মানবিকতার ঝরনাধারা

সারা বিশ্বের মহামারি করোনার প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে নিউইয়র্কে বিপদগ্রস্ত স্বদেশিদের পাশে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে দাঁড়িয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কবর, খাদ্যসামগ্রী, মাস্কসহ অন্যান্য জিনিস নিয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটি, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার, ফোবানা, জ্যামাইকা ফ্রেন্ডস সোসাইটি, বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, আবদুল কাদের মিয়া ফাউন্ডেশন, জেবিবিএ, বিল্ডিং আওয়ার মুভমেন্ট, বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতি, মজুমদার ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশি-আমেরিকান বংশোদ্ভূত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী খাইরুল ইসলাম, জয় চৌধুরী, সারা হোসাইন, মোবাইল ক্যারিয়ার ব্যবসায়ী হিমু আমিনসহ অনেকে।
কুইন্সের ওজোন পার্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী খাইরুল ইসলাম এক মাস ধরে প্রায় দুই হাজার পরিবারকে খাবার বিতরণ করে আসছেন। অ্যাসেম্বলি মেম্বার প্রার্থী জয় চৌধুরী, আমেরিকার যেকোনো সংকটের সময় এই বাংলাদেশি তরুণের সাহসিকতা কমিউনিটিতে খুব প্রশংসনীয়। করোনা মোকাবিলায় এবারও তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন।
নিউইয়র্কে অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ কর্মকর্তা যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তাদেরও সাহায্য করছেন হিমু আমিন ও ইফতেখার চৌধুরী নামের দুই বাংলাদেশি।

২০ এপ্রিল (সোমবার) নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনসহ (জেবিবিএ) কয়েকটি সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকে দুই শতাধিক প্রবাসীর মধ্যে খাদ্য-সামগ্রীর প্যাকেট বিতরণ করা হয়।
এ সময় জানানো হয়, এক সপ্তাহ পর আবার একেকটি বাক্সে ২০ পাউন্ড চাল, পেঁয়াজের বস্তা, মসুরের ডাল, চিনি, লবণ, ছোলা বুট, তেল, ন্যাপকিন বিতরণ করা হবে। ইতিমধ্যেই অন্তত ৫০ প্রবাসীর বাসায় খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেট পৌঁছানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের পরিচিত সংগঠন ড্রামা সার্কেলের সভাপতি আবীর আলমগীর জানিয়েছেন, আমরা সবাই মিলে বেশ কয়েকটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি, ভুক্তভোগীদের খবর পেতে শুরু করেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। পরিবারের কেউ হয়তো মারা গেছেন, বাজার করার কেউ নেই। কেউ হয়তো চাকরি হারিয়েছেন, খাবার কেনার জমানো টাকা নেই। এমন কিছু পরিবারের জন্য সপ্তাহান্তের বাজার করে তাদের ঘরের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছি আমরা ড্রামা সার্কেলের সব সদস্য। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী একেকজনের অসহায় অবস্থার গল্প শুনলে আপনাদেরও চোখে পানি চলে আসবে। ভবিষ্যতে তাদের সবার গল্প হয়তো কখনো শেয়ার করব। আবীর আলমগীর ৩টি বিপন্ন পরিবারের কথা জানিয়েছেন।
প্রথমজন ৫৪ বছর বয়সী নারী। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী এখন লাইফ সাপোর্টে, সংসারে দুই সন্তান, সবাই এখনো পড়াশোনা করে, সংসারে আরও আছেন দুজন সিনিয়র সিটিজেন। সংসারে উপার্জন করার কেউ নেই, চোখে এখন অন্ধকার দেখছেন, জানেন না কীভাবে চলবে তাদের সংসার।
দ্বিতীয়জন ২৩ বছর বয়সী নারী। তিন মাস আগেই স্বামীসহ নিউইয়র্কে এসেছেন। গত সপ্তাহে করোনায় স্বামী মারা গেছেন। এখন ওই নারী জানেন না, কীভাবে তিনি এই নগরে বেঁচে থাকবেন।
তৃতীয়জন ৪৩ বছর বয়সী নারী। ক্যানসার পেসেন্ট, কাজ করেন না, ১১ বছরের একটি সন্তান রয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে তার সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
জ্যাকসন হাইটসে খাবার বাড়ি রেস্টুরেন্ট চত্বরে এসব সামগ্রী বিতরণ করেন জেবিবিএর নেতাদের মধ্যে হারুন ভূঁইয়া, মোহাম্মদ আলম, ফাহাদ সোলায়মান প্রমুখ।
বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, ইতিমধ্যেই ২৮ প্রবাসীর মরদেহ দাফনে সহায়তা করা হয়েছে। সমিতির কেনা কবরে তাদের দাফন করা হয়েছে।
এই সমিতির সেক্রেটারি জাহিদ মিন্টু বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত প্রবাসী, বিশেষ করে নবাগতদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরই সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ শুরু করতে পারেননি। তারা সরকারের প্রণোদনাও পাবেন না। এমন মানুষের মধ্যে রমজানেও চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, লবণ, মুড়ি ইত্যাদি বিতরণ করা হবে।
