বছর বাইশ আগের কথা। ভর্তি ছিলাম ঢাকা শিশু হাসপাতালে। মফস্বল শহর থেকে সেই দফায় রাজধানীতে আগমনের হেতু ছিল চিকিৎসাসেবা গ্রহণ। মনে পড়ে, উচ্ছল শৈশবের মধ্যে হাসপাতালে বন্দী ১০টি দিনকে ‘কাজে’ লাগিয়ে নিয়েছিলাম ছোট্ট আমি। ১৮ খানা ছড়া লিখেছিলাম সেই ১০ দিনে। চঞ্চলতায় ভরা জীবনে অসুস্থতা ছাড়া আর স্থিরতা কোথায় বলুন! ফিরে আসি বর্তমানে। চিকিৎসক হিসেবে পেশাগত ব্যস্ততা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্য সময় ব্যয় এবং পত্রিকার ফিচার পাতার টুকটাক লেখালেখি—ত্রিমুখী ব্যস্ততায় নিজের মনের কথা লেখার সুযোগ কম। গত জুনে দ্বিতীয় দফায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ‘অবসর’ পেলাম বলেই না এভাবে কলম হাতে নেওয়া গেল, লেখাটা শুরু করা গেল।
প্রথম আলোর নিয়মিত পাঠকদের অনেকে গত বছরের ‘কোভিড আইসিইউ থেকে বলছি’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটির কথা মনেও করতে পারেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানকালীন করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসক হিসেবে লিখেছিলাম সেটি। এবারের বিষয়টা কিন্তু আলাদা। প্রায় ১০ মাস কোভিড আইসিইউতে কাজ করে নিজের বিভাগ নিউরো আইসিইউতে ফেরার মাস দুয়েক পর হলো করোনা সংক্রমণ। গৃহবন্দী সময়ে তাই পুনঃপ্রবেশ। নিজের লেখার জগতে আবার ‘অনুপ্রবেশ’! তবে যেটা বোঝা গেল, চিকিৎসক হিসেবে কর্মস্থল থেকে নয়, বরং আর দশজন মানুষের কাতার থেকেই এবার হয়েছে সংক্রমণ। গণপরিবহন, দোকান, ব্যাংক—সর্বত্রই তো আমার বিচরণ। পথ চলেছি নানা প্রয়োজনে, চেষ্টা করেছি স্বাস্থ্যবিধি মানতে।
গৃহবন্দী সময়ে ঘরের জানালাই যেন মনের জানালা। কোনো বাড়ির অন্য রকম আলো দেখা যায়। পিচঢালা পথটা বৃষ্টিভেজা। ঘর থেকে বৃষ্টি দেখার মুহূর্ত। কাছেই একটা দোকানের ছাদে টুপটাপ পড়ে বৃষ্টি, জলের ওপর জলপতনে সৃষ্টি হয় তরঙ্গ। প্রকৃতির ছন্দকে কে বেঁধে রাখতে পারে? অসুস্থতার মাঝে যখন ভালো লাগত, বইয়ের পাতা ওল্টাতাম। পড়লাম রাইফেল রোটি আওরাত, চিলেকোঠার সেপাই। প্রিয় কবি হেলাল হাফিজের কবিতা। শহীদুল্লা কায়সার, সৈয়দ মুজতবা আলী আর জাহানারা ইমামের কিছু লেখা। নিজের বারান্দায় দেখা যায় অলকানন্দা ফুল। দুটি নীল অপরাজিতা কিংবা একটি পদ্মলিকা। সব করার স্বাধীনতা। কিন্তু ঘরের বাইরে যাওয়া চলবে না, এদিকে প্রিয়জনদের প্রতীক্ষা আমার সুস্থতার। ভেবে দেখার বিষয় হলো, স্বাধীনভাবে পথচলার সময় স্বাধীনতাকে উপভোগ করার অবকাশ মেলে না। কিন্তু গৃহবন্দী সময় পারি না তো স্বাধীনভাবে পথের বুকে ছুটতে?
পথ নিয়ে আরও কথা আছে। পথের পাশের উঁচু ভবন থেকে পথের বুকে থুতু ফেলেন কেউ। মাস্ক পরে কিংবা না পরে বাইরে বেরোনো পথচারী পথ চলতে কবার থুতু ফেলেন, তা নিয়ে একটা জরিপ হতে পারে বোধ হয়। আর ব্যবহৃত মাস্ক পথের বুকে ফেলে যাওয়ার স্থির চিত্র ধারণ করলে কেমন হয়? কেউ কেউ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেও সবাই কি হাঁচি-কাশির আদবকেতা মানছেন? গত বছরের মার্চ থেকে আজ পর্যন্তও অনেকে মানতে নারাজ করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতাকে। সবার সুস্থতার জন্য যে সবারই সচেতনতা প্রয়োজন, এই বিষয় আজও গুরুত্ব পাচ্ছে না অনেকের কাছেই।
মাত্র পাঁচ দিনে হাজার মৃত্যুর কারণ যে ভাইরাস, তার বিস্তার সম্পর্কে সচেতন হবেন না-ই বা কেন, বলুন? একটু ব্যাখ্যা করে বলি। আপনি মাস্ক পরেছেন ঠিকঠাক, কিন্তু মাস্কবিহীন কোনো ব্যক্তি আপনার পাশ কাটানোর সময় নাক-মুখ না ঢেকেই কেশে উঠলেন খক খক, কিংবা দিলেন এক হাঁচি। মাস্ক পরিহিত আপনার সুরক্ষা কিন্তু তাতে কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হলো। আবার হয়তো ধীরে ধীরে একসময় চালু হবে গণপরিবহন। সেখানে কিছু মানুষ মাস্ক আর স্যানিটাইজার ব্যবহার করে নিজেদের সুরক্ষিত ভাবলে কিন্তু হবে না, বরং সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। করোনা প্রতিরোধে কী কী করতে হবে, এ পাঠ বুঝি আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু সবাই মিলে সেই পাঠের চর্চা করাটা এখনো রপ্ত করে উঠতে পারিনি আমরা। তাই তো বাড়ছে সংক্রমণ।
করোনার টিকা নেওয়ার পরেও আক্রান্ত হতে পারেন যে কেউ, যেমন আমি হয়েছি। তবে টিকায় কমবে জটিলতা। তাই টিকা নিতে অবহেলা নয়। পরিবারের সবার তো বটেই, আশপাশে যদি এমন মানুষ থাকে, যিনি টিকার জন্য নিবন্ধন করতে সমস্যায় পড়তে পারেন (গৃহ সহায়তাকর্মী কিংবা নিরাপত্তারক্ষী হতে পারেন), তাঁকেও সহায়তা করুন। তবেই তো সোনার বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ‘মা’ শব্দটির সংজ্ঞা শিখেছি নতুন করে। ঘরে অন্তরীণ থাকা করোনায় আক্রান্ত ঘুমন্ত সন্তানের মুখে বৃষ্টির ছাঁট পড়ে ঘুম ভেঙে যাবে বলে নিজে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও বাইরে থেকে দরজা খুলে সেই ঘরে ঢুকে সন্তানের মাথার কাছের জানালাটা বন্ধ করতে আসেন যিনি, তিনিই ‘মা’। এমন মায়াময়ী মায়েরা আমার বাংলার গৌরব। সন্তানের জন্য তাঁদের দুশ্চিন্তা বুঝি থেমে থাকে না মুহূর্তের জন্যও। কিন্তু করোনায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বয়স্করাই—মা, বাবা, তাঁদের মতো অন্যরা। তাই আমরা যারা পথে বেরোই, নিজেদের ঘরের এই মানুষগুলোর জন্যই আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এই বছরেই খুব কাছাকাছি সময়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরিচিত পরিমণ্ডলে দুজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একজন আমার পরিবারেরই অংশ ছিলেন—কিশোর বয়সী একটি সন্তানকে রেখে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো এক মাকে, বড় অসময়ে। আর ওদিকে আমার সহকর্মীর বাবা মারা গেলেন আমাদেরই কর্মস্থলে। ধার করা কথা বলি এবার, মৃত্যু কেবল একটা সংখ্যাই, যতক্ষণ না তা আপনার নিজের পরিমণ্ডলে আঘাত হানছে। পরিসংখ্যানের হাজার হাজার মৃত্যুকে আমরা ভুলে যাই। কিন্তু পরিসংখ্যানে যদি মাত্র একটি মৃত্যুও থাকে, আর সেটি হয় নিজের কাছের কারও মৃত্যু, তা কিন্তু ঠিকই আমাদের শূন্য করে দিয়ে যায়। আর কোভিড আইসিইউর অভিজ্ঞতায় তো জানাই আছে, কী নিদারুণ কষ্ট পান রোগীরা। নিজের চোখে দেখা যে। হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে আকুতি কিংবা রোগীতে ভরে যাওয়া হাসপাতালের কাছে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার মর্মস্পর্শী কাহিনি তো সংবাদমাধ্যমে আসছেই। পরিস্থিতি এখন কতটা করুণ, তা বুঝতে করোনা ইউনিটের চিকিৎসক কিংবা কর্মী না হলেও চলে। তাই আবারও অনুরোধ—সচেতন হোন।
লেখক: চিকিৎসক, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা