দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলপ্রধান শেখ হাসিনা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে কমিটির নেতৃত্বে নিয়োগ দিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহারের উদ্দেশ্য জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে দেশের উন্নয়নের প্রধান অগ্রাধিকার ও লক্ষ্য সম্পর্কে দলের প্রতিশ্রুতির বিবরণ দিয়ে জনসাধারণের সমর্থন আদায় করা। পক্ষান্তরে দলের দায়িত্ব এই সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রণীত আওয়ামী লীগের ইশতেহারের শিরোনাম ছিল—‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। এ ইশতেহারে শিক্ষা সম্বন্ধে পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ বিবরণসহ ভবিষ্যতের লক্ষ্যের বর্ণনা দেওয়া হয়। অর্জিত সাফল্যের তালিকায় ছিল—২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষণা, ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, বিনা মূল্যে কয়েক কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ। কওমি মাদ্রাসার উচ্চতম সনদ দাওরায়ে তাকলিমকে সাধারণ মাস্টার ডিগ্রির সমতুল্য ঘোষণাও সাফল্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অধিকাংশের মতোই বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের কাহিনি স্বল্পতম বিনিয়োগে সংখ্যাগত প্রসারের। কিন্তু এ জন্য বড় মূল্য দেওয়া হয়েছে শিশু-তরুণদের বড় এক অংশের শিক্ষায় কার্যকর অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত রেখে। বিবিধ কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে।
পরবর্তী পাঁচ বছরের (২০১৯-২৩) লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতির প্রধান বিষয়গুলো ছিল—শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও অর্থের সদ্ব্যবহার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভাষা ও গণিত বিষয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এক ‘বৃহৎ প্রকল্প’, ‘নিরক্ষরতার অভিশাপ’ থেকে দেশকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসা ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৫ শতাংশে নামানো এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যাহ্ন আহার গ্রাম এলাকায় ও শহরের দরিদ্র এলাকায় সর্বজনীন করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনকাঠামোর বৈষম্য নিরসনে ‘ন্যায্যতার ভিত্তিতে’ উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়।
দেখা যাচ্ছে, সাফল্যের বিবরণে মূলত বিদ্যমান শিক্ষাসেবা চালু রেখে কিছু সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এসব লক্ষ্য নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু এসব দ্বারা শিক্ষার গুণগত মান ও সুযোগবৈষম্যের প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধান হয় না।
পরবর্তী বছরগুলোর লক্ষ্যের ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, ফল ও বিদ্যমান বৈষম্যের স্বীকৃতি দেখা যায়। কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে বলা যায়, উল্লেখিত পাঁচটি প্রধান লক্ষ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষার জন্য সরকারি বরাদ্দ জাতীয় আয় ও জাতীয় বাজেটের অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। বরং মূল্যসূচক ও মাথাপিছু শিক্ষার্থী ব্যয় ধরলে তা কমেছে। ভাষা ও গণিত শিক্ষকদের জন্য কোনো বৃহৎ প্রকল্প নেওয়া হয়নি এবং শিক্ষার্থীদের এসব ভিত্তিমূলক দক্ষতায় উন্নতি হয়নি। বয়স্ক সাক্ষরতা নির্মূল ও ঝরে পড়া শূন্যের কোঠায় বা তার কাছাকাছি নিয়ে আসা অধরা রয়ে গেছে, যদিও শ্লথ অগ্রগতির তথ্য ঘোষিত হয়েছে। বিদ্যালয়ে মধ্যাহ্ন আহারের সীমিত কর্মসূচি কোভিড মহামারির সময় বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে প্রকল্প বাজেট শেষ হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় সরকারি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নিয়মিত বাজেটভুক্ত কোনো কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি।
২০১৮ ইশতেহারের শিক্ষাবিষয়ক লক্ষ্যের পর্যালোচনায় দেখানো হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যার কয়েক গুণ বৃদ্ধির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার মান ও বৈষম্যের ব্যাপারে পাঁচ প্রধান লক্ষ্য নিয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ২০২৪-এর ইশতেহারে শিক্ষা নিয়ে তাহলে কী বলা যায়? সংখ্যার প্রসারের বিবরণ দিয়ে অসাধারণ সাফল্যের ভাষ্য এবং এই উন্নয়নের ধারা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষ কাজে লাগবে না। সাধারণ নাগরিকের কাছে তা আস্থাযোগ্যও হবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অধিকাংশের মতোই বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের কাহিনি স্বল্পতম বিনিয়োগে সংখ্যাগত প্রসারের। কিন্তু এ জন্য বড় মূল্য দেওয়া হয়েছে শিশু-তরুণদের বড় এক অংশের শিক্ষায় কার্যকর অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত রেখে। বিবিধ কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। গবেষণা, পর্যালোচনা ও নাগরিক সংলাপ থেকে স্পষ্ট হয়েছে, সমস্যার নির্মোহ বিশ্লেষণ, সমাধানের লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণের প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন ও এতে কে কে অংশীজন—এসব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের আর্থরাজনৈতিক আবহ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২০১০ সালের শিক্ষানীতি কার্যকর প্রয়োগের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। দেশের শিক্ষা খাতের জন্য কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা নেই। বিদ্যালয় শিক্ষা দুই ভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিভক্ত, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই।
দেশের বর্তমান সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন উচ্চতম রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে শিক্ষায় এক মৌলিক রূপান্তরের অঙ্গীকার। এই উদ্দেশ্যে একটি যথার্থ পদক্ষেপ হবে যোগ্য ও প্রজ্ঞাবান লোকদের নিয়ে রূপান্তরের পথনির্দেশের জন্য স্থায়ী বিধিবদ্ধ শিক্ষা কমিশন গঠন, যা ২০১০ সালের নীতিতে সুপারিশ করা হয়েছিল। কোভিড মহামারির অভিঘাতে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আগে থেকে বিদ্যমান গুণগত মান ও বৈষম্যের সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করেছে। গণসাক্ষরতা অভিযান পরিচালিত এডুকেশন ওয়াচের ২০২০, ২০২১ ও ২০২২-এর জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে ও অন্যান্য সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চিত্র দেখা যায়।
বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পর্যালোচনার আলোকে এই লেখক ‘একুশ শতকে বাংলাদেশ-শিক্ষার রূপান্তর’ পুস্তকে (প্রথমা থেকে আশু প্রকাশিতব্য) শিক্ষাঘাটতির আকৃতি-প্রকৃতি, বিভিন্ন প্রচেষ্টার কার্যকারিতা ও বর্তমানে বিশেষ করণীয়র পরামর্শ তুলে ধরেছেন। জানুয়ারি ২০২৪-এ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যারাই জনসাধারণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে, তাদের দায়িত্ব হবে নির্মোহ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে অংশীজনদের সঙ্গে রেখে শিক্ষা রূপান্তরের লক্ষ্যে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া।
[এই নিবন্ধে ব্যক্ত মতামত লেখকের নিজস্ব]
ড. মনজুর আহমদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের সভাপতি ও গণসাক্ষরতা অভিযানের উপদেষ্টা