ছোট হয়ে আসছে গাছের পৃথিবী, এই শতকেই হারিয়ে যেতে পারে অনেক প্রজাতি: গবেষণা

অস্ট্রেলিয়ার অ্যালিস স্প্রিংসের পশ্চিমে ওয়েস্ট ম্যাকডনেল রেঞ্জেস এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইউক্যালিপটাসগাছ। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ছবি: রয়টার্স

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিচিত অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি চলতি শতাব্দীর মধ্যেই হারিয়ে যেতে পারে। কারণ, তাদের বেঁচে থাকার উপযোগী আবাসস্থল বদলে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ছোট হয়ে আসছে এই পরিসর।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন চিত্র। উদ্ভিদকুলের এই হারিয়ে যাওয়া মানুষের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।

গবেষকেরা বিপুলসংখ্যক ভাসকুলার প্ল্যান্ট বা সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদের ভবিষ্যতের বিচরণক্ষেত্র নিয়ে একটি মডেল তৈরি করেছেন। ভাসকুলার উদ্ভিদ হলো এমন উদ্ভিদ, যাঁদের দেহে পানি ও পুষ্টি পরিবহনের বিশেষ টিস্যু বা কলা রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব উদ্ভিদ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

গবেষণায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি বিশ্বের পরিচিত ভাসকুলার উদ্ভিদের প্রায় ১৮ শতাংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে ৭ থেকে ১৬ শতাংশ প্রজাতির উদ্ভিদ তাদের বর্তমান বিচরণক্ষেত্রের ৯০ শতাংশের বেশি হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে এসব উদ্ভিদ বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে পড়বে।

গবেষণায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি বিশ্বের পরিচিত ভাসকুলার উদ্ভিদের প্রায় ১৮ শতাংশ।

ঝুঁকিতে থাকা উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার বিরল প্রজাতির স্থানীয় গাছ ক্যাটালিনা আয়রনউড বা আইল্যান্ড আয়রনউড। আছে ব্লুইশ স্পাইক-মস, যা ৪০ কোটির বেশি বছরের পুরোনো এক প্রজাতির উদ্ভিদের অংশ। অস্ট্রেলিয়ার পরিচিত উদ্ভিদগোষ্ঠী ইউক্যালিপটাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতিও রয়েছে ঝুঁকিতে।

গবেষকেরা উদ্ভিদের অবস্থান–সংক্রান্ত লাখ লাখ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন। পাশাপাশি ২০৮১ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সম্ভাব্য পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেন।

গবেষকেরা বলেন, কোনো উদ্ভিদের আবাসস্থল মানচিত্রে চিহ্নিত শুধু একটি জায়গা নয়। কারণ, কোনো উদ্ভিদের টিকে থাকার জন্য পরিবেশ-সংক্রান্ত নানা উপাদানের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, মাটির ধরন, ভূমির ব্যবহার ও ছায়ার মতো ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অন্যতম।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক জুনা ওয়াং এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক শিয়াওলি দং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক যৌথ মন্তব্যে বলেন, বিষয়টি বোঝার জন্য কল্পনা করুন, উদ্ভিদগুলো একটি চলমান ‘জলবায়ুবলয়’ অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ নিজেদের পর্যাপ্ত শীতল রাখতে উত্তর দিকে বা পাহাড়ের ওপরের দিকে সরে যেতে পারে। কিন্তু তাপমাত্রা একমাত্র বিষয় নয়। বরং তা পুরো গল্পের একটি অংশ মাত্র।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভিদের আচ্ছাদন কমে গেলে বাস্তুতন্ত্র বায়ুমণ্ডল থেকে কম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়তে পারে।
—জুনা ওয়াং ও শিয়াওলি দং, গবেষক

উদ্ভিদ নিয়ে এই গবেষণা বিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘সায়েন্সে’ প্রকাশিত হয়েছে। ওয়াং ও দং এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন।

তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় পরিবেশগত উপাদানের সমন্বয় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এমন এলাকার সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যেখানে কোনো প্রজাতির উদ্ভিদের টিকে থাকার জন্য দরকারি সব শর্ত একসঙ্গে রয়েছে।

উদ্ভিদের বিচরণক্ষেত্রের বিস্তার খুব ধীরে ধীরে হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লেগে যায়। এটা বাতাস, পানি, প্রাণী বা অভিকর্ষ বলের প্রভাবে বীজ ও রেণুর মাধ্যমে হয়।

তবে গবেষকেরা দেখেছেন, উদ্ভিদ নতুন উপযোগী কোনো স্থানে পৌঁছাতে পারলেও নিজেদের বিলুপ্তির ঝুঁকি ঠেকাতে পারে না। কারণ, নতুন স্থানেও তার বিলুপ্তির হার প্রায় একই থাকে।

উদ্ভিদের বিচরণক্ষেত্রের বিস্তার খুব ধীরে ধীরে হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লেগে যায়। এটা বাতাস, পানি, প্রাণী বা অভিকর্ষ বলের মাধ্যমে বীজ ও রেণুর মাধ্যমে হয়।

ওয়াং ও দং বলেন, ধীরগতির বিস্তারই যদি মূল সমস্যা হতো, তাহলে বাধাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিলেই ঝুঁকিতে থাকা উদ্ভিদের বিলুপ্তির শঙ্কা অনেক কমে যেত। কিন্তু গবেষণায় তা দেখা যায়নি। তাই উদ্ভিদ সংরক্ষণের পরিকল্পনাও সে অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে হবে।

গবেষকেরা বলেন, বিচরণক্ষেত্র বিস্তারের সীমাবদ্ধতা কোনো উদ্ভিদের বিলুপ্তির মূল কারণ হলে ‘অ্যাসিস্টেড মাইগ্রেশনের’ মতো কৌশল কাজে আসতে পারত। অর্থাৎ ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতিগুলোকে নতুন এলাকায় স্থানান্তরে সহায়তা করা যেত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিকভাবে উপযুক্ত আবাসস্থলই যদি কমে যায়, তাহলে শুধু স্থানান্তর যথেষ্ট না–ও হতে পারে।

তবে বিশ্বের সব অঞ্চলে উদ্ভিদের আবাসস্থল একই হারে সংকুচিত হবে না।

আর্কটিক অঞ্চলের শীতনির্ভর উদ্ভিদগুলো শীতল আবহাওয়া আরও চরম হওয়ার কারণে আবাসস্থল হারাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল ও ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের মতো শুষ্ক এলাকাগুলোতে তীব্র খরা, মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলে সমুদ্র উপকূল উদ্ভিদের মেরুমুখী বিস্তার সীমিত করতে পারে।

একই সময়ে পৃথিবীর প্রায় ২৮ শতাংশ স্থলভাগে স্থানীয় উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। কারণ, বিভিন্ন প্রজাতি নতুন উপযোগী এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।

এর মধ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের কিছু অংশ রয়েছে। সেখানে শুধু তাপমাত্রা নয়, বৃষ্টি বৃদ্ধিও অতিরিক্ত উদ্ভিদ প্রজাতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে কিছু প্রজাতি তাদের ঐতিহাসিক বিচরণক্ষেত্রের অংশবিশেষ থেকে হারিয়ে যাবে। আবার অন্যগুলো নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে।

তবে স্থানীয়ভাবে বৈচিত্র্য বাড়ার অর্থ এই নয় যে সামগ্রিকভাবে উদ্ভিদজগৎ ভালো অবস্থায় থাকবে।

এই পরিবর্তনের ফলে নভেল কমিউনিটি বা নতুন ধরনের উদ্ভিদসমাজ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ এমন সব উদ্ভিদের সমন্বয় তৈরি হবে, যারা ইতিহাসে কখনো একসঙ্গে বসবাস করেনি।

এসব পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠবে, তা গবেষকেরা এখনো জানেন না।

স্থলভাগের অধিকাংশ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হলো উদ্ভিদ। এগুলো কার্বন সংরক্ষণ করে, মাটিকে স্থিতিশীল রাখে, বন্য প্রাণীকে সহায়তা করে। পাশাপাশি খাদ্য, কাঠ, ওষুধসহ নানা উপকরণ সরবরাহ করে।

ফলে উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের পরিবর্তন প্রকৃতি ও মানুষের ওপর ধারাবাহিক প্রভাব ফেলতে পারে।

ওয়াং ও দং বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভিদের আচ্ছাদন কমে গেলে বাস্তুতন্ত্র বায়ুমণ্ডল থেকে কম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়তে পারে। তাঁরা আরও বলেন, এতে একটি প্রতিক্রিয়ামূলক চক্র তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভিদের ক্ষতি করে, আবার উদ্ভিদের আচ্ছাদন বা উৎপাদনশীলতা কমে গেলে জলবায়ু পরিবর্তন আরও তীব্র হয়।

এই দুই গবেষক আরও বলেন, উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রক্ষা করা শুধু প্রকৃতিকে সংরক্ষণের বিষয় নয়। এটি মানবসমাজকে টিকিয়ে রাখা পরিবেশগত ব্যবস্থাগুলো বজায় রাখার সঙ্গেও জড়িত।