ভাবসম্পদ ও রাজনৈতিক গঠন

সাধুমেলায় সংগীত পরিবেশন করছেন বাউলেরা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০১৯ছবি: কবির হোসেন

বাংলার ‘ভাবসম্পদ’ বলতে আমরা যদি কেবল সাহিত্য, সঙ্গীত বা শিল্পকলার ভাণ্ডার বুঝি, তাহলে আমরা এই বিশেষ ধরনের সম্পদের চরিত্র, গভীরতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্যকে সীমিত করে ফেলি। আসলে ভাবসম্পদ একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির সমষ্টিগত অভ্যন্তরীণ জগৎ—যেখানে অনুভব, কল্পনা, চিন্তা, নৈতিকতা এবং জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পদ্ধতি একত্রে সঞ্চিত থাকে। সেটা কেবল বাইরে প্রকাশিত সংস্কৃতি না; বরং ভাবসম্পদ সংস্কৃতির পূর্বশর্ত, একটি জনগোষ্ঠির প্রাণশক্তি। এই অর্থে ভাবসম্পদ হলো জীবন্ত জ্ঞানতন্ত্র—যা ভাষা, দেহ, অভ্যাস এবং সামাজিক চর্চার মধ্যে প্রবাহিত হয়।

বাংলার ভাবসম্পদের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ভাব’ ও ‘রস’ ধারণা—যা ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলার লোকজ ও ভক্তিমূলক ধারায় স্বতন্ত্র একটি রূপ পেয়েছে। ভারত বহুভাষিক, বহু ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং বিপুল বৈচিত্রের ভূখণ্ড। তাই ‘ভারতীয় নন্দনতত্ত্ব’ নামক একাট্টা সংস্কৃতি নাই। বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য বিচার করলে বাংলায় ‘ভাব’ সংস্কৃত ‘ভূ’ বা ‘হওয়া’ থেকে দানা বাঁধলেও তাকে কেবল অনুভূতি বা উপলব্ধি হিসেবে পর্যবসিত করা যায় না। বাংলায় ভাবুকতা বা ভাবচর্চা জ্ঞানরূপ, উপলব্ধির বিশেষ পদ্ধতি। যেমন বৈষ্ণব ভাবধারায় ‘রস’ মানে কেবল নান্দনিক আনন্দ নয়, বরং ঈশ্বর, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কের অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য (Raghavan, 1970, pp. 112–115)। এইভাবে ভাবসম্পদ মানুষ ও জগতকে সম্পর্কনির্ভর বাস্তবতা হিসেবে দেখতে শেখায়—যেখানে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং তার লীলাকারি অংশ।

ফরহাদ মজহার

এই ভাবসম্পদের প্রধান বাহন হলো ভাষা। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা চিন্তার কাঠামো নির্মাণ করে। আমরা যেভাবে ভাষায় ভাবি, সেভাবেই আমরা জগৎকে বুঝি। ফলে ভাষার ভেতরে যে শব্দ, উপমা ও ধারণাগুলো আছে সেগুলোই আমাদের অভিজ্ঞতার সীমা নির্ধারণ করে। ভিটগেনস্টাইনের বিখ্যাত কথাটা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, ‘আমার ভাষার সীমাই আমার জগতের সীমা’ (Wittgenstein, 1922/2001, §5.6)। বাংলার ক্ষেত্রে ‘ভাব’, ‘রস’, ‘মায়া’, ‘লীলা’, ‘সংক্রান্তি’—এগুলো কেবল শব্দ নয়, বরং ভাবসম্পদের মৌলিক ধারণা, যা একটি বিশেষ ধরনের জাগতিক অনুভব বা উপলব্ধিকে সম্ভব করে তোলে।

