জুয়াড়ি ও ইঁদুর

অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

ব্যাংকের ভল্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেলেন এক জুয়াড়ি।

ক্যাশ ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে যখন তিনি ভল্টের রাশি রাশি টাকার সামনে দাঁড়ালেন তখন তার মাথার ভেতর কয়েকটা কোকিল একসঙ্গে ডেকে উঠল; তার জুয়া বাসনার পাতাঝরা বনে বয়ে গেল একটা দমকা হাওয়া।

কিন্তু সেদিন রাত থেকে একটা পৌনঃপুনিক দুঃস্বপ্ন তার ঘুম ভাঙাতে থাকে। তিনি দেখেন, এক গৃহস্থের গোলাঘরে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছেন, আশপাশে অসংখ্য ইঁদুর। ছোট-বড় এন্তার ইঁদুরের মাঝখানে নিজেকেও তার মনে হতে থাকে একটা ধাড়ি ইঁদুর, আর সত্যি সত্যি তার মুখ দিয়ে বেরোতে থাকে কিচকিচ আওয়াজ। তখন একটা বন্ধ ঘর থেকে টাইপরাইটারের মতো খটখট শব্দ এলে আতঙ্কে তার ঘুম ভেঙে যায়।

এই বাজে স্বপ্ন দেখাটা বন্ধ হলো যেদিন তিনি ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে আইপিএলের খেলায় বাজি ধরলেন। ব্রিটিশ অনলাইন জুয়ার কোম্পানি বেট-৩৬৫-তে আগেও কয়েকবার জুয়া খেলে তিনি হেরেছেন। এবার জিতলেন। তবে ঠিক করলেন ভল্টের টাকা নিয়ে আর জুয়া খেলবেন না।

এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই বাজে স্বপ্নগুলো তার ঘুমে হানা দিতে থাকল। একবার দেখলেন, ফিলিপাইনের আসেয়ানা অ্যাভিনিউয়ে শত শত ইঁদুরের স্রোতের ভেতর ছুটছেন। সবার গন্তব্য সিটি অব ড্রিমস ম্যানিলা। তিনি এগোচ্ছেন অগুনতি ইঁদুরের দৌড়ের সঙ্গে একটা অদ্ভুত ছন্দ বজায় রেখে আর এতগুলো ইঁদুরের কিচকিচ শব্দে তৈরি হয়েছে দারুণ এক আবহসংগীত। পরে দেখলেন একটা ঘূর্ণমান রুলেত টেবিলের ওপর আরও কয়েকটা ইঁদুরের সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন। ঠিক তখনই লেজসমেত একটা সত্যিকারের ইঁদুর হিসেবে দেখতে পেলেন নিজেকে। পুরোনো আতঙ্কটা ফিরে আসামাত্র ক্যাসিনোর আলো নিভে গেল। মনে হলো তাদের ব্যাংকের পেছনে থাকা গুদামঘরে আটকা পড়ে গেছেন, দমবন্ধ অন্ধকারে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

এসব পৌনঃপুনিক স্বপ্ন তার ঘুমের শান্তি কেড়ে নিল।

ইঁদুরের দুঃস্বপ্ন তাড়াতে তিনি বেট-৩৬৫-তে বাজি ধরা চালিয়ে গেলেন। ভল্ট থেকে তিনি কত টাকা সরিয়েছেন, তার হিসাব তার কাছে ছিল না। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে আসা তদন্ত কমিটি জানাল, আড়াই কোটি টাকা।

সিএমএম কোর্টে জবানবন্দি দিতে গিয়ে তিনি একবার বলতে গেলেন, স্বপ্নে ইঁদুরগুলো...।

বিচারক অবাক হয়ে ভ্রু কোঁচকালেন, ইঁদুর!

এপিটাফ

রহস্যময় খুনগুলোকে কবি শওকত আজিজের কাছে মনে হয় সংকেতভাষায় লেখা একেকটা খোলা চিঠি।

এ নিয়ে ছাপা হওয়া খবরগুলো তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। খেয়াল রাখেন চিঠিগুলোতে তার উদ্দেশে কিছু লেখা আছে কি না। তার ধারণা হয়, এসব চিঠিতে তার জন্য কোনো বার্তা নেই। তিনি নিহত লোকদের কারও মতোই নন। কাজেই চিঠিগুলো তাকে লেখা নয়।

পরক্ষণেই মনে হয়, হত্যাকারীরা জানে যে নিহতেরা এসব চিঠি পড়বে না। কাজেই এগুলো তাদের উদ্দেশেও লেখা নয়।

তাহলে চিঠিগুলোর প্রাপক কারা?

নিশ্চয়ই জীবিতরা। আর তাদের একজন হিসেবে কবি শওকত আজিজও এগুলোর প্রাপক। তার জন্য নিশ্চয়ই গোপন কোনো বার্তা এতে আছে। সেটা হয়তো কেবলই এক সতর্কবার্তা।

পত্রপ্রেরককে একটা জবাব লেখার ইচ্ছা হয় তার। তিনি লেখেন:

হে শিকারি, তোমার সংকেতগুলো মৃত্যু আর ভয় হয়ে আসে।

আমরা যে ধূলি হই, ভয় আর মৃত্যু হই!

তোমরাও সে রকম কত কত ধূলি!

আমরা যে হারিয়েছি সিকি,

তোমরাও কত না আধুলি।

এই খোলা চিঠি কবি তার বাড়ির দেয়ালে লিখে রাখেন। এটা পড়ে কেউ কেউ ভাবেন, এ কেমন এপিটাফ!