জাতীয় সংকটে সমাজের সাড়া

বৈশ্বিক মহামারি কোভিড–১৯ আমাদের জাতীয় জীবনে যে বিপদ, দুঃখ–কষ্ট ও অনিশ্চয়তা নিয়ে আঘাত হেনেছে, তা ক্রমেই আরও প্রকট রূপ ধারণ করছে। সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার ফলে একদিকে চিকিৎসাব্যবস্থার সামনের চ্যালেঞ্জটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে; অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের সমস্যা প্রকটতর হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, এই জাতীয় মহাদুর্যোগ আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দ্বিমুখী এক যুদ্ধের সামনে। এই যুদ্ধে লড়াই করা সরকারের একার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। 

আমরা এ কথা বলছি এ জন্য নয় যে সংকটটি বিরাট বলেই সরকারের নিজের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলা গ্রহণযোগ্য হবে। বরং তা মোকাবিলায় আন্তরিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পুরো সরকারযন্ত্রের সর্বশক্তি প্রয়োগের ওপরে জোর দিয়েই আমরা পুরো সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই; সামাজিক সংহতি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার আহ্বান জানাই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত ও ছোট ছোট দলগত উদ্যোগে বিপন্ন মানুষের মধ্যে ত্রাণ–সহযোগিতাসহ নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক তৎপরতা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, সেগুলোকে স্বাগত জানাই। 

যেমন নাফিসা আনজুম খান নামের এক তরুণী ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন সেই সব অবরুদ্ধ পরিবারের কাছে, যাদের ঘরে খাবার নেই। তিনি সিনি কেয়ার বাংলাদেশ নামে এক অস্ট্রেলীয় কোম্পানির কর্মী। এ জনহিতকর কাজে তাঁকে সহযোগিতা করছেন তাঁর সহকর্মী, বন্ধু-স্বজন, সামর্থ্যবান প্রতিবেশী ও কিছু ছাত্রছাত্রী। আর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৯ তরুণ ফেসবুকে খুলেছেন ‘ইমার্জেন্সি বাইক হেল্প ফর রাঙ্গুনিয়া’ নামের একটি গ্রুপ। যানবাহনসংকটের কারণে যেসব অসুস্থ মানুষ চিকিৎসালয়ে যেতে পারছেন না, এই তরুণেরা তাঁদের পরিবহন-সহযোগিতা দিচ্ছেন। খাগড়াছড়ি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দরিদ্র মানুষের কাছে ত্রাণ-সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছেন শাপলা দেবী ত্রিপুরা নামের এক নারী। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করছেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও সামর্থ্যবান বন্ধুবান্ধব। মানিকগঞ্জে সি এম খালেক নামের এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, যিনি মুক্তিযোদ্ধা; ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫০০ অসহায় পরিবারের মধ্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ রকম অসংখ্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের খবর সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। অনেকে একেবারে নিভৃতে এসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। যেমন মুঠোফোন কোম্পানি বাংলালিংক সাড়ে ১৪ হাজার পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংক লিমিটেড উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী দিচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে গঠন করেছেন ‘সেভ দ্য হিউম্যান’ নামের এক সহযোগিতা প্রকল্প। নর্দান ইউনিভার্সিটি নামের আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। এর বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে নানা ধরনের ত্রাণ ও সাহায্য কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি ব্যবসায়িক ও শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর কাছে জাতির প্রত্যাশা আরও বেশি। 

বিপন্ন মানুষের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় মনে করি। কারণ, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে একটি সমাজের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, মানবতাবোধ ও পরার্থপরতার প্রকাশ ঘটে। এসব ব্যক্তির পাশে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের ভূমিকা আরও বেশি প্রত্যাশিত।