জামায়াতের নীতিগত অবস্থান—সংসদে এক পরিবারের দুজন সদস্য নয়: হামিদুর রহমান আযাদ

ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনেছবি: প্রথম আলো

জাতীয় সংসদে এক পরিবারের দুজন সংসদ সদস্য নয়—এমনটি জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত অবস্থান বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়া শেষে ব্রিফিংয়ে হামিদুর রহমান আযাদ এ কথা বলেন।

মনোনয়ন জমা দেওয়া শেষে সাংবাদিকেরা হামিদুর রহমান আযাদের কাছে জানতে চান, সংরক্ষিত নারী আসনে অতীতে জামায়াতের আমিরের স্ত্রী সংসদ সদস্য থাকলেও এবার নেই কেন?

জবাবে হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘আমাদের অন প্রিন্সিপাল—এক পরিবারে দুইজন সংসদ সদস্য নয়। অতীতেও আমরা সেটা অ্যালাউ করি নাই। এবারও এটা করা হয় নাই। এটা অন প্রিন্সিপাল আমাদের দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা করেছি।’

দেশ পরিচালনার মতো যোগ্য নারী জামায়াতের নারী শাখায় অনেক আছেন বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘দলে যোগ্য নারী নেতৃত্বের কোনো সংকট নেই। আমিরের স্ত্রী শুধু হেভিওয়েট নন, তাঁর চেয়ে জামায়াত ইসলামীর ডজন ডজন হেভিওয়েট প্রার্থী আছে।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নির্বাচন হয়ে গেছে, সংসদ চলছে। সময়মতো যদি সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা সংসদে যেতে পারেন, তাহলে জাতির প্রত্যাশা ও নারী প্রতিনিধিত্ব সঠিক সময়ে হবে। এ জন্য কমিশন যেন ভিন্ন পরিস্থিতির অবতারণা না করে, ১১ দল সেই আস্থা রাখতে চায়।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংসদে সব ন্যায়সম্মত ও জনকল্যাণকর কাজে, দেশের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বিরোধী দল। এটাই বিরোধী দলের মূল নীতি। আর সরকার ভুল পথে পরিচালিত হলে, জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিলে সে ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সোচ্চার থাকবেন। তাঁরা তাঁদের ভূমিকা পালন করবেন। সংরক্ষিত নারী আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরাও এ ক্ষেত্রে যুক্ত হবেন। ৯০ জন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য একসঙ্গে ভূমিকা পালন করবেন।

বিরোধী ১১–দলীয় ঐক্য ১৩টি নারী আসন পাচ্ছে। জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া ১৩ নারী প্রার্থীর মধ্যে একজন সরকারি চাকরিতে ছিলেন। সেটি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে কি না—এমন প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাঁর কাছে এ রকম তথ্য নেই। এ রকম সমস্যা থাকলে তাঁর দলের (এনসিপি) পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা নয়। দলের মনোনয়নের ওপর ভিত্তি করেই জোটের পক্ষ থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী মাহমুদা আলম মিতু তাঁর বক্তব্যের শুরুতে দলের আহ্বায়কসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঠিক রাখায় তিনি জামায়াতে ইসলামীকেও ধন্যবাদ দেন।

রাজনৈতিক জোট মানে একটা অঙ্গীকার বলে মন্তব্য করেন মাহমুদা আলম। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ১১ দল একসঙ্গে কাজ করবে, এই অঙ্গীকার শুরু থেকেই ছিল। অনেক বড় বড় দল আছে, তারাও জোট করেছে, কিন্তু তারা রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। অনেক আসন থাকার পরও তারা জোটসঙ্গীদের সেভাবে সম্মান করেনি।

মাহমুদা আলম বলেন, তাঁরা আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন শুধু জুলাইয়ের কারণে। জামায়াতসহ জোটের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয় যে একজন জুলাই শহীদের পরিবারের সদস্য সংরক্ষিত আসনে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সেখান থেকে তাঁদের সঙ্গে শহীদ পরিবারের একজন প্রতিনিধি আছেন। তিনি একজন মা। তিনি শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম। এটাও অনেক বড় একটা বিষয়।

জোটের নারীদের পথচলা খুবই সুন্দর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মাহমুদা আলম। তিনি বলেন, নারীদের সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্যসহ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যেসব ভূমিকা রাখা দরকার, সেগুলো তাঁরা একসঙ্গে, জনকল্যাণের স্বার্থে করতে পারবেন।

মনোনয়ন জমা দেওয়া শেষে রোকেয়া বেগম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের হত্যার বিচার তিনি সংসদে গিয়ে চাইবেন। জুলাইয়ে ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবার, ২০ হাজার আহত যোদ্ধাদের হয়ে তাঁদের সমস্যাগুলো তিনি সংসদে তুলে ধরবেন। সংসদে জুলাই যোদ্ধাদের হয়ে তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন।

বিএনপিকে উদ্দেশ করে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করলে বিএনপিও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কাউকে মনোনয়ন দিত।’

বিভিন্ন দলের পাশাপাশি একজন জুলাই শহীদের মাকে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে ১১–দলীয় জোট ঐক্যের বার্তা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি তাসমিয়া প্রধান। তিনি বলেন, এই ঐক্য দেশ গঠনে, দেশের সব সংকটে ১১ দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে—জাতিকে সেই বার্তা দিচ্ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্যও জোটের দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, দলীয় আমিরের অনুপ্রেরণায় তিনি প্রার্থী হয়েছেন। জাতীয় সংসদে গিয়ে নারীদের জন্য, বিশেষ করে যাঁরা বঞ্চিত নারী আছেন, তাঁদের জন্য ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, যাঁরা সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁদের নারী হিসেবে একসময় দায়িত্ব ছিল ঘরসংসার করা। এখন দায়িত্ব হলো তিনটি—ঘরসংসার, সংসদ ও রাজপথ। তাঁরা সংসারে শিশুদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। নারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা যাতে প্রতিফলিত হয়, সংসদের মাধ্যমে সেই সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। সংসদের মাধ্যমে জাতির আশা পূরণ না হলে, নারীর সম্ভ্রম–মর্যাদা–অধিকার রক্ষা না হলে তাঁরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন।

ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ, দলের মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, সদস্য মারদিয়া মমতাজ প্রমুখ।