নিজ দেশের কর্মকর্তাদের হাত থেকে পালিয়ে বিমানবন্দরে রাত কাটালেন বেলারুশের মেয়ে

টোকিওতে ক্রিস্তিনা তিমানভস্কায়াছবি: টুইটার

জাতীয় অ্যাথলেটিকসের কোচদের কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তিনি। ইনস্টাগ্রামে এ নিয়ে ভিডিও দিয়েছিলেন। সেটিই কাল হলো বেলারুশের অ্যাথলেট ক্রিস্তিনা তিমানভস্কায়ার জন্য। বেলারুশের জাতীয় অলিম্পিক কমিটি তাঁকে গতকাল তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই জোর করে দেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যেটিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তুলনা করছে ‘অপহরণে’র সঙ্গে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন ক্রিস্তিনা।

টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জাপানি পুলিশের কাছে সাহায্য চান ২৪ বছর বয়সী বেলারুশের নারী অ্যাথলেট। দেশে ফিরে গেলে তাঁকে জেলে দেওয়া হবে, এই ভয়ের কথা জানিয়ে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ চান। শেষ পর্যন্ত আর বেলারুশের বিমানে উঠতে হয়নি তাঁকে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সংস্থা (আইওসি) নিশ্চিত করেছে, গতকাল রাতটা হানেদা বিমানবন্দরের হোটেলে কেটেছে ক্রিস্তিনার এবং তিনি ‘নিরাপদে’ আছেন।

টোকিও অলিম্পিকে মেয়েদের ২০০ মিটার এবং ৪ গুণীতক ৪০০ মিটারের দৌড়ে নাম ছিল ক্রিস্তিনার। ২০০ মিটারের হিটের ইভেন্ট আজ থেকে শুরু হয়েছে, ৪ গুণীতক ৪০০ মিটারের হিটের ইভেন্ট শুরু হবে ৫ আগস্ট। কিন্তু ৪ গুণীতক ৪০০ মিটার দৌড়ে তাঁর নাম তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে দিয়েছিল বেলারুশের অলিম্পিক কমিটি, এই অভিযোগ তুলেই গত শুক্রবার ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে দেশের অলিম্পিক কোচদের কড়া সমালোচনা করেন ক্রিস্তিনা।

বেলারুশের অলিম্পিক কমিটি অবশ্য গতকাল এক বিবৃতিতে লিখেছে, ক্রিস্তিনার ‘শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য খেলার মতো অবস্থায় নেই’ বলেই তাঁকে দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো ইভেন্টেই অংশ নেওয়া হয়নি ক্রিস্তিনার।

গত শুক্রবার ইনস্টাগ্রামে ক্রিস্তিনা অভিযোগ করেন, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর নাম ৪ গুণীতক ৪০০ মিটারের দৌড়ে দিয়েছে বেলারুশের অলিম্পিক কমিটি। মূলত ১০০-২০০ মিটার দৌড়ানো ক্রিস্তিনা এর আগে কখনো এত লম্বা দৌড়ে অংশ নেননি বলেও জানান। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশটির কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ক্রিস্তিনা বলেন, ‘দেখা যাচ্ছে আমাদের বসরাই আমাদের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছেন।’

পরে আরেকটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বলেন, ‘এত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাতাম না, যদি আমাকে আগে থেকে বলা হতো, সবকিছু ব্যাখ্যা করা হতো, জিজ্ঞেস করত আমি ৪০০ মিটার রিলেতে দৌড়াতে পারব কি না। কিন্তু তাঁরা সব সিদ্ধান্ত আমার অজ্ঞাতসারেই নিয়ে নিলেন!’

প্রথম ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে ক্রিস্তিনা আরও অভিযোগ করেন, ৪০০ মিটার রিলেতে দৌড়ানো বেলারুশ অ্যাথলেটদের কেউ কেউ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ডোপ টেস্ট শেষ করেননি বলে অলিম্পিকে যেতে পারেননি, সে কারণেই ক্রিস্তিনার নাম সেখানে দিয়ে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য ইনস্টাগ্রামে ভিডিওগুলো মুছে দেন ক্রিস্তিনা। তাঁর দাবি, বেলারুশের অলিম্পিক কমিটির চাপের কারণেই সেটা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

এই ভিডিও প্রকাশের দুদিন পরই গতকাল হলো যত কাণ্ড। ক্রিস্তিনার দাবি, গতকাল বেলারুশের কোচিং স্টাফের সদস্যদের কয়েকজন তাঁর কক্ষে যান এবং ব্যাগ গুছিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইস্তাম্বুল হয়ে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কের উদ্দেশে বিমানে উঠতে বলেন। বেলারুশের অলিম্পিক কমিটি অবশ্য বিবৃতিতে লিখেছে, দলের ডাক্তার ও মনোবিদেরা ক্রিস্তিনার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বুঝেছেন, ক্রিস্তিনা ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে খেলার মতো অবস্থায় নেই।’

কিন্তু ক্রিস্তিনার দাবি পুরো উল্টো। কোচিং স্টাফের সদস্যরা তাঁর কক্ষ থেকে যাওয়ার পর একজন মনোবিদ তাঁর রুমে আসেন বলে জানিয়েছেন ক্রিস্তিনা, তবে মনোবিদের প্রশ্ন করার ধরন ক্রিস্তিনার চোখে ছিল ‘অর্থহীন।’

ক্রিস্তিনা তিমানভস্কায়া
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

সিএনএনে পরে ক্রিস্তিনা বলেছেন, ‘কোনো ডাক্তার আমার কাছে আসেননি। কেউ আমার কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি। মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি ঠিক আছি, এমন একটা ঘটনার পরও। আমি স্বাভাবিকই আছি, স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা আমার নেই, কোনো ট্রমা নেই, কোনো মানসিক ঝামেলা নেই। আমি দৌড়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম।’

