ইরান যুদ্ধের মূল চরিত্র হয়ে উঠছেন ইন্টারপোলের পরোয়ানাভুক্ত ‘কট্টরপন্থী’ এক জেনারেল
ইরানে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা এখন অনিশ্চয়তার সুতায় ঝুলছে। এ পরিস্থিতিতে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন ইরানের এক আলোচিত কমান্ডার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আছেন এবং ইন্টারপোল তাঁকে খুঁজছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর। এরপর এ বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি।
ইরানে বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভাহিদির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তিন দশক আগে আর্জেন্টিনায় এক বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে ইন্টারপোলও খুঁজছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধী এই জেনারেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্বসূরি পাকপুরের চেয়েও তিনি অনেক বেশি কট্টরপন্থী।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পবিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘তিনি প্রভাবশালী, তবে একটি ব্যবস্থার অংশমাত্র। সেখানে সর্বসম্মতক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ভাহিদির মতামতের জোরালো প্রভাব রয়েছে।’
ইরানে বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র জেনারেল ভাহিদির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তিন দশক আগে আর্জেন্টিনায় এক বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে ইন্টারপোলও খুঁজছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধী তিনি।
ভাহিদি এখন ইরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের একজন। তাঁর এ উত্থান প্রমাণ করে, দেশটিকে নেতৃত্বশূন্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চেষ্টা চালিয়েছিল, তা মধ্যপন্থী কোনো শাসকগোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি। ভাহিদির নেতৃত্বে আইআরজিসি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের রুটটি (হরমুজ প্রণালি) কার্যত আটকে দিয়েছে। এদিকে আগের আলোচনাগুলোর তুলনায় ওয়াশিংটনের কাছে তেহরান এখন আরও বেশি দাবিদাওয়া তুলে ধরছে।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ সিএনএনকে বলেছেন, ভাহিদি অত্যন্ত ‘প্রভাবশালী’ ও ‘কট্টরপন্থী’। তিনি ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি গভীরভাবে অবিচল।
সিট্রিনোভিচ আরও বলেন, ‘ভাহিদিকে পাশ কাটিয়ে আপনি কোনো বিষয়ে একমত হতে পারবেন না। তিনি সেসব মানুষের অন্যতম, যাঁরা বলেন, “আমরা যা চাই, তা না পেলে এবং ট্রাম্প যদি আবার যুদ্ধে জড়াতে চান, তবে তাঁকে স্বাগত।”’
ভাহিদি অত্যন্ত ‘প্রভাবশালী’ ও ‘কট্টরপন্থী’। তিনি ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি গভীরভাবে অবিচল।ড্যানি সিট্রিনোভিচ, ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান
তেহরান শান্তিচুক্তিতে রাজি না হলে আবার যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এ সপ্তাহে তিনি ইরানে আবারও হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।
পরে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা এগোচ্ছে কি না, তা দেখতে তিনি অপেক্ষা করতে রাজি আছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’। চুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা নিয়ে গত বুধবার সকালে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানের ব্যাপারে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। দেখি কী ঘটে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘হয় আমাদের মধ্যে চুক্তি হবে, নয়তো আমরা কঠোর কিছু করতে যাচ্ছি। তবে আশা করছি, এমন কিছু ঘটবে না।’
এদিকে বুধবার ভাহিদি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের মাটিতে যদি আর কোনো হামলা হয়, তবে পরিস্থিতি আর সীমিত আঞ্চলিক যুদ্ধে আটকে থাকবে না। আগেই এ আগুন জ্বালানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। এবার তা দাউ দাউ করে জ্বলবে এবং সব সীমানা ছাড়িয়ে যাবে।’
ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভাহিদি লিখেছেন, ‘তোমরা ধ্বংসাত্মক আঘাতের মুখোমুখি হবে।’
জেনারেল ভাহিদিকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায় না। তবে গত বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমগুলোয় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভাহিদির সাক্ষাতের কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য ছবিগুলোকে ভুয়া বলে প্রমাণ করেছে।
