বাংলাদেশে কোভিডের গণটিকা কার্যক্রমে অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুরক্ষা অ্যাপে এ বাধা দেওয়া আছে শুরু থেকেই এবং এখনো সেই নিয়ম বলবৎ। এটা ঠিক যে শুরুতে যখন যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে কোভিডের টিকা দেওয়া আরম্ভ হয়, তখন সেখানেও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকার আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। কারণ, কোভিড টিকার ট্রায়ালের সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সে কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং গর্ভস্থ শিশুর ওপর টিকার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে কি না, তা বিজ্ঞানীদের অজানা ছিল।
তবে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের রয়েল কলেজ অব অবস অ্যান্ড গাইনি (আরসিওজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারীদেরও কোভিড টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বলা হচ্ছে, কোভিড টিকা অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং তাঁর গর্ভের সন্তানের জন্য নিরাপদ। এখন প্রশ্ন হলো, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য করোনার টিকা কি অপরিহার্য? যদি অপরিহার্য হয়, তাহলে গর্ভকালের কোন পর্যায়ে টিকা দিতে হবে? কোন ধরনের টিকা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য বেশি নিরাপদ? এসব টিকাকে যে নিরাপদ বলা হচ্ছে, তার ভিত্তি কী? অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর কোভিড টিকার সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো কী বলে?
এখানে আমি সিডিসি, আরসিওজি, এফডিএ এবং যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট কমিটি অন ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (জেসিভিআই) সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের আলোকে ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রথমত, গর্ভাবস্থায় নারীদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে গর্ভকালে নারীদের যেকোনো সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেক। গর্ভাবস্থায় এমনকি সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জাও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
গত ২১ মে আমেরিকান জার্নাল অব অবসটেট্রিক অ্যান্ড গাইনোকলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের এক বৃহৎ গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত অর্ধেকের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী উপসর্গহীন থাকতে পারেন। তবে কারও কারও কোভিড গুরুতর বা জটিল হতে পারে, মৃত্যুঝুঁকিও হতে পারে। গর্ভাবস্থায় কোভিড হলে প্রিম্যাচিউর বেবি বা অপ্রাপ্ত বয়সে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় দ্বিগুণ, মৃত শিশু জন্মের ঝুঁকিও প্রায় দ্বিগুণ। প্রসব-পূর্ববর্তীকালে কোভিড হলে প্রি-একলাম্পসিয়া বা খিঁচুনি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এসব কারণেই গর্ভাবস্থায় কোভিড থেকে সুরক্ষার জন্য টিকা গ্রহণ অপরিহার্য। টিকা দিলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মারাত্মক বা সিভিয়ার কোভিড হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে এবং মৃত ও প্রিম্যাচিউর শিশু জন্ম অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যাবে।
কোভিড টিকা অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য কতটা নিরাপদ বা কার্যকর, তা প্রমাণে এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়নি। এ কারণেই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর টিকার কার্যকারিতা কত শতাংশ, তা আলাদা করে বলা মুশকিল। তবে আশা করা হচ্ছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর টিকা অন্যদের মতোই সমানভাবে কার্যকর। তবে সিডিসি, এফডিএ, আরসিওজি এবং জেসিভিআই গর্ভাবস্থায় কোভিডের টিকাকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি পরিচালিত ‘ভি-সেফ প্রেগন্যান্সি রেজিস্ট্রি’ মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক টিকার ক্লিনিক্যাল তথ্য সংগ্রহ রেজিস্ট্রির একটি কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রে যেসব অন্তঃসত্ত্বা নারী ফাইজার বা মডার্নার টিকা নিয়েছেন, তাঁরা এই অ্যাপের মাধ্যমে টিকার সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লিপিবদ্ধ করেন।
গত ১৯ জুলাই পর্যন্ত এই ভি-সেফ রেজিস্ট্রিতে নাম লিপিবদ্ধ করেছেন ১ লাখ ৩৬ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী, যাঁরা ইতিমধ্যে কোভিড টিকা নিয়েছেন। এ রেজিস্ট্রিতে লিপিবদ্ধ প্রায় ৩৫ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীর ডেটা প্রাথমিক পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং এর ফলাফল গত ১৭ জুন নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কোভিড টিকা স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত, গর্ভ নষ্ট বা নবজাতকের মৃত্যু স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে কোনো অবস্থাতেই বৃদ্ধি ঘটায় না। এ ছাড়া, টিকার অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও একজন সাধারণ টিকাগ্রহীতার মতোই। অর্থাৎ এমআরএনএ টিকা (ফাইজার ও মডার্না) অন্তঃসত্ত্বা নারী বা নবজাতকের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটায় না।
তবে এ পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই স্টাডিতে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই টিকা নিয়েছিলেন গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে। অতএব, প্রথম ট্রাইমেস্টারে, অর্থাৎ গর্ভধারণের প্রথম ১২ থেকে ১৪ সপ্তাহে বা গর্ভধারণের ঠিক আগে কোভিডের টিকা নিলে তা গর্ভ বা গর্ভের শিশুর ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফাইজার ও মডার্নার টিকা গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে এগুলো গর্ভস্থ শিশু বা গর্ভাবস্থার ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে যখন এই টিকা দুটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছিল, তখন প্রায় কয়েক হাজার নারী স্বেচ্ছাসেবী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। টিকার কারণে তাঁদের নিজের বা গর্ভের শিশুর ওপরে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি।
কোভিড টিকা অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য কতটা নিরাপদ বা কার্যকর, তা প্রমাণে এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়নি। এ কারণেই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর টিকার কার্যকারিতা কত শতাংশ, তা আলাদা করে বলা মুশকিল। তবে আশা করা হচ্ছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর টিকা অন্যদের মতোই সমানভাবে কার্যকর।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও স্কটল্যান্ডের চার হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এর মধ্যে কোভিডের টিকা দেওয়া হয়েছে এবং পাবলিক হেলথ স্কটল্যান্ডও কোভিডের টিকাকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করেছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার ও মডার্না, কোনো টিকাতেই এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়নি, যা গর্ভের শিশুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তবে যেহেতু ফাইজার ও মডার্নার টিকা দুটি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর বেশি পরীক্ষিত হয়েছে, তাই যুক্তরাজ্যের জেসিভিআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি ও এফডিএর মতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ফাইজার বা মডার্নার টিকা দেওয়াই বেশি নিরাপদ।
এখন প্রশ্ন হলো, গর্ভাবস্থার কোন পর্যায়ে টিকা দেওয়া নিরাপদ হবে? গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টার বা ১২ সপ্তাহ হলো ভ্রূণের শারীরবৃত্তীয় গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে যেকোনো ধরনের ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। অন্যদিকে, গর্ভাবস্থার তৃতীয় বা শেষ ট্রাইমেস্টারে কোভিড হলে তা সিভিয়ার বা তীব্র কোভিডে রূপ নেয় এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব বিচারে জেসিভিআই এবং সিডিসির পরামর্শ হলো, কোভিডের টিকা গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারেই দেওয়া বেশি নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত।
উল্লেখ্য, স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যও কোভিড টিকা নিরাপদ। মায়ের দুধের মাধ্যমে টিকাসৃষ্ট অ্যান্টিবডি শিশুর দেহে ঢোকে। এর ফলে শিশুর দেহে করোনাভাইরাসের বিপরীতে সুরক্ষা তৈরি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত মায়ের দুধে টিকার অন্য কোনো উপাদানের, যেমন এমআরএনএ বা ভাইরাস নিঃসরণ পরিলক্ষিত হয়নি। তাই জেসিভিআই এবং সিডিসির পরামর্শ হলো স্তন্যদানকারী মায়েরা কোভিড টিকা নিতে পারবেন। টিকা গ্রহণের সময় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধেরও কোনো প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশে গর্ভকালে কোভিড সংক্রমণ ও এর পরিণাম নিয়ে বড় কোনো গবেষণা নেই। তবে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কোভিড ডেডিকেটেড মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সম্পাদিত একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কোভিডে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের গর্ভের মধ্যে শিশু মৃত্যুহার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, আর নবজাতক মৃত্যুর হার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এ গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৯ জন কোভিডে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীর মধ্যে ৪ জন মৃত্যুবরণ করেন (২১ শতাংশ)। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ২০২১ সালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অন্তঃসত্ত্বা নারী কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছেন আর মৃত্যুহারও অনেক বেড়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সব নারী-পুরুষকে টিকার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। দেশ একটি বৃহৎ গণটিকা কার্যক্রমে ঢুকতে যাচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারীদের এ সুযোগের বাইরে রাখা অন্যায়।
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির রিপ্রোডাক্টিভ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল মেডিসিনের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট