আসুন অন্যদের প্রেরণা দিই
সময়টা দুঃসময়ে পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীতে করোনাভাইরাস থাবা বসিয়েছে। মানুষের জীবনে তুফান বয়ে চলছে। ভাইরাস লন্ডভন্ড করে দিয়েছে সবকিছু। অর্থনীতি স্থবির, শেয়ার মার্কেটের চাকা ঘুরছে না। থমকে গেছে সবকিছু। যেন অলিখিত একটা যুদ্ধ চলছে। আমরা ভাইরাস দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু যুদ্ধ করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
এর মধ্য দিয়েই চলছে জীবন। মরণব্যাধি এই ভাইরাসের বিস্তার রোধে ঘরে বসেই দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে সবাই। এই দীর্ঘ সময়ে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এ সময় আমাদের দরকার মন-মানসিকতা শক্ত রাখা। মনে করতে হবে, এ বৈরী সময় কেটে যাবে দ্রুত।
ধৈর্য ধরতে হবে। একজন অন্যজনকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। বাসার কাজ দুজনেই ভাগ করে করতে হবে দূরত্ব বজায় রেখে। যে যে কাজ করতে পছন্দ করে, তাই করা উচিত। সিনেমা দেখতে চাইলে পছন্দের তালিকা করে একটি একটি করে দেখা যায়। প্রিয় লেখকের বই পড়া যায়। বিভিন্ন রকম রান্না শেখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাকটিভ থাকা যায়। নামাজ পড়ে দোয়া করা যায়, যেন এই অবস্থা থেকে আমরা দ্রুত মুক্ত হই। আসলে যেই কাজটা যে করতে পছন্দ, তাই করা উচিত। যাদের বাসায় ট্রেডমিল আছে ,তারা নিয়মিত এক্সারসাইজ করতে পারে।
প্রতিবেশী, আত্মীয়দের অনেকে ভাইরাসে আক্রান্ত। আমিও আক্রান্ত হব, এমন ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই চিন্তা অনেককে অসুস্থ করে তুলছে। হ্যাঁ, চোখের সামনে অনেকে মারা গেছে। তা দেখে ভেঙে পড়া উচিত নয়। বরং সতর্ক থাকা উচিত, তবে মনের দিক থেকে দুর্বল হওয়া ঠিক না। এতে করে ভাইরাসে আক্রান্ত না হলেও অন্য রোগ বাসা বাঁধতে পারে। ভাইরাস শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে গিয়েও অনেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছে আপন মানুষের কাছে। অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়া মানে এই নয় যে, মরে যাব। যতক্ষণ বাঁচি প্রাণশক্তি নিয়ে বাঁচতে চাই—এ রকম ভাবতে হবে।
এ মুহূর্তে আমেরিকায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত ৭ লাখ ৪০ হাজার প্রায়, যা কল্পনাও করার কথা না। এ লেখা যখন প্রকাশ পাবে, তখন সংখ্যা হয়তো আরও অনেক বাড়বে। এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের। গড়ে যদি ধরা হয়, সে ক্ষেত্রে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যু অনেক কম। তবুও কোনো মৃত্যু কাম্য নয়।
কিন্তু এটিই বাস্তবতা। ভালো দিক হচ্ছে, সুস্থ হয়ে ফিরেছে মানুষ। এর সংখ্যাও অনেক; প্রায় ৭০ হাজার। আসলে মনের শক্তি ও সাহসে অনেকে এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠেছে। আমেরিকার প্রতিটি স্টেটেই করোনাভাইরাস তাণ্ডব চালিয়েছে। এক অস্থির জীবনযাপন করছে মানুষ। বলা হচ্ছে, এই এপ্রিল মাসেই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর গ্রাফ ওপরের দিকেই থাকবে। অর্থনীতি সচল রাখতে বন্ধ সবকিছু খুলে দেওয়ার কথা ভাবছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর সঙ্গে অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর, নগরগুলোর মেয়রেরা একমত নন। তাঁরা বলছেন, মানুষের জীবন যেখানে হুমকির মুখে, সেখানে এই সময়ে সবকিছু বন্ধ থাকাই বাঞ্ছনীয়। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমেরিকার চিত্র। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, যা বিশ্বে রেকর্ড। বিশেষ করে নিউইয়র্কে। অন্য অঙ্গরাজ্যের তুলনায় নিউইয়র্কে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। প্রতিদিন শত শত মরদেহ জমা হচ্ছে হিমাগারে। হিমশিম খাচ্ছ সেখানকার দায়িত্বরত কর্মীরা। এত বেশি মরদেহ যে, এখন গণকবর দিতে হচ্ছে!
বাস্তব বড় কঠিন, এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই আমাদের চলতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে। দুঃখের ভারে নুয়ে পড়লে সূর্য ওঠা বন্ধ হবে না, সময় থমকে যাবে না। হ্যাঁ ,যারা আপনজন হারিয়েছে সে ব্যথা তারা বয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের পরিবারে যারা বেঁচে আছে, অন্য সদস্য যারা আছে, তাদের কথাও ভাবতে হবে। জীবন একটিই। এই এক জীবনে উত্থানপতন, কষ্ট, দুঃখের সাগর পাড়ি দিয়েই আমাদের চলতে হবে। মরা লাশ হয়ে বেঁচে থাকা যায় না।
মানুষের মন বিচিত্র। অনেক সময় আমরা একে অন্যকে সাহস দিই। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে নিজেই ভেঙে পড়ি, ভান করে থাকি। এখন সে সময় নয়। অনেক দূর যেতে হলে, পথ চলতে হলে আমাদের একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াতেই হবে। এর বিকল্প নেই। এই দুর্যোগ আমরা মোকাবিলা করতে পারব, যদি পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করি।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই লাইনগুলো মনে পড়ছে, ‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি নিতে হবে তরী পার।’ ভাইরাসের এই তুফান পাড়ি দিতে হলে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই। আমেরিকায় অনেক সংগঠন দাঁড়িয়েছে, সহযোগিতা করছে অন্যদের। এটাই হওয়া উচিত।
ভাইরাসের কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো ফিরে আসবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে আর ক্ষতি না হয়, সেটিই ভাবতে হবে। এখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। আসুন এই যুদ্ধে আমরা অন্যদের প্রেরণা দিই, বাঁচতে শেখাই। ইতালিতে দেখেছিলাম, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মানুষ সে দেশের ডাক্তারদের উৎসাহ দিচ্ছে, প্রেরণা দিচ্ছে। এটি হয়তো বড় কিছু না, কিন্তু এই ছোট ছোট প্রেরণাগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
নিউইয়র্কেও দেখেছি, কিছুদিন আগে রাস্তায় কিছু মানুষ ডাক্তার, নার্স ,পুলিশকে অনুপ্রেরণা দিতে। সাময়িক এসব কাজ মনকে প্রফুল্ল রাখে। আর এতে কাজ করতে সুবিধা হয়, কাজটাও সুন্দর হয়। মানুষের জীবনের সঙ্গে মনের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। এই দুঃসময়ে আমরা যদি সাহস রাখি, ব্যথিত মানুষের পাশে থাকি, সেই মানুষগুলো সাহস পাবে। নিঃসঙ্গ হয়ে বাঁচা যায় না, বরং আস্তে আস্তে ধাবিত হয় অন্ধকারে। আসলে জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। বেঁচে থাকাটাই হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর। আর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা হলো সুন্দরতম। আসুন আমরা দুঃসময়ের পাহাড় ডিঙিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।