পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: শুধু রাজ্যের ভাগ্য নয়, সংকটে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র

রোড শোতে অমিত শাহের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী। দক্ষিণ কলকাতার হাজরা মোড়ে, ২ এপ্রিল ২০২৬ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচন দুটি বিশেষ কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রথমত, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)—যার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। আর দ্বিতীয়টি হলো, নজিরবিহীন কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে নির্বাচন সম্পন্ন করা, একটি সহিংসতামুক্ত ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল যার লক্ষ্য।

নির্বাচন পরিচালনার এই ধরন ফলাফলের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে জয়ী যে পক্ষই হোক না কেন, এর ফলাফল কেবল বাংলার জন্য নয়, বরং গোটা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

বিজেপির জয় হোক বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের—উভয় সম্ভাবনাই ভারতের জাতীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতির দশকের পর দশক ধরে চলা উদ্বেগ ও উত্তেজনাকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে।

বিজেপি জিতলে যা হতে পারে

প্রথমেই দেখা যাক বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা। দিল্লির ক্ষমতাসীন দলের কাছে বাংলা জয় হবে একটি বড় মাইলফলক। সেটি হবে তাদের জন্য অজেয় অন্যতম রাজ্যগুলোর একটি জয় করা (অন্য দুটি হলো তামিলনাড়ু ও কেরালা)। এই জয় যদি আসে, তবে তা আসবে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের ওপর ভর করে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, বিজেপির হিন্দি বলয়ভিত্তিক হিন্দুত্ব এখন বাঙালির মনে গেঁথে গেছে, যা এত দিন মূলত সমন্বয়বাদী ধারার হিন্দুধর্ম দ্বারা সংজ্ঞায়িত ছিল।

বিজেপির এই জয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের কেন্দ্রীয়করণ প্রচেষ্টাকে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত করবে। এটি আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় (ফেডারেল) কাঠামোর ওপর এমন এক সময়ে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে, যখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যোগেন্দ্র যাদবের মতে, আমাদের ফেডারেল সমঝোতাগুলো নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গত মাসের সংসদীয় অধিবেশনই প্রমাণ করেছে যে, নিজেদের সুবিধামতো ভারতের নির্বাচনী মানচিত্র নতুন করে আঁকার যে চেষ্টা বিজেপি করেছিল, তা কেবল তখনই ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল যখন বিরোধী দলগুলো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ঐকমত্যের অভাবের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল।

আরও পড়ুন

অনেকের কাছেই এটি বেশ কিছুকাল ধরে স্পষ্ট যে, বিজেপির এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র এবং সাংস্কৃতিক সমরূপতা (সবাইকে একই ছাঁচে ফেলা) তৈরির প্রচেষ্টার বিপরীতে (যদিও নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতা ক্যামেরার সামনে মাছ খেয়ে বাঙালিদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন যে তাদের খাদ্যাভ্যাস আক্রান্ত হবে না) ভারসাম্য কেবল সেই রাজনৈতিক দলগুলোই আনতে পারে যারা যুক্তরাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের ধারণায় বিশ্বাসী। আর বাংলা যদি বিজেপির দখলে চলে যায়, তবে সেই প্রকল্পটি এক বিরাট ধাক্কার সম্মুখীন হবে।

এরপর রয়েছে নাগরিকত্বের অমীমাংসিত প্রশ্ন। যদিও নির্বাচন কমিশন জোর দিয়ে বলেছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধন নাগরিকত্বের কোনো পরীক্ষা নয়, তবুও বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগান ট্রাইব্যুনালের রায়ের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করছে।

গত মাসে কুচবিহারে প্রচারের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন যে, কমিশন ভোটার তালিকা থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ নাম সরালেও বিজেপি তাদের ‘বাংলার মাটি’ থেকেই সরিয়ে দেবে। এটি সেই লাখ লাখ মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি করছে, যাদের আবেদন ট্রাইব্যুনালে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে।

আরও পড়ুন

বিজেপির জয় রাজ্যে বড় বড় শিল্পায়ন ও কেন্দ্রীয় তহবিলের দুয়ার খুলে দিলেও তৃণমূল কংগ্রেসকে (টিএমসি) এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলে দিতে পারে।

বামপন্থীদের মতো শক্ত আদর্শিক ভিত্তি ছাড়া নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ক্ষমতায় না থেকে দলটি কত দিন টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় তৃণমূল যেভাবে বামপন্থীদের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছিল, তৃণমূল হারলে কি একইভাবে কর্মীরা বিজেপিতে ভিড়বে? এটি দলের ভেতরের ফাটলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে রোড শো করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর, পশ্চিমবঙ্গ। ২৭ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

তৃণমূল জিতলে যা হতে পারে

অন্যদিকে, তৃণমূল যদি জয়ী হয়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবেন, যেখানে তিনি ভারতের একমাত্র বিরোধী নেতা হিসেবে এমন এক রাজ্যে বিজেপির জয়রথ রুখে দেবেন যেখানে বিজেপি অত্যন্ত শক্তিশালী (তামিলনাড়ুর মতো নয়, যেখানে বিজেপি অন্য দলের ওপর নির্ভরশীল)। যদি কংগ্রেস কেরালায় জিততে ব্যর্থ হয়, তবে তা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলবে। বড় জয়গুলো যখন আঞ্চলিক দলগুলোই আনবে, তখন কংগ্রেস কেন জোটের নেতৃত্বে থাকবে—এই বিতর্ক আরও জোরালো হবে।

২০২১ সালে জয়ের পর মমতার ‘অল ইন্ডিয়া’ বা সর্বভারতীয় হওয়ার স্বপ্ন খুব একটা সফল হয়নি। এবারও তিনি বাংলা জয়ের পর ‘দিল্লি দখলের’ ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এটি কতটা নিছক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর আর কতটা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

আরও পড়ুন

বিজেপির হারের ফলে তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে হবে যে, নজিরবিহীন শক্তি ও যত্রতত্র প্রচারের পরও তারা কেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। অন্যদিকে, জয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের জন্য বড় পরীক্ষা হবে ২০০৬ সালে বামপন্থীদের মতো ঔদ্ধত্য এড়িয়ে চলা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সেই কুখ্যাত মন্তব্য—‘আমরা ২৩৫, ওরা ৩৫’—যেভাবে বামদের পতনের পথ তৈরি করেছিল, তৃণমূলকে সেই দম্ভ থেকে দূরে থাকতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাব, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং কেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক টানাপোড়েনের মতো বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল শক্তি নারী ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা এখন আকাশচুম্বী। মমতা হয়তো দেখতে পাবেন যে তাঁর সরকারের নগদ অর্থ সহায়তা প্রকল্পগুলো এক সময় আর ভোটারদের তুষ্ট করতে পারছে না; বরং শিক্ষা, চাকরি এবং নাগরিক সুবিধার মতো মৌলিক সংকটগুলোর সমাধানই বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জনগণের রায় যে পক্ষেই আসুক না কেন, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর অর্থ ও সতর্কতাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

  • সাত্বিক বর্মন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সহকারী সম্পাদক