ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি দিয়ে সেদিনই সিদ্ধান্ত বদলালেন ট্রাম্প, নেপথ্যে কী
তেহরানের সঙ্গে আলোচনা ঝুলে থাকার মধ্যে ইরানে নতুন করে হামলার শুরুর অনুমোদন দেওয়ার কথা সোমবারই জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, এই সপ্তাহে শুরু হবে সেই হামলা। আবার সেদিনই তিনি পাল্টে ফেলেন সিদ্ধান্ত; জানান, আপাতত এই অভিযান স্থগিত থাকছে। কারণ ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার’ জন্য সুযোগ দিচ্ছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি প্রশ্নে আরও কাজ করার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তিনজন নেতা সময় চাওয়ায় তিনি মত বদলেছেন।
ট্রাম্প বারবারই ইরানে নতুন হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তবে শেষ মুহূর্তে সে অবস্থান থেকে সরে আসছেন। সোমবার আবার একই কাজ করেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (মঙ্গলবার) বড় ধরনের একটি হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু আমি সেটি কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে রেখেছি। তা সব সময়ের জন্য হতে পারে, আবার সাময়িক সময়ের জন্যও হতে পারে। কারণ, ইরানের সঙ্গে আমাদের খুব বড় আলোচনা হয়েছে। এখন দেখা যাক তার ফল কী দাঁড়ায়।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু সেই যুদ্ধের তিন মাস পূর্ণ হতে চলেছে। ট্রাম্প এই সংকটের মধ্যে আছেন, হয় ইরানকে চাপ দিয়ে নতি স্বীকার করাতে হবে, নয়তো যুদ্ধ শেষ করে বিজয় ঘোষণা করতে হবে।
এ অবস্থায় যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে বড় ধরনের অসংগতি দেখা দিচ্ছে। একবার তিনি বলছেন যুদ্ধ ‘শেষ’, আবার পরক্ষণেই বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে কাজ শেষ করতে হবে। এ ছাড়া গত এপ্রিল মাসে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। এটিকে আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।’ আবার সেই সময়সীমায় পৌঁছানোর আগেই তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধে ইরানের সরকার বড় ধরনের প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করার সক্ষমতাও তাদের আছে। এখন পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক মজুতেও কোনো দাগ ফেলা যায়নি।
ট্রাম্প বলেছিলেন, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু সেই যুদ্ধের তিন মাস পূর্ণ হতে চলেছে। ট্রাম্প এই সংকটের মধ্যে আছেন, হয় ইরানকে চাপ দিয়ে নতি স্বীকার করাতে হবে, নয়তো যুদ্ধ শেষ করে বিজয় ঘোষণা করতে হবে।
তবুও এই সামরিক অভিযানের কারণে ইরানের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তারা প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পেরেছে। ইরানের নৌবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মারা পড়েছেন। ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহতের তালিকায় রয়েছেন।
ইরানে যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের কাছ থেকে খুব একটা সমর্থন পাননি ট্রাম্প। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। বেশির ভাগ ভোটার যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচ নিয়েও অসন্তুষ্ট।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনাও স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের দেওয়া একাধিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে ইরানের পক্ষ থেকে আরও বেশি ছাড় চাইছেন তিনি।
তবে ট্রাম্প এখন বলছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাঁকে হামলার সময় পিছিয়ে দিতে বলেছেন। ওই নেতাদের বিশ্বাস, তাঁরা এমন একটি চুক্তি বের করে আনতে পারবেন, যা ওয়াশিংটনকে সন্তুষ্ট করবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এই তিনটি দেশসহ আরও কয়েকটি দেশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা এখন আমাদের লোকজন ও ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। মনে হচ্ছে, তারা একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। যদি বোমা না ফেলেই এটা করা যায়, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।’
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে হবে। তাঁর এই দাবিটিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশ এখনো পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে একমত হতে পারেনি।
মঙ্গলবার কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে চেয়েছিলেন, তা ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, সামরিক বাহিনী বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে। এর মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই যুদ্ধে ইরানের সরকার বড় ধরনের প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করার সক্ষমতাও তাদের আছে। এখন পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক মজুতেও কোনো দাগ ফেলা যায়নি।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘গ্রহণযোগ্য চুক্তি’ না হলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণমাত্রায় বড় আকারে হামলার’ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিনি শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যটি বিভ্রান্তি তৈরির কৌশলও হতে পারে বলে মনে করেছেন কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প এখনো হামলার পথে এগোতে পারেন। কর্মকর্তারা এ কথা মনে করিয়ে দেন যে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা যখন নতুন দফা আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তার কয়েক দিনের মধ্যেই কিন্তু হামলা শুরু হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক মাসের যুদ্ধবিরতি চলাকালে ইরান বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও চাপা পড়া বহু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি খুঁড়ে বের করেছে। তারা ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্রও সরিয়েছে এবং নতুন করে হামলা শুরু হলে কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেই কৌশলও বদলেছে।
তবে ট্রাম্প এখন বলছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাঁকে হামলার সময় পিছিয়ে দিতে বলেছেন। ওই নেতাদের বিশ্বাস, তাঁরা এমন একটি চুক্তি বের করে আনতে পারবেন, যা ওয়াশিংটনকে সন্তুষ্ট করবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ভূগর্ভের গভীরে থাকা গুহা ও গ্রানাইট পাহাড় কেটে তৈরি করা স্থাপনায় ইরানের অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখা ছিল। এসব জায়গা ধ্বংস করা মার্কিন যুদ্ধবিমানের পক্ষে কঠিন। তাই যুক্তরাষ্ট্র মূলত এসব স্থাপনার প্রবেশপথে বোমা হামলা চালায়, যেন সেগুলো ধসে পড়ে ও চাপা পড়ে যায়। তবে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। এখন ইরান এসব ঘাঁটির অনেকগুলো আবার চালু করেছে।
এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের সেনা কর্মকর্তারা সম্ভবত রাশিয়ার সহায়তায় মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর গতিবিধি বুঝে ফেলেছে। তিনি বলেন, গত মাসে একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া এবং একটি এফ-৩৫ উড়োজাহাজে গুলি লাগার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কৌশল ইরান আগে থেকেই অনুমান করতে পারছিল। তাই তারা ভালোভাবে প্রতিরোধ করতে পেরেছে।
যদিও পাঁচ সপ্তাহের টানা বোমা হামলায় কয়েকজন নেতা ও সামরিক কমান্ডারকে হারাতে হয়েছে, তারপরও ইরান এই যুদ্ধে নিজেদের আরও শক্তপোক্ত প্রতিপক্ষে পরিণত করতে পেরেছে বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন। তাঁর ধারণা, ইরান তাদের অবশিষ্ট অস্ত্রের বড় অংশ নতুন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে হোক বা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে হোক কিংবা মার্কিন যুদ্ধবিমানকে হুমকির মুখে ফেলেই হোক—তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।