ক্রিস্তিনার দাবি, বেলারুশের অ্যাথলেটিকস দলের প্রধান কোচ ইউরি মইসেভিচ তাঁকে বলেছেন, ক্রিস্তিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ‘এই ব্যাপারটা আর (অ্যাথলেটিকস) ফেডারেশনের হাতে নেই, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হাতেও নেই। এটা আরও ওপরের পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।’

তাঁকে এভাবে দেশে ফেরানোতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েন ক্রিস্তিনা। বিমানবন্দরে গিয়ে জাপানি পুলিশের সহায়তা চান। মিনস্কের উদ্দেশে বিমানে চড়বেন না বলে জানিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দিয়ে বলেন, ‘আমাকে চাপে ফেলা হয়েছে। আমার ইচ্ছার বাইরে ওরা আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইছে। আমি আইওসিকে (আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি) অনুরোধ করছি এই ব্যাপারটি দেখার জন্য।’

পরে বেলারুশের ক্রীড়া ওয়েবসাইট ত্রিবুনাকে গতকাল সাক্ষাৎকারে ক্রিস্তিনা বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি যে ওরা বেলারুশে আমাকে জেলে পাঠাবে। জাতীয় দল থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হবে বা বহিষ্কার করা হবে...এটার ভয় আমি করি না। আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। আমার কাছে মনে হচ্ছে বেলারুশ আমার জন্য এই মুহূর্তে নিরাপদ নয়। আমি কিছুই করিনি, কিন্তু ওরা আমার ২০০ মিটারে দৌড়ানোর অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করল, এখন চাইছে আমি যেন দেশে ফিরি।’

ক্রিস্তিনার হয়ে কথা বলছে বেলারুশের স্পোর্টস সলিডারিটি ফাউন্ডেশন (বিএসএসএফ)। দেশটির প্রেসিডেন্টের শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে বিপদে পড়া ক্রীড়াবিদদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম গত আগস্টে, প্রতিষ্ঠা করেছেন বেলারুশের সাবেক সাঁতারু আলিয়াকসান্দ্রা হেরাসিমেনিয়া। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কো বিতর্কিত নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পরই সংগঠনটির জন্ম।

বিমানবন্দরে পুলিশের সঙ্গে ক্রিস্তিনা তিমানভস্কায়া
ছবি: টুইটার

হেরাসিমেনিয়া নিজেও এখন লিথুয়ানিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। ফাউন্ডেশনটির অর্থায়নের জন্য ২০১২ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে জেতা সোনার পদক বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। এই সংগঠনের প্রতিবাদের কারণেই এই বছরের আইস হকির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন বেলারুশের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, টোকিও অলিম্পিকেও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

বিএসএসএফের কর্মকর্তা আনাতোল কোতাউ সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন ক্রিস্তিনার সঙ্গে। সিএনএনকে তিনি জানিয়েছেন, ক্রিস্তিনা হানেদা বিমানবন্দরে ছিলেন।

বিএসএসএফ জানিয়েছে, ক্রিস্তিনা অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করবেন। এর মধ্যে পোল্যান্ড তাঁকে আশ্রয় দেবে বলে ঘোষণাও করেছে। পোল্যান্ডের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন প্রজিদাজ বলেছেন, ‘ক্রিস্তিনা চাইলে পোল্যান্ডে তাঁর খেলার ক্যারিয়ারও চালিয়ে যেতে পারবেন।’

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও (আইওসি) ক্রিস্তিনার দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। আইওসির মুখপাত্র মার্ক অ্যাডামস বলেছেন, ‘তিনি (ক্রিস্তিনা) আমাদের নিশ্চিত করেছেন তিনি সুরক্ষিত আছেন। তিনি পুরো রাত বিমানবন্দরের হোটেলে পুরোপুরি নিরাপদ পরিবেশে কাটিয়েছেন। আইওসি ও টোকিও অলিম্পিক কমিটি তাঁর সঙ্গে এবং জাপানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে, ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে সিদ্ধান্ত নেবে।’

বিশ্বজুড়ে অ্যাথলেটদের দেখভালের জন্য নিয়োজিত সংগঠন গ্লোবাল অ্যাথলেটের মহাব্যবস্থাপক রব কোহলার বলেছেন, ক্রিস্তিনাকে ‘দীর্ঘ মেয়াদে এই সাহায্য করে যেতে হবে।’

রাশিয়ান সংবাদমাধ্যম টিএএসএস জানাচ্ছে, রোববার রাতে ক্রিস্তিনাকে হানেদা বিমানবন্দরে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময়ে তাঁর সঙ্গে অলিম্পিকের আয়োজক কমিটির অন্তত একজন কর্মকর্তা ছিলেন। এরপর পুলিশ জানিয়েছে, ক্রিস্তিনা পুলিশ স্টেশনে নেই, কিন্তু কখন বেরিয়েছেন, সেটা জানায়নি পুলিশ। টিএএসএসের দাবি, ক্রিস্তিনা পুলিশ স্টেশনে ঢোকার পর থেকে ১২ ঘণ্টায় স্টেশনের মূল ফটক দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়া আর কেউ বের হননি। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো গোপন পথে ক্রিস্টিনাকে পুলিশ স্টেশন থেকে বিমানবন্দরের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হতে পারে বলে অনুমান টিএএসএসের।

সিএনএন জানাচ্ছে, তারা পুরো ঘটনা নিয়ে জানতে বেলারুশের জাতীয় অলিম্পিক টিম এবং টোকিওতে বেলারুশের এম্বাসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু দুদিক থেকেই কোনো উত্তর আসেনি।