ত্রয়োদশ সংসদ কি গণতান্ত্রিক মাইলফলক হবে

সম্প্রতি ‘সিটিজেন্স ফোরাম বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘জাতীয় সংসদ: একটি গণতান্ত্রিক মাইলফলক’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার আমার সুযোগ হয়। আমার মনে হয়েছে, মাত্র একটি অধিবেশনের পর বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে একটি গণতান্ত্রিক মাইলফলক বলার সুযোগ নেই। এর জন্য আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কার্যকারিতা দেখাতে পারবে কি না, তা অনেকটা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্তের ওপর।

প্রথম পূর্বশর্তটি হলো কাদের নিয়ে সংসদটি গঠিত হয়েছে। যদি সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের নিয়ে এটি গঠিত হয় এবং তাঁদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের নেতা-কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে থাকে, তাহলে এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

তবে এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে যে প্রার্থী মনোনয়ন এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ঋণখেলাপি এবং বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার কারণে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে এবং তাঁদের প্রার্থিতা বৈধ করার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের ও নির্বাচন কমিশনের শিথিলতা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সংরক্ষিত আসন থেকে ‘নির্বাচিত’ একাধিক ব্যক্তির অযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পরে গঠিত সংসদে বিতর্কিত ব্যক্তিরা স্থান পাবেন না—এমন আশা অধিকাংশ নাগরিকেরই ছিল। এ ছাড়া আরপিও অনুযায়ী আইনের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট দলের নেতা-কর্মীদের ভোটে (অনেকটা দলীয় প্রাইমারির মতো) প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের কোনো প্যানেল তৈরি করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এটি কী করার জন্য ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত এবং সেই ম্যান্ডেট পালনে তারা কতটুকু সফল হবে, তার ওপর। গণভোটের প্রস্তাব হ্যাঁ-সূচক ভোটে জয়লাভ করায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’–এর অধীন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রাথমিকভাবে দুটি সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত। প্রথমটি হলো পাঁচ বছরের জন্য সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ এবং দ্বিতীয়টি হলো গণভোটে পাস করা ৪৮টি বিষয় ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে শপথ নেওয়া।

সরকারি দলের এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা প্রথম শপথটি নিলেও দ্বিতীয় শপথটি নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে গণভোটের মাধ্যমে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যদিও গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের মতামতই চূড়ান্ত এবং সংসদ সদস্যদের অবশ্যপালনীয়।

তৃতীয়ত, সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংসদ তার দায়িত্ব পালনে কতটুকু মনোযোগী এবং যাত্রার শুরুতেই সংসদ সদস্যরা কী করছেন তার ওপর। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ‘আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা’ দেওয়া হয়েছে। আইন অনুমোদন, পরিবর্তন, সংশোধন ও বাতিল আইন প্রণয়নের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া সংসদের দায়িত্ব সরকারের বাজেট পাস করা।

সংসদের অন্য একটি বড় দায়িত্ব হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সংসদ সদস্যদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রদান। এসব দায়িত্ব পালনে সংসদ কতটুকু কার্যকর, তা এখনো বলার সময় আসেনি।

তবে দলমত-নির্বিশেষে সংসদ সদস্যদের দাবিতে সরকার প্রতিটি উপজেলা পরিষদে তাঁদের জন্য একটি ‘বসার জায়গা’ নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়নে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হওয়ার সুযোগ করে দেবে, যা আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি স্তরে শাসনকার্য পরিচালনা করার কথা। সংসদ সদস্যদের এ কাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়া শুধু সংবিধানেরই লঙ্ঘন হবে না, এটি ‘কালারেবিলিটি’ (যেটি প্রত্যক্ষভাবে করা যায় না, তা পরোক্ষভাবে করা) সমস্যারও জন্ম দেবে।

বিদ্যমান উপজেলা আইনে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এরই মধ্যে কালারেবিলিটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে কার্যালয় স্থাপিত হলে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের অতীতের দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতি আবার ফিরে আসবে। কারণ, ‘মুখের কাজ নাক’ দিয়ে করার চেষ্টা হলে সমস্যা সৃষ্টি হতে বাধ্য। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতো ‘এমপিরাজ’ সৃষ্টি নিশ্চিত হবে, যার আলামত ইতিমধ্যেই অনেক এলাকায় দৃশ্যমান।

এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হওয়াটা হবে আদালতের রায়ের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ মামলায় [১৬ বিএলটি (এইচসিডি)(২০০৮)] বাংলাদেশ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রায় দেন যে মন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়নে যুক্ত হওয়া অসাংবিধানিক। তাই সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারের কাজ করলে আইন প্রণয়নকারীরা আইন ভঙ্গকারীতে পরিণত হবেন।

সংসদকে সত্যিকারভাবেই কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে, যাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন আরপিও অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ও বিদেশি শাখার বিধান থাকতে পারবে না, যার উদ্দেশ্য ছিল এগুলো বিলুপ্ত করা। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের আলাপ-আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগুলো ২০০৮ সালে আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটি এখনো কার্যকর করা হয়নি। আমাদের শিক্ষার মানে উৎকর্ষ ঘটাতে হলে শিক্ষক রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতি তথা ছাত্রদের ব্যবহারের রাজনীতি অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা আনন্দিত যে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই শিক্ষক রাজনীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমরা আশা করি, ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা বন্ধের ব্যাপারে তিনি উদ্যোগী ভূমিকা নেবেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আশা করি সব রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো যেন নির্দলীয় হয়। গত মাসে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করার জন্য আইন পাস করলেও কিছু রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই দলীয় মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করি, দলগুলো এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে এবং পরোক্ষভাবেও কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করবে না।

পরিশেষে, সংসদকে কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের সততা নিশ্চিত করতে এবং তাঁদের ব্যক্তি ও কোটারির স্বার্থের পরিবর্তে জনকল্যাণে নিবেদিত রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে দুটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করা আবশ্যক। দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী এবং তাঁদের অনেকেরই স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যরা যাতে তাঁদের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেরা বিত্তশালী না হতে পারেন, সে জন্য তাঁদের বার্ষিক সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান করা জরুরি।

সংসদ সদস্যদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘোষণা এবং বার্ষিক সম্পদের হিসাব প্রদানের জন্য একটি ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ প্রণয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদের কমিটিগুলোর এবং সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো সংসদ সদস্য দুর্নীতি বা অন্য কোনোরূপ অসদাচরণে জড়িত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননা তথা সংসদ ও সংসদ সদস্যদের মর্যাদাহানির অভিযোগে সংসদ থেকে বহিষ্কারসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

আশা করি, সরকার এ দুটি আইন প্রণয়নে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেবে, যাতে বর্তমান সংসদ সদস্যদের কেউই যেন অতীতের মতো অলিগার্কে পরিণত হতে না পারেন।

  • ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

    মতামত লেখকের নিজস্ব