপে দেখা যাবে। কিন্তু তার আগে এই স্পেশাল প্রেজেন্টেশনে পানিশার বুঝিয়ে দিলেন, তিনি তাঁর চেনা নির্দয় রূপেই ফিরেছেন।
‘দ্য পানিশার: ওয়ান লাস্ট কিল’ নামের এই স্পেশাল প্রেজেন্টেশনের গল্পটা আদতে বিষাদময়। দেখা যায়, স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছে ফ্রাঙ্ক। তাদের খুনিরাও পরিণতি ভোগ করেছে। ফ্রাঙ্কের প্রতিশোধ নেওয়া শেষ। এখন সে আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পান না। অন্ধকার অতীত তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। এর মধ্যেই পরিস্থিতির চাপে ফ্রাঙ্ককে আবারও অস্ত্র তুলে নিতে হয়। নিউইয়র্কের লিটল সিসিলি এলাকায় গনুচ্চি ক্রাইম ফ্যামিলির বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধে নামেন তিনি। কারণ, মাফিয়া সম্রাজ্ঞী মা গনুচ্চি (জুডিথ লাইট) পানিশারের মাথার দাম ঘোষণা করেছে। শুরু হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই।
নেটফ্লিক্সে পানিশারকে যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা ফ্রাঙ্কের এই মানসিক কষ্টের সঙ্গে পরিচিত। তবে এবারের কষ্টটা আরও গভীর। ফ্রাঙ্কের আসল লড়াইটা বাইরের শত্রুদের চেয়ে নিজের ভেতরের দানবের সঙ্গে। ঠিক এই জায়গাতেই বাজিমাত করেছেন অভিনেতা জন বার্নথাল। ফ্রাঙ্কের ভেতরের শূন্যতা তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে সমাধিস্থলে মৃত স্ত্রী আর মেয়ের আত্মার সঙ্গে তাঁর কথা বলার দৃশ্যগুলো ছিল বেশ মর্মস্পর্শী।
আবেগের পাশাপাশি অ্যাকশনের দিক থেকেও এটি দুর্দান্ত। পর্দায় যখন অ্যাকশন শুরু হয়, চোখের পলক ফেলার উপায় থাকে না। মারামারির দৃশ্যগুলো এতটাই বাস্তব ও নৃশংস, যা দেখে হলিউডের ‘জন উইক’ বা ‘দ্য রেইড’ সিনেমার কথা মনে পড়ে যায়। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ফ্রাঙ্কের বন্দুকের গুলি শেষ। তিনি একটার পর একটা নতুন অস্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব অ্যাকশন কেবল চমক দেখানোর জন্য রাখা হয়নি। প্রতিটি মারামারির ফাঁকে ফ্রাঙ্কের ভেতরের ক্ষোভটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মার্ভেলের চেনা কমেডিঘেঁষা চরিত্রগুলোর চেয়ে একমুখ দাড়িওয়ালা, স্বল্পভাষী ফ্রাঙ্ক ক্যাসল একেবারেই আলাদা। অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেমের পর থেকে মার্ভেলের কনটেন্ট নিয়ে দর্শকদের বেশ হতাশা ছিল। এই স্পেশাল প্রেজেন্টেশনটি যেন স্টুডিওর পক্ষ থেকে সেই হতাশা কাটানোর একটা বড় পদক্ষেপ ছিল।
সব মিলিয়ে ৫১ মিনিটের এই ওয়ান পিস শোটি ছিল গতিময় ও আবেগে ভরপুর একটি থ্রিলার। এটি প্রমাণ করে, নির্মাতাদের স্বাধীনতা দিলে সুপারহিরো–এন্টিহিরোদের নিয়েও মাস্টারপিস বানানো যায়। যাঁরা ‘মার মার কাট কাট’ অ্যাকশন আর সাইকোলজিক্যাল ড্রামার ভক্ত, তাঁদের জন্য পানিশারের এই স্পেশাল প্রেজেন্টেশনটি বছরের অন্যতম সেরা এক অভিজ্ঞতা হতে পারে।