কিন্তু ভাষা নিরপেক্ষ নয়; এটি ক্ষমতার ক্ষেত্র। পিয়ের বুর্দিয়োর ভাষায়, ভাষা একটি ‘সিম্বলিক পাওয়ার’, যেখানে নির্দিষ্ট ভাষা ও উচ্চারণকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য ভাষিক রূপগুলোকে প্রান্তিক করা হয় (Bourdieu, 1991, p. 55)। ঔপনিবেশিক ও পরবর্তী আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার এই প্রয়োগ স্পষ্ট। ইংরেজি ভাষা ও তার ধারণাগত কাঠামো যখন শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন স্থানীয় ভাষার ভাবসম্পদ ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। মানুষ তখন নিজের অভিজ্ঞতাকে নিজের ভাষায় ভাবতে পারে না; অন্য ভাষার ধারণার মাধ্যমে নিজের জগতকে তখন ব্যাখ্যা করতে হয়। এই প্রক্রিয়াই একটি গভীর ‘আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’ (ইন্টারনাল কলোনাইজেশন) তৈরি করে, যা ফ্রানৎস ফানোঁর বিশ্লেষণে বিশেষভাবে উঠে এসেছে (Fanon, 1967, pp. 18–20)।

আধুনিকতার এই হালে থাকলে ভাবসম্পদ আর জীবন্ত অভিজ্ঞতা থাকে না, নিছকই ব্যবহারযোগ্য ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ হয়ে ওঠে; প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পদের প্রশ্ন তখন গৌণ হয়ে যায়।

এখানে বলে রাখা দরকার বাংলাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রের ধারণা ইত্যাদি সবক্ষেত্রে ‘আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’ কেন বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতি পুনর্গঠনের প্রধান ক্ষেত্র, সেটা আমরা সিরাজুল আলম খানের রাজনীতিতে বারবার উল্লেখিত দেখতে পাই। ‘সুবেহ বাংলা’ এবং পলাশীর আম্রকাননে ক্লাইভের সৈন্যের বিরুদ্ধে বাংলার লড়াইয়ের স্মৃতি ও ইতিহাস তাই তাঁর কাছে রোমান্টিক অতীতমুখিতা ছিল না। ইংরেজ চলে গিয়েছে, কিন্তু মনে, মানসিকতায়, ভাবে ও চিন্তায় আমরা এখনো ব্রিটিশ কলোনি। তাহলে নিজেদের ভাবসম্পদ পুনরুদ্ধার মানে ‘আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’ থেকে নিজেদের মুক্ত করার লড়াই। পাশ্চাত্যের গোলামি থেকে মুক্তির প্রশ্ন বাদ দিয়ে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা আমাদের স্বাতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। রাজনৈতিকভাবে নিজেদের গঠন করাও অসম্ভব।

ভাষিক সংকোচনের সরাসরি প্রভাব পড়ে সংস্কৃতির ওপর। কারণ সংস্কৃতি আসলে ভাবসম্পদের দৃশ্যমান রূপ। যখন ভাবসম্পদ জীবন্ত থাকে, তখন সংস্কৃতি একটি চর্চা—যেখানে খাদ্য, কৃষি, শরীর, উৎসব ও সামাজিক সম্পর্ক একত্রে কাজ করে। কিন্তু যখন ভাবসম্পদ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সংস্কৃতি একটি ‘প্রদর্শনীতে’ পরিণত হয়। নববর্ষ উদ্‌যাপনের বর্তমান রূপ এই বিচ্ছিন্নতার উদাহরণ—যেখানে লোকজ উপাদানগুলো উপস্থিত, কিন্তু তাদের জীবনচর্চাগত ভিত্তি অনুপস্থিত। এর বিপরীতে চৈত্র সংক্রান্তির মতো চর্চাগুলো ভাবসম্পদের সঙ্গে যুক্ত—যেখানে খাদ্যাভ্যাস, ঋতুচক্র, দেহ ও প্রকৃতি একত্রে একটি জৈবিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

এখানেই ভাবসম্পদের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তার ভাষা, সময়চেতনা ও ভাবের কাঠামোকে পরিবর্তন করা অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। ঔপনিবেশিক শাসন এই কাজটি করেছে—সময়ের সরলরৈখিক ধারণা, আধুনিক ক্যালেন্ডার, এবং উন্নয়নমুখী চিন্তাধারা চাপিয়ে দিয়ে স্থানীয় চক্রাবর্ত সময়চেতনা ও সম্পর্কনির্ভর জ্ঞানকে প্রান্তিক করেছে (Anderson, 1983, p. 24)। এর ফলে মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং একটি আরোপিত বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে।

আন্তোনিও গ্রামশি এই কাণ্ডকে ‘আধিপত্য’ বা ‘হেজেমোনি’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন—যেখানে শাসক শ্রেণি তাদের সংস্কৃতি ও চিন্তাকে ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপার বলে কায়েম রাখে (Gramsci, 1971, p. 323)। বাংলার ভাবসম্পদকে আমরা প্রান্তিক করে ফেলেছি। আমরা আমাদের স্মৃতি, ইতিহাস ও জীবনচর্চার সত্যগুলো হারিয়ে ফেলছি; মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিশাবে শহুরে মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে প্রাণপণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছি। সংক্রান্তি বা বিশেষভাবে চৈত্র সংক্রান্তিকে ভুলে গিয়ে ইংরেজি নববর্ষের আলোকে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন ঔপনিবেশিক আধিপত্যেরই অংশ। ফলে ভাবসম্পদ হারানো মানে কেবল কিছু সাংস্কৃতিক উপাদান হারানো নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর নিজেকে বোঝার ক্ষমতা এবং নিজেকে নতুনভাবে নিজে স্বরূপে গঠন করবার শক্তি হারানো।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ভাবসম্পদ রক্ষা করা একটি মৌলিক রাজনৈতিক কাজ। এটি কোনো রোমান্টিক অতীতচর্চা নয়, বরং একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত প্রতিরোধ। ভাবসম্পদ রক্ষা মানে ভাষাকে জীবন্ত রাখা, অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া, এবং বিকল্প জ্ঞানতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা। আর্তুরো এস্কোবারের ‘প্লুরিভার্স’ ধারণা এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে একাধিক জগত ও জ্ঞানতন্ত্রের সহাবস্থান স্বীকৃত হয় (Escobar, 2018, p. 4)। বাংলার ভাবসম্পদ সেই বহুত্বের একটি বাস্তব রূপ।

ভাবসম্পদ চর্চার বাস্তব রূপ হিসেবে আমরা দীর্ঘকাল ধরে নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষকদের সঙ্গে কীভাবে পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র সুরক্ষা ও বিকাশের লড়াই করছি, তা লিখে বোঝানো কঠিন। নয়াকৃষির যেকোনো বিদ্যাঘরে কয়েকদিন থাকলেই সেটা সম্যক উপলব্ধি করা যাবে। নয়াকৃষি আন্দোলন বা কৃষিকে পরিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষার বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চা হিশাবে গড়ে তোলার অর্থ হচ্ছে আমরা নতুনভাবে জগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নির্ণয়ের শর্ত তৈরি করে চলেছি। ভাবসম্পদের পুনরুজ্জীবন তাই কোনো রোমান্টিক কিংবা নিছকই সাংস্কৃতিক ব্যাপার নয়, বরং ভাবের বিকাশ মানে নিজেদের নতুনভাবে গঠন করার রাজনীতি। ঔপনিবেশিকতা ও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন বা সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে নতুনভাবে জীবনব্যবস্থা রচনা ও বাস্তবায়নের লড়াই। নয়াকৃষি কেবল উৎপাদনের পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং একটি সম্পর্কচর্চা হিসেবে বিবেচনা করে—যেখানে মাটি, পানি, বীজ, খাদ্য ও মানুষ একত্রে একটি জৈবিক ও নৈতিক সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত। এই চর্চার মাধ্যমে ভাবসম্পদ কেবল সংরক্ষিত হয় না, তা পুনরুৎপাদিত হয়, নতুনভাবে গড়ে ওঠে এবং নতুন সমাজ গঠনের শর্তগুলো সহজে আমরা ধরতে ও বুঝতে পারি।

অতএব, বাংলার ভাবসম্পদ কোনো অতীত, স্থির বা নির্জীব ভাণ্ডার নয়; বরং চলমান জীবন্ত প্রক্রিয়া। ভাষার মধ্যে, দেহের মধ্যে, চর্চার মধ্যে, জগতের সঙ্গে সপ্রাণ সম্বন্ধ রচনা ও আনন্দের মধ্যে বেঁচে থাকে। নয়াকৃষির রণধ্বনি তাই ‘সহজ পথে আনন্দ’। এর মানে খুবই সহজ। প্রজাতি হিশাবে মানুষ যে সহজাত বৃত্তি জিনে জন্মগ্রহণ করে সকল বৃত্তির সামগ্রিক বা সামষ্টিক সম্ভাবনা যাচাই করতে পারা এবং মানবেতিহাসের বিকাশের সঠিক পথ চিনে নিয়ে সেই পথ অনুসরণ করা। এক কথায় মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে বিকশিত করা, ভাবসম্পদ রক্ষা মানে কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত করা। নিজের ভাবসম্পদ না চিনলে কোনো সমাজ তার জগতে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না, নিজের জগতকে চিনতে পারে না—এবং নিজেকে চিনতে না পারলে কোনো স্বাধীনতাই প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। তাই ভাবসম্পদ শুধু সাংস্কৃতিক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি একটি অস্তিত্বগত প্রশ্ন। মানুষ কীভাবে বাঁচে, কীভাবে জগতকে অনুভব করে এবং নিজের অবস্থানকে কীভাবে বোঝে—এই সবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে তার ভাবসম্পদ। এই কারণে ভাবসম্পদের ক্ষয় মানে কেবল ভাষার ক্ষয় নয়, সংস্কৃতির ক্ষয় নয়—বরং মানুষের নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি নড়ে যাওয়া।

আধুনিকতার প্রকল্প, বিশেষত ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, এই ভাবসম্পদের ওপর গভীর ও বিধ্বংসি আঘাত হানে। আধুনিকতা মানুষের অভিজ্ঞতাকে বিমূর্ত ধারণায় রূপান্তরিত করে, সম্পর্ককে বস্তুতে পরিণত করে এবং সময়কে জীবন্ত চক্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি পরিমাপযোগ্য এককে নামিয়ে আনে। মার্টিন হাইডেগারের ভাষায়, আধুনিক প্রযুক্তিগত চিন্তা জগতকে ‘স্ট্যান্ডিং–রিজার্ভ’ বা ‘সম্পদভাণ্ডার’ হিসেবে দেখে—যা ‘কাঁচামাল’ মাত্র, ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত (Heidegger, 1977, p. 17)। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল প্রকৃতির ক্ষেত্রেই নয়, মানুষের ভাবসম্পদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হয়। ভাষা, সংস্কৃতি, অনুভব—সবকিছুই তখন ব্যবহারযোগ্য উপাদানে পরিণত হয়।

আধুনিকতার এই হালে থাকলে ভাবসম্পদ আর জীবন্ত অভিজ্ঞতা থাকে না, নিছকই ব্যবহারযোগ্য ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ হয়ে ওঠে; প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পদের প্রশ্ন তখন গৌণ হয়ে যায়। ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, বাজারজাত করা যায় কিংবা প্রদর্শন করা যায়। লোকসংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপনাগুলো—উৎসব, মেলা, শোভাযাত্রা—এই রূপান্তরের লক্ষণ। এখানে ভাবের উপস্থিতি আছে, কিন্তু তা জীবন্ত নয়; বরং পুনর্নির্মিত, মঞ্চস্থ এবং প্রায়ই তার প্রাথমিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন।

এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে ভাবসম্পদকে পুনরুদ্ধার করা মানে কেবল অতীতের দিকে ফিরে যাওয়া নয়; বরং বর্তমানের পর্যালোচনা এবং তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে নিজেদের রাজনৈতিক কর্তাসত্তা গঠনের কর্তব্যের প্রতি হুঁশিয়ার থাকা। ভাবসম্পদ তাই নিছকই অতীত বা ঐতিহ্যের ব্যাপার হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে পর্যালোচনামূলক পুনর্গঠন। এই পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জ্ঞানকে পুনরায় দেহের সঙ্গে, অভিজ্ঞতার সঙ্গে এবং চর্চার সঙ্গে যুক্ত করা। মরিস মের্লো-পন্তি দেখিয়েছেন, আমাদের জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের কাজ নয়; এটি দেহগত—‘দ্য বডি ইজ আওয়ার জেনারেল মিডিয়াম ফর হ্যাভিং আ ওয়ার্ল্ড’ (Merleau-Ponty, 1962, p. 146)। বাংলার ভাবসম্পদ এই দেহগত জ্ঞানকে ধারণ করে—খাদ্যের স্বাদে, ঋতুর অনুভবে, মাটির স্পর্শে।

এখানেই সংক্রান্তি, বিশেষত চৈত্র সংক্রান্তির মতো চর্চাগুলোর তাৎপর্য নতুনভাবে উদ্ভাসিত হয়। সংক্রান্তি একটি ধারণা নয়; এটি একটি অভিজ্ঞতা। এই সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ উপলব্ধি করে তার আবাস তার দেহে। জগৎ বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তারই সম্প্রসারিত দেহ, যার মধ্যে ‘আমি’ বাস করেন, যাঁকে আমরা ‘আত্মা’ বলি। এই সেই সময় যখন দেহের মাধ্যমেই আমরা সময় বা কালচেতনা উপলব্ধি করি। গরমের আগমন, শরীরের ক্লান্তি, খাদ্যের পরিবর্তন, প্রকৃতির রূপান্তর ইত্যাদি অভিজ্ঞতা কোনো ক্যালেন্ডার দিয়ে মাপা যায় না; দূর গ্রহ ও সূর্যের রাশিচক্র পরিভ্রমণ তখন দেহের উপলব্ধির বিষয়ে পরিণত হয়। জীবন্ত অভিজ্ঞতা দেহ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যাহা ভাণ্ডে তাহাই ব্রহ্মাণ্ডে, যাহা ব্রহ্মাণ্ডে তাহাই ভাণ্ডে।

এই অভিজ্ঞতাকে যদি আমরা গুরুত্ব না দিই, তাহলে আমরা এমন একটি জ্ঞানতন্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, যা বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল তাত্ত্বিক নয়; একই সঙ্গে রাজনৈতিক। কারণ যে জ্ঞান বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন, তা সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। মিশেল ফুকোর ভাষায়, জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—যে জ্ঞান প্রাধান্য পায়, তার ক্ষমতাই প্রতিষ্ঠিত হয় (Foucault, 1980, p. 52)। ফলে ভাবসম্পদকে প্রান্তিক করা মানে একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ভাবসম্পদ পুনরুদ্ধার একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তির প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে তার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিন্তা করতে শেখায় এবং সেই অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি ছাড়া কোনো বিকল্প সমাজ বা বিকল্প উন্নয়ন বা উন্নতির ধারণা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

নয়াকৃষিকে মুক্তির এই বাস্তব ক্ষেত্র হিশাবে বাংলাদেশের কৃষি সমাজ দীর্ঘকাল ধরে চর্চা করেন। একটি বাস্তব উদাহরণ। আরও উদাহরণ হতে পারে। এখানে কৃষি কেবল প্রাণবৈচিত্রভিত্তিক জৈব উৎপাদনপদ্ধতি মাত্র নয়; বরং জ্ঞানচর্চার একটি বিশেষ ধরন, একটি নীতি ও সম্পর্ক চর্চা। বীজ সংরক্ষণ, মাটির যত্ন, ঋতুচক্রের সঙ্গে কাজ করা—এসবের মাধ্যমে কৃষক তার ভাবসম্পদকে জীবন্ত রাখে। এই চর্চা তাকে কেবল খাদ্য উৎপাদক করে না, তাকে সজ্ঞান ও সক্রিয় উপলব্ধি এবং জ্ঞানোৎপাদক কর্তায় পরিণত করে। কৃষক মানে যিনি নিত্য প্রকৃতির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কচর্চার মধ্য দিয়ে যিনি নতুন সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করেন, জীবনযাপনকে সংগঠিত ও আনন্দময় করে তোলেন।

ভাবসম্পদ এভাবে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রও হয়ে ওঠে। আমাদেরকে ভিন্ন জগত কল্পনা করতে সাহায্য করে—যেখানে সময় কেবল অগ্রগতির মাপকাঠি নয়, বরং সম্পর্কের পুনর্গঠন; যেখানে অর্থনীতি কেবল মুনাফার হিসাব নয়, বরং জীবনের ধারাবাহিকতা; যেখানে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং জীবনের শর্তগুলোর পুনর্বিন্যাস।

এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য সচেতন প্রচেষ্টা জরুরি। ভাষাকে পুনরুদ্ধার করা, চর্চাগুলোকে জীবন্ত রাখা এবং জ্ঞানকে অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা। এই কাজ সহজ নয়, কারণ এই কাজ করতে নামলে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত ধারণা ও কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য করে। কিন্তু এই কাজ ছাড়া কোনো গভীর গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলার ভাবসম্পদ সেই অদৃশ্য শক্তি, যা দৃশ্যমান বাস্তবতা গঠনের শর্ত। এই সম্পদ ভাষার মধ্যে, সংস্কৃতির মধ্যে, দেহের মধ্যে বর্তমান থাকে। একে রক্ষা করা মানে কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়; বরং একটি জীবন্ত জগতকে রক্ষা করা—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও সময় একটি সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত। এই সম্পর্কই জীবনের ভিত্তি। আর সেই ভিত্তিকে পুনরুদ্ধার করা ছাড়া কোনো মুক্তি সম্ভব নয়।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

হদিস

1. Anderson, B. (1983). Imagined communities: Reflections on the origin and spread of nationalism. London: Verso.

2. Bourdieu, P. (1991). Language and symbolic power (J. B. Thompson, Ed.; G. Raymond & M. Adamson, Trans.). Cambridge, MA: Harvard University Press.

3. Eliade, M. (1959). The myth of the eternal return: Cosmos and history (W. R. Trask, Trans.). Princeton, NJ: Princeton University Press.

4. Escobar, A. (2018). Designs for the pluriverse: Radical interdependence, autonomy, and the making of worlds. Durham, NC: Duke University Press.

5. Fanon, F. (1967). Black skin, white masks (C. L. Markmann, Trans.). New York: Grove Press.

6. Foucault, M. (1980). Power/ knowledge: Selected interviews and other writings, 1972–1977 (C. Gordon, Ed.). New York: Pantheon Books.

7. Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. N. Smith, Eds. & Trans.). New York: International Publishers.

8. Heidegger, M. (1977). The question concerning technology and other essays (W. Lovitt, Trans.). New York: Harper & Row.

9. Merleau-Ponty, M. (1962). Phenomenology of perception (C. Smith, Trans.). London: Routledge.

10. Raghavan, V. (1970). The number of rasas. Madras: The Adyar Library.

11. Thapar, R. (2000). Cultural pasts: Essays in early Indian history. New Delhi: Oxford University Press.

12. Turner, V. (1969). The ritual process: Structure and anti-structure. Chicago: Aldine Publishing.

13. Wittgenstein, L. (2001). Tractatus logico-philosophicus (D. F. Pears & B. F. McGuinness, Trans.). London: Routledge. (Original work published 1922)