গত ১৬ জুন জেনেভা সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আলাপ হয়েছে। আফগানিস্তানের বিষয়াদি দেখভালের জন্য মার্কিন বাহিনী চাইলে তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানে থাকা রুশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে—পুতিন সেই বৈঠকে এমন কথা বাইডেনকে বলেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। ক্রেমলিন নিঃস্বার্থ পরার্থপরতায় এই প্রস্তাব দিয়েছে, অবশ্যই তা নয়।
এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ঘাঁটি গড়ে তুলুক তা রাশিয়া চায় না, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে চাইছে। পুতিনের এই প্রস্তাব বাইডেনের কাছে নিঃসন্দেহে লোভনীয়। এ কারণেই প্রস্তাবটি মেনে নেওয়া যায় কি না, তা বাইডেন খতিয়ে দেখছেন। রাশিয়া ও চীনের মাঝামাঝিতে অবস্থিত মধ্য এশিয়া আয়তনের দিক থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সমান। আফগানিস্তানে সহিংসতার কারণে এই অঞ্চল ফের খারাপ খবরের জন্য সংবাদপত্রের শিরোনামে এসেছে।
আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা তুলে আনার মধ্য দিয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান হতে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দৃশ্যত কোনো লাভ হয়নি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধে সরকারি হিসাবেই ২ হাজার ৩১২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ২০ হাজার ৬৬৬ জন। এর বাইরে আফগানিস্তানে কর্মরত ৩ হাজার ৮০০ বেসরকারি নিরাপত্তাবিষয়ক ঠিকাদার প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে বড় ঝড় গেছে আফগান জনগণের ওপর দিয়ে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কোস্টস অন ওয়ার প্রজেক্টের হিসাবমতে, এই যুদ্ধে ৪৭ হাজার ২৪৫ জন বেসামরিক আফগান নাগরিক নিহত হয়েছে। এর বাইরে ৬৬ হাজার থেকে ৬৯ হাজার আফগান সেনা নিহত হয়েছে। গত চার দশকে বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে ২৭ লাখ আফগান নাগরিক পাকিস্তান, ইরান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। চার কোটি আফগান নাগরিকের মধ্যে ৩৫ লাখ নাগরিক নিজ ভিটে থেকে পালিয়ে দেশের ভেতরেরই অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
এখন বিশ্লেষকেরা বলছেন, তালেবানের একের পর এক এলাকা দখল আফগানিস্তানে ব্যাপকভাবে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে বহু আফগান নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে পারে। এতে আশপাশের দেশেও ইসলামভিত্তিক মৌলবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাইডেন প্রশাসন বলছে, তারা আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার পর তালেবানকে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে রাখতে দূর থেকে আফগান সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। কিন্তু আঞ্চলিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, যুদ্ধবিমান, গোলন্দাজ বাহিনী ও ড্রোনের মতো প্রযুক্তির উপস্থিতি এ অঞ্চলেরই কোথাও না কোথাও থাকতে হবে।
আফগানিস্তানের প্রতিবেশী মধ্য এশিয়ার উত্তরাঞ্চলে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কিরগিজস্তানের মানাস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে মার্কিন বিমানঘাঁটি ছিল। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উজবেকিস্তানের কারশি খানাবাদেও মার্কিন বিমানঘাঁটি ছিল। (মানাসে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির শেষ বছরে আমি কিরগিজস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলাম।) ওই সময় পুতিন এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোগে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এই দুটি ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে পেরেছিল। পুতিন সেই চুক্তিকেই বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে নবায়ন করতে চান।
পুতিনের প্রস্তাব না মেনে বাইডেনের বিকল্প পথে হাঁটার সম্ভাবনা কম। সম্প্রতি রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তালেবানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সে বৈঠকে তালেবান মস্কোকে আশ্বস্ত করেছে, তারা মধ্য এশিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করবে না, অন্য কট্টর ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোর সঙ্গে লড়াই চালাবে এবং আফগানিস্তানে মাদক উৎপাদন নিষিদ্ধ করবে।
তালেবানের একের পর এক এলাকা দখল আফগানিস্তানে ব্যাপকভাবে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে বহু আফগান নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে পারে। এতে আশপাশের দেশেও ইসলামভিত্তিক মৌলবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান —এই তিন দেশকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তালেবানের তাড়া খেয়ে মার্কিন বাহিনীকে নানাভাবে সহায়তা করা অন্তত ১০ হাজার আফগান নাগরিককে সাময়িক আশ্রয় দিতে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু ওই তিন দেশ তাতে রাজি হয়নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সম্প্রতি বলেছেন, আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের খেসারত হিসেবে পাকিস্তানকে ২৭ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে হয়েছে। ইমরানের ওই কথায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলো খুশি হয়েছে।
সবাই জানে, একমাত্র পুতিনই এই সংকটের জট খুলতে পারেন এবং জেনেভা সম্মেলনে তিনি এ বিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন। বাইডেন নিজেও বুঝতে পারছেন, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও ক্রেমলিনের সহায়তা তাঁর লাগবেই।
এ অবস্থায় পুতিন ও তাঁর মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতামূলক সম্পর্কে আসবে কি না, তা এখন বাইডেনকেই ঠিক করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জুমার্ত ওতোরবায়েভ কিরগিজস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী