তাঁরা তিনজনই কালো চশমা পরতেন

আকিরা কুরোসাওয়া,আব্বাস কিয়ারোস্তামি,জ্যঁ লুক গোদার
আকিরা কুরোসাওয়া,আব্বাস কিয়ারোস্তামি,জ্যঁ লুক গোদার

১৯৮৫ সালে মুক্তি পায় র‌্যান। উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের কিং লিয়ার এভাবে জাপানি শিল্পে মোড়ানো যেতে পারে, কে ভেবেছিল? জাপানি ঋষি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া ৭৫ বছর বয়সেও হুলুস্থুল ফেলে দেন। কে জানত, ৫ বছর পর ৮০ বছর বয়সেও তিনি হাজির হবেন নতুন সিনেমা নিয়ে! সেই সিনেমা হবে অনেকের মতে তাঁরই জীবনচিত্র কিংবা দর্শন। ড্রিমস-অমনিবাস চলচ্চিত্র, ব্যক্তিগত আখ্যান, কুরোসাওয়ার চলচ্চিত্রধারার কিছুটা বাইরের ছবি। তাই ছবিটি কখনো বিদ্ধ হয় সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বাণে, কখনো কুড়িয়ে নেয় প্রশংসা।

সালটা ১৯৯০। আটটি টুকরো গল্পে কুরোসাওয়া নিয়ে এলেন শৈশব, আধ্যাত্মিকতা, শিল্প, মৃত্যু, ভুল এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো বিষয়। অনেকেই ছবিটির সঙ্গে কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফির মিল খুঁজে পেয়েছেন। তবে আমাদের মনোযোগ ছবির একটি গল্পে। সেখানে কুরোসাওয়া পরিবেশের ওপর পারমাণবিক রেডিয়েশনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছিলেন। ঠিক ২১ বছর পর ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা দাই-ইচিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। গণমাধ্যমে তখন হঠাৎ করেই উঠে এসেছিল ড্রিমস ছবির কথা।

ড্রিমস ছবির পোস্টার
ড্রিমস ছবির পোস্টার

করোনা মহামারি একদিকে যেমন মানবজাতিকে অবরুদ্ধ করেছে, তেমনি অপার দরজা খুলে দিয়েছে প্রকৃতিকে। তাই বলা চলে এখনো ড্রিমস সমসাময়িক।

আজ কথা হবে ড্রিমস-এর সঙ্গে মিলে, এমন আরও দুটি ছবির। মিলের বিষয়টি একদমই কাকতাল। ছবি দুটো হলো আব্বাস কিয়ারোস্তামির ক্লোজ-আপ ও জ্যঁ লুক গোদারের ব্রেথলেস। এই তিন ছবির পরিচালক প্রায়ই কালো চশমা পরতেন। তিনটি ছবিতেই তিনজন নামকরা নির্মাতাকে দেখা গেছে—ড্রিমস-এ মার্টিন স্করসেসি, ক্লোজ-আপ-এ মোহসেন মাখমালবাফ ও ব্রেথলেস-এ জাক ঘিবেতকে।

ক্লোজ-আপ ছবির পোস্টার
ক্লোজ-আপ ছবির পোস্টার

কিয়ারোস্তামির ক্লোজ-আপ সিনেমা এক গরিব লোককে নিয়ে, যিনি নিজেকে প্রখ্যাত নির্মাতা মোহসেন মাখমালবাফ দাবি করেন এবং একটি পরিবারকে ধোঁকা দেন। একজন ইরানি সাংবাদিক এই খবর জেনে ফেলেন। তিনি পুলিশে ধরিয়ে দেন নকল মাখমালবাফকে, যার আসল নাম হোসাইন সাবজিয়ান। ওই সাংবাদিক এটি একটি সাময়িকীতেও ছাপিয়ে দেন।

এই লেখা চোখে পড়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামির। কৌতূহলী কিয়ারোস্তামি হাজির হন থানায়। ক্যামেরায় ধারণ করেন সাবজিয়ানকে। সাবজিয়ানের মামলার শুনানিও ধারণ করেন আদালতে। শুধু তা-ই নয়, সাবজিয়ানের সঙ্গে সেই শুনানিতে প্রশ্ন করারও সুযোগ পান কিয়ারোস্তামি। সেই প্রশ্ন ও তাঁর উত্তরে উঠে আসে কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার।

একটা ছবি কী করে অভিনেতা, নির্মাতা ও দর্শককে একই সঙ্গে গভীর অনুভূতির সাগরে ডুবিয়ে দেয়, তার অন্যতম উদাহরণ ক্লোজ-আপ। কিয়ারোস্তামি এই গল্প সাময়িকীতে পড়ার পর বাস্তবে আদালতে মামলার শুনানি ক্যামেরায় ধারণ করেন। আবার ওই সাংবাদিক, বাড়িওয়ালা ও সাবজিয়ানকে দিয়েই আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অভিনয় করিয়ে নেন। বাস্তবের মানুষগুলোই একই ভূমিকায় দেখা দেয় ক্যামেরায়।

ব্রেথলেস ছবির পোস্টার
ব্রেথলেস ছবির পোস্টার

সবশেষে বলব, জ্যঁ লুক গোদারের কথা। তখন কাইয়ে দু সিনেমা (ফরাসি চলচ্চিত্র সাময়িকী) ঘিরে একদল তরুণের সে কী উচ্ছ্বাস! স্টুডিও ঘরানার বাইরে গিয়ে কম বাজেটে নতুন ধারার এক সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়, ন্যুভেল-ভেগ বা ফরাসি নবতরঙ্গ আন্দোলন নামে যা পরিচিতি পায় সারা বিশ্বে। গোদার তাঁর প্রথম সিনেমা ব্রেথলেস নির্মাণ করে এই আন্দোলনে শামিল হলেন। এক প্রশিক্ষণার্থী সাংবাদিক ও একজন তুখোড় অপরাধীর প্রেম নিয়ে ছবির গল্প। প্রামাণ্যচিত্রের ঢং আর সম্পাদনায় জাম্প কাটের ব্যবহার দিয়ে নতুন এক নির্মাণধারা নিয়ে এলেন নির্মতা, যা ফরাসি মূলধারার সিনেমা নির্মাণকে যেন দুম করেই লাত্থি দিয়ে বসল।

তিন ঋষি চলচ্চিত্রকারের এই তিনটি ছবি আপনাকে শিল্পের ক্ষুধা মেটাবে।