এদিকে, ফোবানার ভাইস চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী বলেন, যারা মহাসংকটে পড়েছেন এবং বাসার বাইরেও যেতে পারছেন না, এমন অসহায় প্রবাসীদের তালিকা করা হচ্ছে।
সে অনুযায়ী এক সপ্তাহের চাল, ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, আদা, মুড়ি, খেজুরসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস গ্রোসারিসহ খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। খাদ্য সহায়তা পেতে যোগাযোগের জন্য ৩৪৭ ৯৯৫ ৮৫৩৫, ৩৪৭ ৬৩৬ ৫১৫৩ বা ৭১৮ ৬৯০ ৪৫৫৬ নম্বরে ফোন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার বিপদগ্রস্ত লোকজনকে খাবার, আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ৭১৮ ৭৩৯ ৩১৮২ নম্বরে ফোন করা যাবে।
আসসাফা ইসলামিক সেন্টার ম্যানহাটনে মৃতদেহ দাফনে অসমর্থ পরিবারকে কবরের জায়গা দিচ্ছে। তবে ফিউনারেলের ব্যয় দিতে হবে। যোগাযোগের জন্য মুফতি লুৎফুর রহমান কাসেমিকে (২১২ ২০৩ ৮৬৯৫) ফোন বা প্রয়োজনে বার্তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। জ্যামাইকা ফ্রেন্ডস সোসাইটি থেকে হেলথ সাপোর্ট, ফুড সাপোর্ট, ফিউনারেল সহযোগিতাসহ অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। যোগাযোগের জন্য ফখরুল ইসলামকে (৯১৭ ৪৯৪ ৫১৬৩ বা ৩৪৭ ৬৯১ ১২১০) ফোন করা যাবে।
এসেনশিয়াল হোম কেয়ারের পক্ষ থেকে বিপদাপন্ন লোকজনকে আর্থিক সহায়তাসহ যেকোনো সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রাখা হবে। যোগাযোগের জন্য ৩৪৭ ৬৯১ ১২১০ নম্বরে কল দেওয়া যাবে।
স্বাস্থ্য সমস্যা, পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশি চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকারকে ৭১৮ ৮৪৪ ৩৩৬০ নম্বরে ফোন করার অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিচয় প্রকাশ না করে কয়েকজন সহৃদয় বন্ধু লং আইল্যান্ড ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল পার্কে কবরের প্রয়োজনে অথবা আর্থিক সাহায্য দিতে আগ্রহী। যোগাযোগের জন্য ৭১৮ ৭৮৫ ৭৬৯২, ৬৪৬ ৯৬১ ৮৫৬৯ বা ৩৪৭ ৬০৫ ২৪৫৮ নম্বরে কল করা যাবে। প্রবাসীদের কেউ যদি অসুস্থবোধ করেন বা জরুরি কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে কমিউনিটি হেল্প লাইনের ২১৪ ৪৪৬ ৮৮৯০ নম্বরে ফোন করতে পারেন।
মুফতি ইসমাইল (আল নূর ইসলামিক সেন্টার, সানি সাইড) করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়ান। বিদেশ ফাউন্ডেশন ফুড বাস্কেট নামের প্রতিষ্ঠানটি আগামী সপ্তাহ থেকে রোজাদারদের জন্য খাদ্যসামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে। যোগাযোগের জন্য সারওয়ার আলীর (ব্রঙ্কস) ৯১৭ ৫১৮ ০৪৩২ নম্বরে কল করা যাবে। মুসলিম উম্মাহ অব আমেরিকা করোনাভাইরাসে আক্রান্তসহ অন্যান্য সেবার জন্য হটলাইন চালু করেছে। হটলাইন নম্বর ৮৭৭ ৬৮৬ ২৭৭৪।
আমেরিকায় বসবাসরত সিলেট বিভাগের অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছে জালালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা। এ বিষয়ে সংগঠনের পক্ষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন সংগঠনের কর্মকর্তা রোকন হাকিম (৯১৭ ৩৬২ ২৪৪২) ও মান্না মুনতাসির (৯২৯ ৩৩২ ৯১২৫)।
এ ছাড়া কবর ও অন্যান্য যেকোনো সাহায্য সহযোগিতার জন্য সংগঠনের সভাপতি মইনুল হক চৌধুরী হেলাল (৮৬০ ৯৩৮ ৬৭১৮), সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী (৯১৭ ৬২২ ৭৭৭৬) ও কোষাধ্যক্ষ মইনুল ইসলামের (৯১৭ ৫৩৫ ৪১৩১) সঙ্গে অথবা জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের যেকোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রেজারার ও বোর্ড মেম্বার মো. আলী বলেন, যদি কোন বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তাহলে কার্যকরী কমিটির যেকোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমাদের সোসাইটির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ৯০টি কবর দেওয়া হয়েছে।
সেই সঙ্গে যদি কেউ নিউইয়র্কের কোনো হাসপাতালে আত্মীয়স্বজনহীন থাকেন এবং সঠিক তথ্য জানেন, তা হলে বাংলাদেশ সোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ করারও আহ্বান জানান তিনি। আবদুর রহিম হাওলাদারের সঙ্গে যোগযোগ করতে পারেন ৯১৭-৩০১-২০৬৩ এই ফোন নম্বরে।