সম্প্রতি দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ওপর উপর্যুপরি সহিংসতার ঘটনা আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতকে চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও কর্মবিরতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেশের হাসপাতালগুলোতে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ‘পাগলাঘণ্টা’ বা সেন্ট্রাল অ্যালার্ম সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
২০২৩ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতালগুলোতে জুলাই ২০১৯ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত ১২ দশমিক ৩ শতাংশ ডাক্তার শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে অধিকাংশই রোগীদের আত্মীয়স্বজন দ্বারা এবং সরকারি হাসপাতালে ঘটে (Md. Shahjalal et al., 2023)। ইমার্জেন্সি বিভাগে কর্মরত ও তরুণ পুরুষ ডাক্তাররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন এবং অনেকেই কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ বোধ করেন।
এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের জীবন রক্ষা এবং হাসপাতালের তাৎক্ষণিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে একটি সাময়িক ঢাল হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল কিছু আনসার সদস্যের বন্দুকের নল আর সাইরেনের আওয়াজ কি আমাদের চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে স্থায়ী নিরাপত্তা ও নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে?
হাসপাতালে মব সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হয়নি। এটি আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আইনের শাসনের অভাবের একটি মারাত্মক বহিঃপ্রকাশ। এই বাস্তবতায় হাসপাতালের করিডরে সশস্ত্র আনসার দাঁড় করিয়ে সাময়িকভাবে আক্রমণ ঠেকানো হয়তো সম্ভব, কিন্তু রোগীর স্বজনদের ভেতরের সেই অবিশ্বাস ও ক্ষোভ দূর করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, হাসপাতালকে দুর্গের রূপ দিলে তা সাধারণ রোগীদের মধ্যে একধরনের ভীতি ও দূরত্বের জন্ম দেবে, যা চিকিৎসক-রোগীর মধ্যকার আস্থার সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে তুলবে।
দেশের প্রচলিত আইনে চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো নেই। বর্তমানে চিকিৎসকদের ওপর কোনো হামলা হলে তা সাধারণত ১৮৬০ সালের ‘বাংলাদেশ দণ্ডবিধি’র সাধারণ ধারা, যেমন—ধারা ৩২৩ (স্বেচ্ছায় আঘাত করা), ধারা ৩২৫ (গুরুতর আঘাত করা) কিংবা ধারা ৩৫৩ (কর্তব্যরত সরকারি কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বাধাদান বা আক্রমণ)-এর অধীন বিচার করা হয়। কিন্তু এই প্রচলিত আইনি কাঠামো ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছু ফাঁক রয়ে গেছে।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কোনো একক গোষ্ঠী বা পেশার দাবি নয়, এটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা সচল রাখার পূর্বশর্ত। একজন চিকিৎসক যদি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তবে তার পক্ষে রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া অসম্ভব। আনসার, অস্ত্র বা পাগলাঘণ্টা সাময়িক প্রতিরোধ হলেও চূড়ান্ত কোনো সমাধান নয়।
প্রথমত, দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো কেবল ‘সরকারি কর্মচারী’দের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু আমাদের দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার একটি বিশাল অংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। বেসরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক যখন ডিউটিরত অবস্থায় হামলার শিকার হন, তখন তিনি এই আইনি সুবিধা পান না। ফলে বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক আইনি সুরক্ষার বাইরেই থেকে যান।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে চিকিৎসকেরা কেবল শারীরিক হামলার শিকারই হন না; বরং রোগীর স্বজনদের দ্বারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, হুমকি এবং মানসিক হেনস্তার শিকার হন প্রতিনিয়ত। প্রচলিত আইনে এ ধরনের ‘মৌখিক সহিংসতা’ রোধে তাৎক্ষণিক শাস্তির কোনো জোরালো ও কার্যকর বিধান নেই। উল্লেখ্য, বিগত বছরগুলোতে ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন’-এর খসড়া তৈরি করা হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
আমরা যদি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকাই, তবে দেখব তারা কেবল লাঠি বা অস্ত্রের ওপর ভরসা করে ডাক্তারদের নিরাপত্তা দেয় না। অনেক দেশেই হাসপাতাল সুরক্ষায় একটি সমন্বিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে চিকিৎসকদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন আছে, যেখানে চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলা বা হাসপাতালের সম্পত্তি ভাঙচুর করা একটি অ-জামিনযোগ্য কঠোর অপরাধ।
তৃতীয়ত, সুষ্ঠু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জরুরি বিভাগ বা আইসিইউতে রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ একজন বা দুজনের বেশি স্বজনকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ফলে হাসপাতালের ভেতরে কোনো দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগই থাকে না। তা ছাড়া চিকিৎসকদের বসার জায়গা ও সংবেদনশীল জোনগুলো বায়োমেট্রিক লক বা অ্যাকসেস কন্ট্রোল দিয়ে সুরক্ষিত থাকে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত।
এই সাময়িক পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংস্কারে হাত দিতে হবে। এ জন্য দেশে একটি কার্যকর ও কঠোর ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এবং তার দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক অ-জামিনযোগ্য শাস্তি দিতে হবে।
এ ছাড়া দেশের হাসপাতালগুলোর প্রশাসনিক ও চিকিৎসাসেবার জায়গা আলাদা করতে হবে। জরুরি বিভাগ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বহিরাগত এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রোগীর স্বজনদের বসার জন্য আলাদা আধুনিক লাউঞ্জের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি, আমাদের চিকিৎসকদের পাঠ্যক্রমে এবং পেশাগত জীবনে ‘ক্রাইসিস কমিউনিকেশন’ বা সংকটের মুহূর্তে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তা স্বজনদের আগে থেকেই বুঝিয়ে বলার (কাউন্সিলিং) ক্ষেত্রে এ দক্ষতা কাজে লাগবে। রোগীদের কল্যাণে কাজ করা সিভিল সোসাইটি অ্যালায়েন্সগুলোকে শক্তিশালীকরণ এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি, ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দ্রুত কার্যকর ‘মেডিক্যাল ওম্বুডসম্যান’ বা তদন্ত বোর্ড গঠনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে না তুলে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে বিচার পাওয়ার আস্থা পায়।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কোনো একক গোষ্ঠী বা পেশার দাবি নয়, এটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা সচল রাখার পূর্বশর্ত। একজন চিকিৎসক যদি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তবে তার পক্ষে রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া অসম্ভব। আনসার, অস্ত্র বা পাগলাঘণ্টা সাময়িক প্রতিরোধ হলেও চূড়ান্ত কোনো সমাধান নয়।
চিকিৎসকদের প্রকৃত নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন হাসপাতালের অবকাঠামোগত সংকট দূর হবে, কঠোর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সর্বোপরি চিকিৎসক ও রোগীর মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের সেতুটি আবার নতুন করে গড়ে উঠবে। সরকার ও নীতিপ্রণেতারা যত দ্রুত এই মূল সংকটের দিকে নজর দেবেন, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য ততই মঙ্গল।
ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
*মতামত লেখকের নিজস্ব