শেখ হাসিনার দেশে ফেরা
আমরা তো তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত চায়, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা সম্প্রতি কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি শিগগির দেশে ফিরে আসার কথা বলেছেন। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বিগত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার গুঞ্জন ও আইনি অবস্থান সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “আমরা তো তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।”’
ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আছেন তিনি। বাংলাদেশে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে ভারত এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে সিএএ অভ্যন্তরীণ বিষয়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ)’ কার্যকর হওয়া সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্টমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘ভারতের সিএএ বা আসামের এনআরসি তাদের নাগরিকদের জন্য নিজস্ব আইন-কানুন। সেখানে আমাদের কোনো বক্তব্য থাকার অবকাশ নেই। তবে বাংলাদেশের সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে, যেন কোনো প্রকার অবৈধ অনুপ্রবেশ (পুশ ইন) না ঘটে।’
ব্রিফিংয়ে রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলা নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তাঁর স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে সংঘটিত প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রতিটি ঘটনার আসামিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুই ধরনের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ ও ‘রি-অ্যাক্টিভ’ উভয় পদ্ধতিতে কাজ করছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানগুলো মূলত ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেন অপরাধ সংঘটিত হতে না পারে; আর ধর্ষণ বা হত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধের ক্ষেত্রে ‘রি-অ্যাক্টিভ’ ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার ও তদন্ত সম্পন্ন করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে তালিকাভুক্ত করে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লায় ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু হত্যা মামলা। এ ছাড়া কুমিল্লায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বগুড়ায় তরুণী ধর্ষণ, কাপাসিয়ায় পাঁচ খুন এবং ঢাকার মান্ডায় প্রবাসী হত্যাকাণ্ডের মতো প্রতিটি ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিশেষ চিরুনি অভিযান ও ব্লক রেইডের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর ও আদাবর এলাকায় নিশ্ছিদ্র তল্লাশি ও ব্লক রেইড চলছে। এ ছাড়া গত ১৮ ও ১৯ মে যাত্রাবাড়ী ও তেজগাঁও থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে যথাক্রমে ৪১ জন এবং ৬৩ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলেও র্যাব-১৫–এর বিশেষ অভিযানে দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।
আইন সংস্কার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সব আইনকে যুগোপযোগী করা হবে।’
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো সাময়িক ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে চটজলদি আইন প্রণয়ন বা বিশেষ আদালত গঠন করা সমীচীন নয়। দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কোনো ‘অবিচার’ না হয় বা কঠোর আইনের অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।