আফগানিস্তানে প্রথম কোনো প্রাদেশিক রাজধানী পতনের মুখে

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হেলমান্দ প্রদেশের রাজধানী লস্করগাহের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, তালেবানের কাছে আফগানিস্তানের প্রথম কোনো প্রাদেশিক রাজধানীর পতন হতে পারে এটি।

আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় তালেবান।
ফাইল ছবি, এএফপি

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, হেলমান্দ প্রদেশের রাজধানী লস্করগাহের বিভিন্ন অঞ্চলে তালেবানের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান বাহিনী। বিমান হামলা সত্ত্বেও শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে রাজপথে তীব্র লড়াই চালাচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা।
এর আগে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, হেলমান্দের রাজধানী লস্করগাহে তালেবানের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তাদের সাতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তালেবানদের পক্ষ থেকে সেখানকার একটি টেলিভিশন কেন্দ্র দখলের দাবি করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে নানগরহর প্রদেশে তালেবানরা অভিযান জোরদার করেছে বলে কাবুল থেকে জানিয়েছেন আল-জাজিরার সংবাদদাতা। সেখানে সেনাদের সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড লড়াই চলছে। তালেবান যোদ্ধারা প্রদেশের একেবারে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। তারা এখন প্রাদেশিক গভর্নরের কম্পাউন্ড ও পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে বিভিন্ন রাস্তায় অবস্থান করছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি আফগানিস্তানে দুই দশক সামরিক অভিযানের পর সেনা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে দেশটিতে দ্রুত তালেবানের উত্থান ঘটছে। তালেবান যোদ্ধাদের ঠেকাতে মোতায়েন করা হচ্ছে হাজার হাজার আফগান সেনা।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের অন্যতম কেন্দ্র ছিল হেলমান্দ প্রদেশ। এটি তালেবানের দখলে গেলে তা হবে আফগান সরকারের জন্য বড় বিপর্যয়। লস্করগাহের পতন ঘটলে ২০১৬ সালের পর এটি হবে তালেবানদের প্রথম কোনো প্রাদেশিক রাজধানী দখল। বর্তমানে তিনটি প্রাদেশিক রাজধানীর দখল নিতে লড়াই চালাচ্ছে তালেবান।

পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখছেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি।
ছবি: রয়টার্স

এর আগে গত রোববার কান্দাহারের বিমানবন্দরে রকেট হামলা চালিয়েছে তালেবান। ওই হামলার পর থেকে আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে তারা। বিবিসি বলছে, কান্দাহার জয় করলে তালেবানদের যুদ্ধে জয়ী হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এ জয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে তারা। পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন শহর স্পিন বোলডাকেও গত রোববার রাতে নতুন করে লড়াই হয়েছে। কান্দাহার শহরে তালেবানের প্রবেশ আফগান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে তালেবান যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে আফগান বাহিনী। হামলায় ৩৫ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সরকার।

তালেবানের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি বাহিনী। এর জন্য হঠাৎ করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে দায়ী করেছেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির কারণ হলো সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আচমকা নেওয়া হয়েছে ।’ আফগান প্রেসিডেন্ট বলেন, এ বিষয়ে তিনি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেনা প্রত্যাহারের পরিণতি ভালো হবে না।

এ দিকে আফগানিস্তানের শরণার্থীদের অভিবাসনে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত রয়েছে, এমন দুটি সূত্র এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনিক এক কর্মকর্তা রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আফগানিস্তানে চলমান লড়াই-সংঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন অনেক আফগান নাগরিক। তাঁদের সাহায্য করতে বাইডেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

নতুন অভিবাসন উদ্যোগ প্রসঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে চলা প্রকল্প ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের অভিবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

এর আগে বেশ কটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, তালেবানের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পার্লামেন্টে গতকাল সোমবার এক নিরাপত্তা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। জনসমক্ষে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে। তবে এটি প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান।

আফগান সেনাবাহিনী বলেছে, আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় তিন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন জটিল আকার ধারণ করেছে। এসব প্রদেশে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে তালেবানের জোর লড়াই চলছে।

আফগানিস্তানে ২০ বছরের আগ্রাসন শেষে ৩১ আগস্টের মধ্যে দেশটি থেকে সব সেনা সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। গত মে মাসে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে আফগানিস্তানে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা ও বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অভিযান জোরদার করেছে তালেবান।