অভিমত–বিশ্লেষণ
আমাদের অরক্ষিত প্রাণবৈচিত্র্য বনাম অসম বাণিজ্যচুক্তি
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে করা দুটি বাণিজ্যচুক্তির কারণে দেশের প্রাণবৈচিত্র্যজগতে নতুন সংকট, ঝুঁকি ও হুমকি তৈরি হলো কি না, তা নিয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ
টাঙ্গাইল শাড়িসহ দেশের ভৌগোলিক মহিমা বা জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনের (জিআই) স্বীকৃতি ও সুরক্ষার জন্য ২০০৮ সাল থেকে যখন লেখালেখি শুরু করি, রাষ্ট্র তখনো নিশ্চুপ। শিল্প মন্ত্রণালয় ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সংরক্ষণ) অধ্যাদেশের’ খসড়া তৈরি করেছে মাত্র, কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকার জনপরিসরে আলাপটি নিয়ে যেতে পারেনি। জন–অংশগ্রহণ ছাড়াই পাস হয় ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩’।
ভারত জামদানি শাড়িকে তাদের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করেছিল। আমরা তখন জামদানির জন্য লড়ছি। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা অববাহিকার গ্রামগুলোয় ঘুরি। জামদানি শাড়ির ভৌগোলিক মহিমার ভিত্তি বোঝার চেষ্টা করি। কেন এই মহিমা দুনিয়ার অন্য কোনো বাস্তুতন্ত্রে ফুটে ওঠে না। বহু তর্কের ঘাম ঝরিয়ে জামদানিকে রাষ্ট্রের প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ।
আদিতে ফুটি কার্পাস তুলার সুতা দিয়ে বোনা হতো জামদানি। শীতলক্ষ্যার পানি আর তিলবাজালের মতো ধান ছাড়া বোনা যায় না এই শাড়ি। নকশাবুটিগুলোও গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের নানা গাছগাছালি, ফুল-লতা, পাখি, মাছের মোটিফ থেকে। জানতে পারি—মাটি, পানি, শিশির, তুলা, ধান ও স্থানীয় প্রাণসম্পদই জামদানি মহিমার ভিত্তিমূল।
কেবল ঢাকাই জামদানি নয়; আমরা যখন সিলেটের শীতলপাটি, গ্রামীণ নকশিকাঁথা, গাজির গান, ধামাইল গীত, টাঙ্গাইল শাড়ি, বগুড়ার দই, সিলেটের সাতকরা, পদ্মার ইলিশ, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, মধুপুরের আনারস, মুক্তাগাছার মণ্ডা, শ্রীমঙ্গলের খাসি পান ও চা, পোড়াবাড়ির চমচম, বরেন্দ্রর ফজলি আম, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, বান্দরবানের বম চাদর, কুমিল্লার খাদি, রুহিতপুরি লুঙ্গি, কমলগঞ্জের মণিপুরি শাড়ি, যশোরের জামতলার গোল্লা, পটুয়াখালীর নাপ্পি, কুলিয়ারচরের শিদল শুঁটকি, অষ্টগ্রামের পনির, ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যপুরি আম, মহেশখালীর পান, ঝিটকার হাজারি গুড়, বাংলার কালো ছাগল, কালিয়াকৈরের ধনীর চিড়া, মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টি, পাবনার শাড়ি কিংবা সুন্দরবনের মধুর কথা বলি তখনো আমাদের সামনে তা বিশেষ বাস্তুতন্ত্রের রূপকল্প নিয়েই হাজির হয়।
এগুলো প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক ও উৎপাদন সম্পর্কের বোঝাপড়াকে জিআই পণ্যের মতো কোনো পাবলিক প্রতীকে রূপান্তর করে। আমরা এই সব প্রতীক নিয়ে গৌরব করি। অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় হিসেবে পাঠ করি। গ্রামীণ জীবিকা বা অর্থনীতির বিস্তার করি। কিন্তু যে প্রাণবৈচিত্র্য ঘিরে এসব মহিমা বিকশিত হয়, তা প্রশ্নহীন কাঠামোগত বৈষম্য, ঔপনিবেশিকতা, নয়া উদারবাদ, বহুজাতিক বাণিজ্য বাহাদুরি বা এমনকি জলবায়ু সংকটের জুলুমে মুমূর্ষু, নিখোঁজ ও রক্তাক্ত হয়ে থাকে।
একটা খুদে মৌমাছি থেকে বড় হাতির জীবন, বসতি, সংসার, খাদ্যচক্র কিছুই আর আজ নিরাপদে নেই; প্রতিদিন বেঘোরে মরে বন্য প্রাণ। প্রাণবৈচিত্র্য বিলুপ্তি, সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার বহুমুখী কারণ আছে। আমরা আলাপটি করছি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক বাণিজ্য চাপের ময়দানে দাঁড়িয়ে। সামনে রাখছি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জনসম্মতি ছাড়া স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে করা দুটি বাণিজ্যচুক্তিকে।
‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় রেসিপ্রোকাল বাণিজ্যিক চুক্তি’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তি (ইপিএ)’ নিয়ে এরই মধ্যে বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমন বাণিজ্যচুক্তির কারণে বহু অমীমাংসিত আঘাত ও জখম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের প্রাণবৈচিত্র্য জগতে আরেক নয়া সংকট, ঝুঁকি ও হুমকি তৈরি হলো।
প্রাণবৈচিত্র্য, লোকায়ত জ্ঞান ও মেধাসম্পদের অধিকার
মানুষের সভ্যতার রোশনাই, একই সঙ্গে প্রাণবৈচিত্র্যের গণবিলুপ্তিরও খতিয়ান। যেদিন থেকে ‘স্যাপিয়েন্স’ মানুষ প্রকৃতি থেকে কোনো প্রাণসম্পদ ‘নির্বাচন’ করা শুরু করল, সেই থেকেই তৈরি হলো বিবাদ, সংঘাত, লুণ্ঠন, দখল আর দূষণের শিকল। নীল, চা, কফি, আখ, কোকো, রাবার, ধান, তামাক, লবঙ্গ, কলা, ভুট্টা; গরু, হাতি, মুরগি বা ঘোড়ার মতো প্রাণসত্তার একতরফা দখল নিয়ে বাণিজ্য এখনো থামেনি।
অনুমান করা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ভর করে রেশম ও লাক্ষার মতো দুটি পোকার ওপর। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন টিকে আছে মৌমাছির দয়ায়। শালবনের মাটির তলায় দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নালা তৈরি করে উইপোকারাই পৌঁছে দেয় বৃষ্টির জল। প্রাণবৈচিত্র্যের জটিল সম্পর্কের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে গ্রামীণ লোকায়ত বিজ্ঞান ও জীবিকা। একটা খুদে পতঙ্গ বা বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণী বা এমনকি অদেখা অণুজীব সবাই এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সমতল থেকে পাহাড়, বাঙালি কি আদিবাসী, গ্রামীণ নিম্নবর্গ প্রাণবৈচিত্র্যের এই অবদানের প্রতি সাংস্কৃতিকভাবে নতজানু। কিন্তু এই প্রাণদর্শন অধিপতি উন্নয়ন আর মুনাফার নামে চুরমার হয়ে যায়। গ্রামীণ লোকায়ত জ্ঞানের একতরফা বাণিজ্যিক ছিনতাই ও প্রাণডাকাতি ঘটে।
তাঁতবস্ত্র, নকশিকাঁথা, ভেষজ চিকিৎসা, সংগীত কিংবা কুটিরশিল্প সরাসরি প্রাকৃতিক উপাদান ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে জড়িত। এসব ঘিরে লোকায়ত জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মেধাসম্পদ মূলত সর্বজনীন ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান, উভয় দেশের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিতে মেধাসম্পদের অধিকারের প্রশ্নটি মূলত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস এবং অন্যান্য অসম চুক্তির শর্তে বন্দী।
‘বাণিজ্য–সম্পর্কিত মেধাসম্পদ অধিকার চুক্তি’ প্রাণসম্পদ, জ্ঞানপ্রবাহ ও কারিগরি সবকিছুর ওপর পেটেন্ট করার অধিকার রাখা হয়েছে।
উত্তর-দক্ষিণ গোলার্ধে বিভাজিত ক্ষমতার দুনিয়ায় এক দুর্বল রাষ্ট্র কীভাবে মেধাসম্পদ সুরক্ষায় ‘কার্যকর’ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?
