গবেষণায়ও নাক গলাচ্ছেন ট্রাম্প

ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের মতের বাইরে অন্য কোনো মত সহ্য করতে পারেন না, এ কথা সবাই জানেন। মুশকিল হচ্ছে বিশ্বের খুব কম জিনিসই রয়েছে, যেখানে তাঁর নিজস্ব কোনো দৃঢ় মত নেই। এমনকি এই যে গোটা বিশ্ব করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই পর্যায়েও তিনি এর চিকিৎসা শুধু নয়, ভ্যাকসিন গবেষণার মতো গুরুতর বিশেষজ্ঞ বিষয়েও নিজের মতটি দিচ্ছেন। শুধু মত দেওয়াটা কোনো দোষের কিছু নয়। কিন্তু যখন এই মতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞদের মত না মিললে, তিনি চটে যান, তখনই ঘটে বিপত্তি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি তাঁর মতের বিরুদ্ধে কাউকে সহ্য করেন না। ফলে তাঁর ক্ষমতার মেয়াদকাল হোয়াইট হাউসের জন্য এক অস্থিরতার সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। হোয়াইট হাউসের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারকে তিনি মিউজিক্যাল চেয়ার বানিয়ে ছেড়েছেন। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু তাতে ট্রাম্পের কী আসে যায়। এই মহাদুর্যোগকালেও এই মহা-স্তুতি আসক্ত প্রেসিডেন্ট একজন গবেষক ও বিশেষজ্ঞকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করলেন, শুধু তাঁর মতের বিরোধিতা করার কারণে।
নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২২ এপ্রিল মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস বায়োমেডিক্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথোরিটির (বার্ডা) পরিচালকের পদ থেকে ড. রিক ব্রাইটকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে জরুরি সাড়া ও প্রস্তুতি বিভাগের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আর এই ঘটনাটি ঘটেছে প্রেসিডেন্টের মতের বিরুদ্ধে মত দেওয়ার কারণেই। কথা হলো কোন মত?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রিক ব্রাইটের মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা শুরু থেকেই কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে অব্যর্থ হিসেবে দাবি করে আসছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা বারবার এ ক্ষেত্রে সতর্ক করছেন যে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কোনো প্রমাণিত ওষুধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন বলেই এই দ্বিতীয় দলের লোক ছিলেন রিক ব্রাইট। তাঁকে এখন ন্যাশনাল হেলথ ইনস্টিটিউটে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে।
এই সময়ে রিক ব্রাইটের মতো ব্যক্তিদের কথাই সবার শোনা জরুরি। কিন্তু সেদিকে হাঁটছেনই না ট্রাম্প। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে আমেরিকায় কেন্দ্রীয়ভাবে যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তারই গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন রিক ব্রাইট। অথচ তাঁর বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে একজন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক কী অবলীলায় অবজ্ঞা করলেন। এই অবজ্ঞার চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিশ্ব আরও হাজার হাজার মানুষের প্রাণ হারাতে পারে। একইভাবে ট্রাম্প অবজ্ঞা করে যাচ্ছেন মার্কিন শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে হোয়াইট হাউস গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্য অ্যান্থনি ফাউসিকে। ফাউসিসহ বিশেষজ্ঞরা বারবার অর্থনীতি সচল করার আগে আরও অপেক্ষার আহ্বান জানালেও ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা তা মানতে নারাজ।
শুধু তাই নয়, ট্রাম্প সব বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলছেন, আগামী শীতে করোনাভাইরাসের ফের প্রাদুর্ভাবের কোনো আশঙ্কা নেই। অথচ অ্যান্থনি ফাউসি বারবার করে বলছেন যে, আগামী শীতে এটি আবার হানা দেওয়ার আশঙ্কা শতভাগের কাছাকাছি। হয়তো ফাউসিসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা যেমনটা বলছেন, তেমন তীব্র আক্রমণ হবে না, বা এক বছরের টানা আক্রমণের পর মানুষও এর প্রতিরোধের কিছুটা ক্ষমতা অর্জন করবে। কিন্তু একেবারেই আক্রমণ করবে না ধরে নিলে যে গা-ছাড়া ভাবটি আসে, তাতে অনেক বেশি প্রাণহানির শঙ্কা থাকে। অ্যান্থনি ফাউসিসহ অন্যরা এ কারণেই বারবার দ্বিতীয় আক্রমণের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করার চেষ্টা করছেন।
ক্ষুব্ধ রিক ব্রাইট ট্রাম্পের পদক্ষেপের সরাসরি সমালোচনা করে বলছেন, প্রেসিডেন্ট যে ওষুধটিকে বারবার ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করছেন, তা ভয়ংকর হতে পারে। ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই ওষুধ করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় একটি কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধ পেতে এবং একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন পাওয়ার লক্ষ্যে কংগ্রেসের অনুমোদনক্রমে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে সরকার। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়—এমন কোনো সমাধান পেতে এ বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। আমি বারবার বলেছি, এই ভয়াবহ ভাইরাসকে রোধ করতে পারবে বিজ্ঞান, রাজনীতি বা স্বজনপ্রীতি নয়। আর এটিই আমাকে বদলি করার কারণ।’
আমেরিকায় যখন নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে আট লাখ ছুঁই ছুঁই, যখন মৃতের সংখ্যা ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্য যেকোনো সময়ের মতোই এই গোঁয়ার্তুমি সবাইকে অবাক করছে। প্রেসিডেন্ট নিজের কথা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে চান না। তিনি যেকোনো মূল্যে এই সংকট থেকে বেরিয়ে অর্থনীতিকে সচল করতে চান। তিনি আগামী নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে একটি বাজে দিনও কাটাতে চান না। ট্রাম্প ভুলে যাচ্ছেন, এভাবে যেনতেন উপায়ে সংকট মোকাবিলা করা যায় না। বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে দূরে ঠেলে নিজের পছন্দমতো বক্তব্য শোনার শিশুসুলভ ইচ্ছা নিয়ে সংকটের সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।
এই সংকটকালে শুধু ট্রাম্প নন, রাজনীতিকসহ অন্য সব পেশাজীবীকেই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও এর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা মেনে নেওয়া জরুরি। মহামারির দুর্যোগ, যুদ্ধকালের বুদ্ধি দিয়ে পার হওয়া সম্ভব নয়। একটি ভ্যাকসিন বা ওষুধ তৈরির যে পদ্ধতি, সেখানে শর্টকাটের কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ভুলভাল কোনো ওষুধকে নিরাপদ হিসেবে সাব্যস্ত করে অনুমোদন দিলে, তা আখেরে অনেক বাজে ফল নিয়ে আসবে। অথচ ট্রাম্প সেই শর্টকাট পথেই হাঁটছেন।
এটুকুতে আটকে থাকলেও চলত। ট্রাম্প আরও ভয়াবহ কাজ করছেন। সরাসরি না হলেও পরোক্ষ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে লকডাউন ভেঙে রাস্তায় লোকেদের নেমে আসায় উৎসাহ জোগাচ্ছেন। লকডাউন তুলে নেওয়ার দাবিতে মিশিগান, মিনেসোটা, ওহাউও, ইউটাহ, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে এবং হচ্ছে। এই বিক্ষোভগুলোর প্রশংসা করে মত ব্যক্ত করেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট।
এই দুঃসময়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভাজন করতে ছাড়ছেন না। নাগরিক সহায়তার জন্য যে ২ লাখ কোটি ডলারের অনুমোদন দিয়েছে কংগ্রেস, তাতে অভিবাসী স্থানীয় নির্বিশেষে সবার অধিকার রয়েছে। অথচ শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ড্রিমাররা (ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস বা ডাকা কর্মসূচির আওতাধীন) কিছু পাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তর থেকে। একে বড় ধরনের বৈষম্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসব ছোট ছোট রাজনৈতিক স্বার্থে বা নিজের ভেতরে থাকা বিদ্বেষকে চরিতার্থ করতে ট্রাম্প নানা রাজনৈতিক চাল দেবেন বা নিজের ভিন্নমতকে দমনে যা নয় তাই করবেন, এতে এখন আর কেউ অবাক হয় না। কিন্তু রিক ব্রাইটের মতো একজন ব্যক্তিকে ওষুধ ও ভ্যাকসিনের মতো গুরুতর বিষয়ে মতবিরোধের জেরে ট্রাম্প সরিয়ে দেবেন এমন এক সময়, যখন গোটা বিশ্ব একটি কার্যকর ওষুধ ও ভ্যাকসিনের জন্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের দিকে তাকিয়ে আছে—তা হয়তো কেউই ভাবতে পারেনি। কিন্তু ট্রাম্প এটিই করেছেন। আর এটি তিনি করেছেন কোনো বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে নিজের ভেতর ধারণের চেষ্টা ছাড়াই। বিজ্ঞান না বুঝলেও ট্রাম্প এমন এক ব্যক্তি, যিনি এমন দুর্যোগেও বিজ্ঞান বিষয়ে হস্তক্ষেপে এতটুকু কুণ্ঠিত হন না। এমন ব্যক্তি শুধু আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এই সময়ে বিপজ্জনক। কারণ, গোটা বিশ্ব এখন আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের গবেষকদের দিকে একটি কার্যকর নিদানের জন্য তাকিয়ে আছে।