কানে নেপালের ইতিহাস, প্রথমবার অংশ নিয়েই বাজিমাত

কান উৎসবে ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’ সিনেমার টিম। এএফপি


আজ রাতেই পর্দা নামছে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের। এর আগে গতকাল শুক্রবার রাতে ঘোষণা করা হয়েছে আঁ সার্তে রিগা বিভাগের পুরস্কার। এ বিভাগে বাজিমাত করেছে নেপালের সিনেমা।

আঁ সার্তে রিগা বিভাগে এবার সবচেয়ে বড় পুরস্কার জিতেছে অস্ট্রিয়ান নির্মাতা স্যান্ড্রা ওলনারের ‘এভরিটাইম’। শোক, অপরাধবোধ ও পারিবারিক ভাঙনের গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটি উৎসবজুড়ে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

তবে এবারের সবচেয়ে আলোচিত চমক ছিল অন্য জায়গায়। দর্শক ও বাজার—দুই দিক থেকেই বিপুল সাড়া ফেলা ‘ক্লাব কিড’ কোনো পুরস্কার না পেয়েই উৎসব শেষ করেছে।

জর্ডান ফার্স্টম্যানের প্রথম ছবি ‘ক্লাব কিড’ এই বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি। প্রথম প্রদর্শনীতেই ছবিটি দীর্ঘ করতালিতে ভাসে। এরপর ছবিটির স্বত্ব কিনতে শুরু হয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারে ছবিটি কিনে নেয় এ ২৪। এটি এবারের কান উৎসবের সবচেয়ে বড় বিক্রিগুলোর একটি। তবে দর্শকপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক সাফল্য পুরস্কারে রূপ নেয়নি।

শোকের নিঃশব্দ গল্প
আঁ সার্তে বিভাগের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাওয়া ‘এভরিটাইম’ সিনেমায় দেখা যায় এক মর্মান্তিক ঘটনার পর এক মা, মেয়ে ও এক কিশোরের জীবন কীভাবে বদলে যায়। ব্যক্তিগত ক্ষতি ও মানসিক ভাঙনের গল্পকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন স্যান্ড্রা ওলনার।

পুরস্কার নিতে গিয়ে নির্মাতা বলেন, শিল্পীরা অনেক সময় যেসব ‘অদ্ভুত’ বা ‘অস্বস্তিকর’ চিন্তাকে গুরুত্ব দেন না, তিনি সেগুলো আঁকড়ে রাখতে চান। কারণ, সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ গল্প।

কান উৎসবে ‘এভরিটাইম’ সিনেমার পরিচালক স্যান্ড্রা ওলনার। এএফপি

নেপালের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত
আঁ সার্তে রিগা বিভাগে জুরি পুরস্কার পেয়েছে নেপালের পরিচালক অবিনাশ বিক্রম শাহর ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। এটি ছিল এই বিভাগে নির্বাচিত প্রথম নেপালি চলচ্চিত্র। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই পুরস্কার জিতল নেপাল।
পুরস্কার ঘোষণার পর ছবির দল মঞ্চেই নাচ শুরু করে দেয়। পরিচালক আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, ‘সিনেমার ক্ষমতা আছে অন্ধকারের ভেতরে তাকানোর। আপনারা আমাদের গল্পকে দৃশ্যমান করেছেন।’

দক্ষিণ এশীয় পরিচয়, নিঃসঙ্গতা ও বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে নির্মিত ছবিটি সমালোচকদেরও প্রশংসা পেয়েছে। ছবিটির কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু মানুষ, যারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করছে এমন এক সমাজে, যেখানে গ্রহণযোগ্যতা অনেক সময় শর্তসাপেক্ষ। ছবিটির নাম ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’—এক ধরনের প্রতীক। কুয়াশার মধ্যে হাতির উপস্থিতি যেমন বোঝা যায়, কিন্তু পুরোটা স্পষ্ট দেখা যায় না, তেমনি ছবির চরিত্রগুলোর জীবনও সমাজের চোখে আংশিক দৃশ্যমান, আংশিক অদৃশ্য।

কান উৎসবে ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’ সিনেমার টিম। এএফপি

এই সিনেমা আলোচনায় আসার বড় কারণ এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। পরিচালক অবিনাশ বিক্রম শাহ সমাজের প্রান্তিক মানুষের গল্পকে রাজনৈতিক ভাষণের মতো নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আবেগের ভেতর দিয়ে তুলে ধরেছেন। ছবিটি ধীরগতির, পর্যবেক্ষণধর্মী ও আবহময়। দৃশ্যের ভেতরে নীরবতা, পাহাড়ি পরিবেশ, চরিত্রদের একাকিত্ব—সব মিলিয়ে এটি দর্শককে অস্বস্তি ও সহানুভূতির মাঝামাঝি কোথাও দাঁড় করিয়ে দেয়।

অবিনাশ নেপালের নতুন প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাদের একজন। তিনি আগে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে পরিচিতি পান। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, অভিবাসন, পরিচয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন সিনেমাটির মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমহলে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করলেন।

কানে ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’ সিনেমার পরিচালক অবিনাশ বিক্রম শাহ। এএফপি

কানে প্রশংসা পাওয়ার পর ছবিটি এখন আন্তর্জাতিক পরিবেশক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের দর্শকদের কাছেও এটি পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনেক সমালোচক ইতিমধ্যেই ছবিটিকে নেপালি সিনেমার জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলছেন। কারণ, এটি প্রমাণ করেছে, সীমিত বাজেটের সিনেমাও শক্তিশালী গল্প ও নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় আসতে পারে।

আরও পড়ুন

আলোচনায় ‘আয়রন বয়’
বিশেষ জুরি পুরস্কার জিতেছে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘আয়রন বয়’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন লুইস লুই ক্লিচি।

হাতে আঁকা অ্যানিমেশন স্টাইলে নির্মিত ছবিটি ইতিমধ্যেই উত্তর ও লাতিন আমেরিকার পরিবেশনার জন্য কিনে নিয়েছে সনি পিকচার্স ক্ল্যাসিকস।

অভিনয়ের পুরস্কার
সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন ব্র্যাডলি ফিওমোনা ডেম্বিয়াস। রফিকি ফেরেইরা পরিচালিত ‘কঙ্গো বয়’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।
পুরস্কার নেওয়ার সময় আবেগে ভেসে গিয়ে ব্র্যাডলি ফিওমোনা ডেম্বিয়াস গান গেয়ে বক্তব্য শেষ করেন। এরপর উচ্চস্বরে বলেন, ‘আমি একজন তরুণ কঙ্গোলিজ! আমি একজন শরণার্থী! আমি একজন তারকা!’

অন্যদিকে ভ্যালেন্তিনা মারুয়েলের ‘ফরএভার ইওর ম্যাটারনাল অ্যানিমাল’ সিনেমার জন্য যৌথভাবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন ড্যানিয়েলা ম্যারিন নাভারো, ম্যারিনা ডি তাভিরা ও মারিয়েল ভিলেগাস। এ ছবিটি ছিল আঁ সার্তে রিগা বিভাগে নির্বাচিত প্রথম কোস্টারিকান চলচ্চিত্র।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে