বন্দী নির্যাতন, কারা সংস্কার এবং সেকালের মুফতিদের ফতোয়া

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কারাগার এক প্রাচীন ব্যবস্থা। ইসলামি শাসনের শুরু থেকে এই ব্যবস্থার বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক যুগের কারাগার ব্যবস্থাপনা, সংস্কার, নিপীড়ন, মুক্তি ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে ৪ পর্বের রচনার আজ দ্বিতীয় পর্ব

ছবি: পেক্সেলস

কারাগারের ইতিহাসে উমাইয়া আমল এক ক্রান্তিকাল। এই যুগে কারাগার যেমন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হয়েছিল, তেমনি এই যুগেই কারাগারকে একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রথম সফল প্রচেষ্টা চালানো হয়।

উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের বন্দিশালাগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা শাসনের দুটি ভিন্ন রূপ দেখতে পাই—একদিকে ক্ষমতার দাপট ও নিষ্ঠুরতা, অন্যদিকে ইনসাফ ও মানবিকতা। 

বন্দি নির্যাতন ওঅন্ধকার কারাগার

উমাইয়া যুগে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সাকাফির শাসনামল ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায়। তার সময়ে কারাগারের ভয়াবহতা বোঝাতে ‘দিমাস’ নামটিই যথেষ্ট ছিল। আরবিতে ‘দিমাস’ অর্থ এমন ভূগর্ভস্থ ঘর যেখানে আলো-বাতাস পৌঁছায় না।

ইমাম মুরতজা জাবিদি তার অভিধানে উল্লেখ করেছেন, হাজ্জাজের কারাগারটি ছিল অত্যন্ত অন্ধকার ও সংকীর্ণ এক সুড়ঙ্গ সদৃশ। (তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরিল কামুস, ১৫/১২৭, দারুল হিদায়াহ, বৈরুত, ২০০১)

সুলতান জহির বারকুকের আমলে যখন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন কায়রোর সাধারণ মানুষ ও বন্দীরা একজোট হয়ে কারাগারের দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসে।

ইবনে জাওজির বর্ণনা অনুযায়ী, হাজ্জাজের ‘ওয়াসিত’ কারাগারে হাজারো নারী-পুরুষ পশুর মতো জীবন যাপন করত। কোনো ছাদ ছিল না। বন্দীরা রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে দেয়ালের ছায়ায় আশ্রয় নিতে গেলে কারারক্ষীরা তাদের পাথর ছুড়ে মাঝখানে পাঠিয়ে দিত। খাবারে বার্লি বা যবের সঙ্গে বালু ও ছাই মিশিয়ে বন্দীদের দেওয়া হতো। ফলে ফর্সা ও গৌরবর্ণের মানুষও কিছুদিন পর জেলে থেকে থেকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মতো কুচকুচে কালো হয়ে যেত। (আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল উমাম ওয়াল মুলুক, ৬/৩২২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)

আরও পড়ুন

আব্বাসীয় যুগেও একই ধরনের নিষ্ঠুরতার নজির পাওয়া যায়। খলিফা মনসুরের আমলে নির্মিত ‘আল-মুতবিক’ ছিল এমনই এক ভূগর্ভস্থ জেল। খলিফা মাহদি যখন তার উজির ইয়াকুব ইবনে দাউদকে সেখানে বন্দী করেন, তখন তার অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়েছিল যে দীর্ঘকাল অন্ধকূপে থাকার ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং তার গায়ের পশম পশুর পশমের মতো বড় হয়ে যায়। (তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৮/১৬২, দারুত তুরাস, বৈরুত, ১৯৬৭)

স্থানীয় প্রতিরোধ

ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে সাধারণ মানুষ কারাগারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। অনেক সময় স্থানীয় জনগণ বা আন্দোলনকারীরা কারাগার ভেঙে বন্দীদের মুক্ত করে দিত। যেমন—বাগদাদে গমের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করে জেলখানার দরজা ভেঙে বন্দীদের মুক্তি দিয়েছিল। (তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ১০/১৭৬, দারুত তুরাস, বৈরুত, ১৯৬৭)

কারাগারের বন্দীদের প্রতি লক্ষ্য রাখো। তারা যেন অযত্নে মারা না যায়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করো।
গভর্নরদের কাছে লেখা চিঠিতে খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ

কায়রোর ‘খাজানায়ে শামায়েল’ কারাগারটি ছিল মধ্যযুগের অন্যতম কুখ্যাত বন্দিশালা। সুলতান জহির বারকুকের আমলে যখন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন কায়রোর সাধারণ মানুষ ও বন্দীরা একজোট হয়ে কারাগারের দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসে। (ইবনে তাগরি বারদি, আন-নুজুমুজ জাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরা, ১১/৩২৪, দারুল কুতুব, কায়রো, ১৯৯২)

কারা সংস্কারে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ

খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) ক্ষমতায় এলে তিনি কারাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অপরাধীকে বন্দী করার উদ্দেশ্য তার সংশোধন, ধ্বংস করা নয়।

আরও পড়ুন

তিনি তার গভর্নরদের কাছে লেখা এক চিঠিতে নির্দেশ দেন, “কারাগারের বন্দীদের প্রতি লক্ষ্য রাখো। তারা যেন অযত্নে মারা না যায়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করো।” (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা ১৫০, দারুল মারিফা, বৈরুত, ১৯৭৯)

ওমর ইবনে আবদুল আজিজই প্রথম প্রতিটি বন্দীর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, বন্দীরা যাতে জুমার নামাজ ও জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারে সেই সুযোগ দিতে হবে (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৫/৩৫০, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)

তার সংস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বন্দীদের শ্রেণিবিন্যাস। তিনি দাগী অপরাধীদের থেকে সাধারণ ঋণগ্রস্ত বন্দীদের আলাদা রাখার এবং নারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রহরীর অধীনে পৃথক জেলখানা তৈরির আদেশ দেন।

ফকিহদের মতে, বন্দীর ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যদি কোনো বন্দী অভুক্ত থাকে, তবে সেই দায় শাসকের ওপর বর্তাবে।

বন্দীদের অধিকারে মুফতিদের ফতোয়া

ইসলামি আইনশাস্ত্রে বন্দীদের অধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হানাফি মাজহাবের ফকিহ ও মুফতিরা এ বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা (র.) নিজেই একজন রাজবন্দী ছিলেন। ফকিহদের মতে, বন্দীর ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যদি কোনো বন্দী অভুক্ত থাকে, তবে সেই দায় শাসকের ওপর বর্তাবে।

ইমাম ইবনুল মোওয়াক আল-মালিকির মতে, নারীর জেলখানা এমন স্থানে হতে হবে যেখানে কোনো পুরুষ থাকবে না এবং সেখানে একজন বিশ্বস্ত নারী রক্ষী নিয়োগ করতে হবে। (আত-তাজ ওয়াল ইকলিল, ৬/১৬৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

এমনকি বন্দীদের সঙ্গে কারারক্ষীরা কেমন আচরণ করবে, সে বিষয়েও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের কড়া নির্দেশ ছিল। তিনি কারারক্ষী নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত দিয়েছিলেন যে, তাকে হতে হবে আমানতদার এবং সে যেন কোনোভাবেই বন্দীদের কাছ থেকে ঘুষ না নেয়। (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ/১৫১, দারুল মারিফা, বৈরুত, ১৯৭৯)।

আগামী পর্বে আমরা দেখব কীভাবে এই জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে মুসলিম মনীষীরা জন্ম দিয়েছিলেন কালজয়ী সব গ্রন্থ।

আরও পড়ুন