রাত সাড়ে ১০টা পার হয়েছে। ৮টার পরপর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে লোকজন কম। যানবাহনও হাতেগোনা। এরপরও কোনো গাড়িই হর্ন না বাজিয়ে আরেকটিকে অতিক্রম করছে না, বিষয়টি প্রয়োজনহীনই বলা যায়। অধিকাংশ রিকশাচালকের পায়ের পেডাল ও হাতের বেলও চলে যেন সমানতালে। আর কোনো একটি গাড়ি হয়তো ইউটার্ন নেবে বা ডানে-বাঁয়ে যাবে; একে তো রাস্তা প্রশস্ত নয়, দ্বিতীয়ত, রাস্তার দুই পাশেই কিছু না কিছু, গাড়ি বা রিকশা যত্রতত্র দাঁড়ানো; আছে নানা পণ্যসামগ্রী বিক্রির ‘স্থায়ী’ চৌকি ও ভ্যানগাড়িও। এর ফলে চাইলেই গাড়িটি একটানে ঘুরতে পারছে না। সেটি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। এরপরও সেটির পেছনে থাকা রিকশা, গাড়ি বা বাইক কোনোটিই ‘চুপ’ করে থাকছে না। রেকর্ড থেকে যেন বেজে চলেছে বেল, হর্ন—এ এক অদ্ভুত দশা! তাই রাস্তা ফাঁকা হলেও অকারণ শব্দের নির্যাতন থেকে নিস্তার নেই এত রাতেও! এর ওপর মাঝেমধ্যেই আশপাশের কোনো পান-সিগারেটের দোকান বা হোটেল থেকে ভেসে আসছে উচ্চ আওয়াজের হিন্দি গান। এ অবস্থার মধ্যেও যেন হঠাৎ হঠাৎ শুনতে পাচ্ছিলাম, কোথাও যেন খবর হচ্ছে, সম্ভবত রেডিওতে। বার কয়েক স্পষ্ট শুনলামও যেন। কিন্তু বুঝে ওঠার আগেই আবার ঢাকা শহরের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হওয়া ‘প্যাপু-পিপপিপ-ক্রিংক্রিং’য়ে তা হারিয়ে যায়।
কারওয়ান বাজারের উল্টো দিকে বসুন্ধরা মার্কেটের পেছন থেকে রিকশা যখন মিরপুর রোড পার হয়ে ধানমন্ডি ৭ নম্বরে ঢুকল, তখন বুঝলাম মনে হওয়াটা ভুল ছিল না। এ পাশটায় তখন গাড়ি–ঘোড়া নেইই বলা চলে। সত্যিই রেডিওতে খবর হচ্ছে। রিকশাওয়ালা একমনে পেডাল চালাচ্ছেন, বেল বাজাচ্ছেন না। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মামা, আপনি রেডিও শুনছেন?’ বললেন, ‘জি, বিবিসি বাংলা।’
এখন রেডিও মানে তো আর আলাদা কোনো যন্ত্র নয়, ক্যালকুলেটর, টর্চলাইট ইত্যাদির মতো গরিবের বাটনওয়ালা মুঠোফোনেও এটি পাওয়া যায় ‘বোনাস’ হিসেবে। রিকশাওয়ালা তাঁর পকেটে থাকা মুঠোফোনের রেডিও চালিয়ে রেখেছেন।
দিন কয়েক আগেই খবরে দেখলাম, বিবিসি বাংলা রেডিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কথাটা জানাতেই রিকশাওয়ালা বললেন, আগামী মার্চে বন্ধ হবে। একটু লজ্জাই পেলাম! খবর ‘দেখা’ আর ‘পড়া’ এক জিনিস নয়। পরে গুগল করেও জানা গেল, রিকশাওয়ালার তথ্যই সঠিক।
বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যে সারমর্ম তিনি টানলেন, তার সামনে কয়েক মুহূর্ত কথা জুটল না মুখে—‘কাগজ আর কলম ছাড়া জ্ঞানচর্চা হয় না।’ এ জন্যই বুঝি এখনো ঢাকার শহরের বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালে টাঙানো পত্রিকা পড়েন রোজ। সুযোগ পেলে পত্রিকার স্টলে দাঁড়ান। তবে কাজ বন্ধ রেখে বেশিক্ষণ পড়া কঠিন। এতে তৃষ্ণা মেটে না বলেই কি বিবিসি বাংলা রেডিও শোনেন? বললেন, না, ঠিক তা নয়, ‘নিরপেক্ষ’ খবর পাওয়ার জন্য শোনেন।
নাম মো. আজিজুল হক। বয়স চল্লিশ ছোঁবে ছোঁবে করছে। বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার জাবারীপুর গ্রামে। ২০১১ সাল থেকে ঢাকায় রিকশা চালান। থাকেন আগারগাঁওয়ের একটি রিকশার গ্যারেজে। ওই গ্যারেজেরই রিকশা ভাড়ায় নেন, সেই সুবাদে সেখানে থাকার ব্যবস্থা। দৈনিক রিকশার জন্য জমা দিতে হয় ১২০ টাকা। পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিনজনই স্কুলপড়ুয়া।
জিনিসপত্রের দাম কতটা পাগলা ঘোড়ার মতো বল্গাহীন, পত্রিকার পাতায় পড়ে তা জানতে হয় না। যে ব্যক্তি দুটো টাকা আয় করেন ও জিনিসপত্র কিনতে বাজারে যান, তিনি জানেন ‘সত্য যে কঠিন’। কিন্তু ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ বলার মতো অবস্থা আজিজুল হকদের নেই। বললেন, দুপুর আর রাত—এ দুই বেলায় খেতেই চলে যায় ১২০ টাকা। সকালের নাশতা আলাদা। আর রিকশা টানার মতো প্রচুর খাটুনির কাজে মাঝেমধ্যে কিছু না খেলে চলে না। তাতে রোজ খাওয়ার খরচই দুই শ টাকার কমে হয় না। আগে গাবতলী থেকে বাসে করে বগুড়ার মোকামতলা পর্যন্ত দুই-আড়াই শ টাকায় যাওয়া যেত, এখন সেটা হয়েছে দ্বিগুণ। গ্রামের বাড়িতে সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার টাকার কমে হয় না। তবে এত কিছুর পরও ‘খবরের নেশা’ তাঁকে ছাড়েনি। আজিজুল হক জানালেন, আগে মাঝেমধ্যে পাঁচ টাকার দৈনিক পত্রিকা কিনে ফেলতেন। এখন সাত টাকা হওয়ায় সে অভ্যাস ছেড়েছেন। তাঁর পত্রিকা পড়া নিয়ে গ্যারেজের অন্য রিকশাওয়ালাদের ঠাট্টা-মশকরা তো আছেই, স্ত্রীর অসন্তুষ্টিও আছে বাড়িতে।
পেছনে মাথা ঘুরিয়ে আজিজুল হক মোলায়েম হেসে বললেন, তিনি কারও সঙ্গেই তর্কে জড়ান না। বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যে সারমর্ম তিনি টানলেন, তার সামনে কয়েক মুহূর্ত কথা জুটল না মুখে—‘কাগজ আর কলম ছাড়া জ্ঞানচর্চা হয় না।’ এ জন্যই বুঝি এখনো ঢাকার শহরের বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালে টাঙানো পত্রিকা পড়েন রোজ। সুযোগ পেলে পত্রিকার স্টলে দাঁড়ান। তবে কাজ বন্ধ রেখে বেশিক্ষণ পড়া কঠিন। এতে তৃষ্ণা মেটে না বলেই কি বিবিসি বাংলা রেডিও শোনেন? বললেন, না, ঠিক তা নয়, ‘নিরপেক্ষ’ খবর পাওয়ার জন্য শোনেন।
একের পরে দুই আসার মতো অবধারিত প্রশ্নটিই করে ফেললাম, তাহলে কি দেশের কোনো সংবাদমাধ্যমে নিরপেক্ষ খবর পাওয়া যায় না? এর উত্তরে এসএসসি পাস করা আজিজুল হক যা বললেন, তা কিতাব থেকে পাওয়া কথা নয়, জীবন থেকে শেখা। তাঁর কথায়, ‘ধরেন, নানা রকম চাপ আছে না, চাইলেও তো পারা যায় না। তারপরও ধরেন, প্রথম আলো চেষ্টা করে।’
রিকশা ততক্ষণে গন্তব্য ঝিগাতলায় পৌঁছে গেছে। নেমে যখন ঠিকানাটা আরেক দফায় জানতে চাইলাম, আজিজুল হক তাঁর রিকশার সিট সরিয়ে ভেতর থেকে কী একটা প্যাকেট থেকে একটু কাগজ ছিঁড়ে নিলেন, বের করলেন একটা বলপেনও। লিখে দিলেন নিজের নাম-ঠিকানা। প্রায় মিনিট পনেরোর আলাপে একবারের জন্যও জিজ্ঞাসা করেননি, আমার কথা। এবার করলেন। নিজের ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিতেই আমার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। মুখে তখনো সেই মোলায়েম হাসি। কার্ডটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘মামা, শুধু আমি না, আমার মতো সবাই নিরপেক্ষ খবর চায়। আর কোনটা নিরপেক্ষ, কোনটা নিরপেক্ষ না, মানুষ কিন্তু সেটাও বোঝে।’
এর আগের দিনই (৪ নভেম্বর) ছিল প্রথম আলোর ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বুঝলাম, ‘সত্যে তথ্যে ২৪’ উদ্যাপনের সার্থকতা কোনখানে।
হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক। ইমেইল: [email protected]