এ কমান্ডারকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায় না। তবে গত বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমগুলোয় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভাহিদির সাক্ষাতের কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য ছবিগুলোকে ভুয়া বলে প্রমাণ করেছে। তারা জানায়, পাকিস্তানের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে ভাহিদি দেখা করেননি এবং ছবিটি মূলত ২০২৪ সালের।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাধারণত জনসমক্ষে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও তাঁদের সামনে দেখা যায়। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ভাহিদি সম্ভবত পর্দার আড়াল থেকে ইরানের সবচেয়ে কট্টর নীতিগুলোর পক্ষে কাজ করছেন।
ইরান এ পর্যন্ত এমন কোনো প্রস্তাব মেনে নেয়নি, যা তার কাছে আত্মসমর্পণ বা নতি স্বীকার করা বলে মনে হয়। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তাব বিনিময়ের পর ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় তেমন কোনো ছাড় দেওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তিনি জানান, তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টিই এখনো এ অচলাবস্থার মূল কারণ হয়ে আছে।
‘পরোয়ানাভুক্ত এক ব্যক্তি’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ একটি ছোট গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে এ গোষ্ঠীর উত্থান। ভাহিদি তাঁদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ভাহিদি খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে উঠেছেন।’ দেশ যখন যুদ্ধের মধ্যে, তখন তাঁর বিশেষ প্রভাব বা ক্ষমতা রয়েছে বলেও ভায়েজ উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই জেনারেল ঠিক কতটা বড় বাধা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত এপ্রিলে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বাতিলের পক্ষে ভাহিদির প্রকাশ্য সম্মতি এটাই প্রমাণ করে যে তিনি প্রয়োজনে আবার যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। তবে ভায়েজ বলছেন, ভাহিদি যে আলোচনার পথে বাধা—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ভাহিদি ১৯৫৮ সালে শিরাজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যুদ্ধ ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে সংঘাতের মধ্য দিয়েই তাঁর আদর্শ গড়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর নতুন শাসনব্যবস্থার শুরুতেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮১ সালে তাঁকে গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইরানের মাটিতে যদি আর কোনো হামলা হয়, তবে পরিস্থিতি আর সীমিত আঞ্চলিক যুদ্ধে আটকে থাকবে না। আগেই এ আগুন জ্বালানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। এবার তা দাউ দাউ করে জ্বলবে ও সব সীমানা ছাড়িয়ে যাবে।আহমাদ ভাহিদি, ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য, জেনারেল ভাহিদি ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘আইআরজিসিই তাঁকে গড়ে তুলেছে।’ আইআরজিসিকে বিদেশি ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় ৮৫ জন নিহত হন। এ হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইন্টারপোল তাঁকে খুঁজছে। এ ছাড়া আশির দশকে ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’র সময় ইসরায়েলিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের খবর পাওয়া যায়। এটি ছিল ইসরায়েল-সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন পরিকল্পনা। এর অধীন ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সেই অর্থ নিকারাগুয়ার কমিউনিস্টবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রা’র তহবিলে দেওয়া হতো।
আইআরজিসির অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের প্রথম কমান্ডার ছিলেন ভাহিদি। বছরের পর বছর ধরে তিনি আইআরজিসি ও ইরানি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২২ সালে ইরানে ইসলামি পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ২২ বছর বয়সী মাসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল দেশটির নীতি পুলিশ। পরে পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। এর জেরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তা কঠোরভাবে দমন করা হয়। সহিংস পন্থায় বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় ভাহিদির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ তখন জানিয়েছিল, ‘হিজাব পরার নিয়ম ভাঙলে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের শাস্তি দেবে বলে ইরানি নারীদের সতর্ক করেছিলেন ভাহিদি।’ তারা আরও জানায়, তিনি প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়েছেন এবং চলমান বিক্ষোভ দমনে পুলিশের নিষ্ঠুর পদক্ষেপের সাফাই গেয়েছেন।
ভাহিদির ওপরেও এখন বিপদের কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাঁর বেশ কয়েকজন পূর্বসূরি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিও রয়েছেন। সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘তিনি (ভাহিদি) পরোয়ানাভুক্ত একজন ব্যক্তি। তবে তাঁকে কোনোভাবেই হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ নেই।’