‘বাণিজ্য–সম্পর্কিত মেধাসম্পদ অধিকার চুক্তি’ বা ট্রিপসের ২৭.৩.খ ধারায় প্রাণসম্পদ, জ্ঞানপ্রবাহ ও কারিগরি সবকিছুর ওপর পেটেন্ট করার অধিকার রাখা হয়েছে। নিজস্ব ‘সুই জেনেরিস’ আইনি কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্র তা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু ট্রিপস চুক্তিতে বলা হয়েছে সেসব ‘সুই জেনেরিস’ কাঠামো ‘কার্যকর’ হতে হবে। এখনো দেশে প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর লোকায়ত জ্ঞানের মেধাসম্পদ সুরক্ষায় কোনো সক্রিয় ন্যায্য কাঠামো নেই। উত্তর-দক্ষিণ গোলার্ধে বিভাজিত ক্ষমতার দুনিয়ায় এক দুর্বল রাষ্ট্র কীভাবে মেধাসম্পদ সুরক্ষায় ‘কার্যকর’ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে? এই চুক্তির ফলে কোনো প্রাণপ্রজাতি বা লোকায়ত জ্ঞানের বায়োপ্রসপেক্টিং বা পাইরেসি ঘটলে কেবল মেধাসম্পদ অধিকারই খর্ব হবে না, প্রাণবৈচিত্র্যের নিরাপদ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান, উভয়ের সঙ্গে করা চুক্তিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য প্রটেকশন অব নিউ ভ্যারাইটিস অব প্ল্যান্টস (ইউপিওভি)’ স্বাক্ষর ও কার্যকরের শর্ত আছে। কিন্তু ইউপিওভি কেবল প্রজননবিদের স্বার্থ রক্ষা করে, কৃষকের নয়। তাহলে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৃষক দিলীপ তরফদার উদ্ভাবিত লবণসহনশীল চারুলতা বা রাজশাহীর তানোরের কৃষক নূর মোহাম্মদের খরাসহিষ্ণু নূর ধানের মেধাসম্পদের স্বীকৃতি কীভাবে সম্ভব?
প্রাণসম্পদ, ভৌগোলিক মহিমা ও কর্তৃত্ব
জামদানি জিআই-বিতর্ক থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে ভারত যখন টাঙ্গাইল শাড়িকেও তাদের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করে, আমরা প্রতিবাদ করি। ২৫ এপ্রিল ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ।
মুক্তিযোদ্ধা রঘুনাথ বসাকদের টাঙ্গাইল পাথরাইলের বাড়ির সিঁড়িঘরে মাতৃকুল ও পিতৃকুলের বংশলতিকা টানানো আছে। সেই তালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, ময়ারাম বসাকের ছেলে সুবল বসাক, সুবলের ছেলে উমেশ বসাক, উমেশের ছেলে যজ্ঞেশ্বর বসাক এবং তাঁর ছেলে রঘুনাথ বসাক। রঘুনাথের মাতৃকুললতিকা থেকে জানা যায়, তাঁর মা উষা রানী বসাক, উষার বাবা ক্ষেত্রমোহন বসাক, ক্ষেত্রমোহনের বাবা জানকীনাথ এবং তাঁর বাবা কমল বসাক। চণ্ডী ও পাথরাইল গ্রামের এমন বহু বসাক তাঁতি পরিবারের বংশলতিকা প্রমাণ করে, তারা ঐতিহাসিকভাবে টাঙ্গাইল শাড়ির বয়ন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক মহিমার ভিত্তি পোড়াবিন্নি ধানের খইয়ের তৈরি মণ্ড ও নানা স্থানীয় লোকজ মোটিফ। যেমন ধানছড়া, শঙ্খবুটি, দোয়েলবুটি, চড়ুইবুটি, রথবুটি, মাছিবুটি, মৌমাছিবুটি, কলসিবুটি, লতাবুটি কিংবা চমচমবুটি। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমও আরেক ভৌগোলিক মহিমা।
কোনো পণ্য জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম বেড়ে যায়। মার্কিন চুক্তিতে জিআই পণ্য সুরক্ষায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণের শর্ত আছে এবং বলা হয়েছে, কোনো জিআই পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যকে সেই নাম ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে (অনুচ্ছেদ-২.৪)। জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, ফজলি ও ক্ষীরশাপাতি আম, নকশিকাঁথা কিংবা সুন্দরবনের মধুর মতো দুটি রাষ্ট্রের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে কীভাবে বিচার করবে? মৌলিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ ও বিবরণ তাদের মনমতো না হলে বাংলাদেশ কি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক মহিমার নাম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারে?
জাপানের সঙ্গে করা চুক্তি বলছে, ট্রিপস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী জিআই পণ্য রক্ষা করতে হবে (আর্টিকেল-১২.২৫)। দুটি রাষ্ট্রের নিবন্ধিত জিআই পণ্যের সুরক্ষায় কোনো আলাপ না রেখে বরং জিআই পণ্যের সঙ্গে ট্রিপসের শর্তকে যুক্ত করে প্রাণ ও মেধাসম্পদের ওপর পেটেন্ট কর্তৃত্বের বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
উপেক্ষিত প্রাণবৈচিত্র্য সনদ ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার
১৯৯২ সালে বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত ‘আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ (সিবিডি)’ প্রাণসম্পদ ও লোকায়ত জ্ঞান সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দলিল। এতে প্রাণসম্পদ ও লোকায়ত জ্ঞানের বাণিজ্য রোধে ‘অংশগ্রহণ ও লভ্যাংশ বিনিময় ব্যবস্থাপনাকে (এবিএস)’ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো এই ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বা জাপান কোনো চুক্তিতেই সিবিডি সনদের উল্লেখ নেই।
মার্কিন চুক্তিতে বাংলাদেশকে কঠোরভাবে পরিবেশ সংরক্ষণের শর্ত আরোপ করা হলেও পরিবেশের এমন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে, যা কেবল ‘নন-রেসিপ্রোকাল’ বাণিজ্যকে সহায়তা করবে। তার মানে বিষ ও সংহারি বীজনির্ভর কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা, জীবাশ্ম জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ, প্লাস্টিক দূষণ কিংবা জিনপ্রযুক্তির বিপদের মতো অতি জরুরি পরিবেশবিষয়ক প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত থাকবে। কারণ, এসব পরিবেশবিষয়ক প্রশ্ন অধিক কার্বন দূষণকারী হিসেবে প্রমাণিত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটি বাণিজ্যিক বাধা হতে পারে।
প্রতিবছর ২২ মে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বৈশ্বিক প্রভাবের জন্য স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হবে (অ্যাকটিং লোকালি ফর গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট)’। পৃথিবীকে বাঁচাতে প্রাণপ্রকৃতি সংহারি সব প্রশ্নই আমাদের স্থানীয়ভাবে জোরালো করতে হবে। সিবিডি কিংবা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অমান্যকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ‘পরিবেশ-শর্ত’ মানতে বাংলাদেশ বাধ্য নয়।
মার্কিন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ গম, তুলা, সয়াবিন, বোয়িং বিমান, এলএনজি ও সামরিক সরঞ্জাম কিনতে হবে। এই শর্ত বাংলাদেশের প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর খাদ্যব্যবস্থার ওপর আরেক আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশ স্থানীয় কৃষিচর্চা এবং শস্যফসলের বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করবে। বিপুল পরিমাণ মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার শর্ত দেশের গবাদি প্রাণিসম্পদের বৈচিত্র্যকে ক্রমান্বয়ে বিলীন করবে।
মার্কিন চুক্তিতে জৈবপ্রযুক্তি ও ‘জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে রূপান্তরিত ফসল’–কে (জিএমও) বৈধতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে জিএমও বিটিবেগুন অনুমোদনের নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা কী আমাদের মনে আছে? এসব গবেষণার সব বৈশ্বিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে খটখটিয়া, দোহাজারি ও ইসলামপুরী বেগুনের আদি উৎসস্থলেই বিটিবেগুনের ‘উন্মুক্ত’ ট্রায়াল হয়েছিল। ২০১৪ সালে তখন প্রথম আলোয় বিটিবেগুনের রাজনীতি, বাণিজ্য ও সুরক্ষা নিয়ে লিখেছিলাম। আজ এক যুগ পরও মার্কিন চুক্তি জিএমও নিয়ে সেই বাণিজ্য ও রাজনীতিকেই প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া।
বাংলাদেশের জিআই পণ্য সিলেটের শীতলপাটিকে ইউনেসকো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। শীতলপাটির বুনন ও নকশাকেই কেবল সবাই অগ্রাধিকার দেয়, আড়ালে থেকে যায় এর ভিত্তিমূলের প্রাণবৈচিত্র্য। মূর্তাগাছ, গোয়ালিলতা, পশুশাইল ধান, কাউপাতা, তেঁতুল, আমড়া, সুপারিগাছ, চাউসুপারি কিংবা নতুন মেঘের পানি ছাড়া শীতলপাটি সম্ভব নয়। শীতলপাটির বাণিজ্য প্রশ্নে সবার আগে জরুরি এর প্রাণ ও লোকায়ত মেধাসম্পদের সুরক্ষা।
প্রাণবৈচিত্র্য সনদের আলোকে রচিত রাষ্ট্রীয় আইন, জাতীয় কর্মকৌশল, এনডিসি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ যেসব অঙ্গীকার করেছে মার্কিন ও জাপান বাণিজ্যচুক্তির চাপে তা যেন না হারায়।
পাভেল পার্থ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
