লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছেন ট্রাম্প

দীর্ঘ দিন ঘরে থাকা মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে অর্থনীতি সচল করার দাবিতে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এমন বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ দিন ঘরে থাকা মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে অর্থনীতি সচল করার দাবিতে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এমন বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রে ঘরে থাকার বিষয়টিতে মানুষ ভীষণ রকম হাঁপিয়ে উঠেছে বলতে হয়। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অর্থনীতি চালু ও লকডাউন তুলে নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। শুরুতে মিশিগান, ওহাইওসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের বিক্ষোভ শুরু হলেও এখন এমন অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা বাড়ছে।
১৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী অলিম্পিয়ায় প্রায় আড়াই হাজার লোক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঘরে থাকতে এবং ৫০ বা তার চেয়ে বেশি মানুষের জমায়েত না করতে অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর জে ইনস্লির দেওয়া নির্দেশের বিরুদ্ধেই এ গণবিক্ষোভ। যদিও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতেই গভর্নর এমন নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে আসা লোকেদের মাস্ক পরার অনুরোধ করলেও অনেকেই তা রাখেননি। বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক ৩৯ বছর বয়সী প্রকৌশলী টেইলর মিলার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় কিছু ব্যবসা খোলা রয়েছে, কিছু ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় আইনের লঙ্ঘন।’
মোদ্দা কথা তাঁরা কাজে ফিরতে চান। চান জীবন ফিরুক স্বাভাবিকতায়। এই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়া লোকেদের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই বাড়ছে। গতকাল রোববার একই রকম বিক্ষোভ হয়েছে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ডেনভারেও। দলে দলে লোকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং গাড়ি দিয়ে রাস্তাগুলো রীতিমতো অবরোধ করে ফেলে। একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে টেক্সাস, উইসকনসিন, ওহাইও, মিনেসোটা, মিশিগান ও ভার্জিনিয়ায়।
নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গোটা যুক্তরাষ্ট্র বিপর্যস্ত। এরই মধ্যে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড–১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসটির বিস্তার কমে আসার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তাই চলমান নিরাপত্তা কৌশল আরও কিছু দিন মেনে চলার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর থেকে শুরু করে নগর কর্তৃপক্ষগুলোও এমনটিই চায়।
কিন্তু মুশকিল হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের পুনর্নির্বাচন নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত। তাই মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে যেকোনো মূল্যে অর্থনীতি চালুর কথা বলছেন তিনি। এদিকে করোাভাইরাসের কারণে সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছে। এখন পর্যন্ত বেকারভাতা চেয়ে আবেদনই জমা পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কথা হিসাবে আনলে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা। এ অবস্থায় স্বয়ং প্রেসিডেন্ট যখন সব চালু করে দেওয়ার কথা বলেন প্রকাশ্যে তখন, মরিয়া মানুষেরা পথে নেমে আসবে এতে কোনো বিস্ময়ের কিছু নেই।
শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই গণবিক্ষোভগুলোর উসকানিদাতা হিসেবেও কাজ করছেন। ১৫ এপ্রিল যখন মিশিগানে লোকেরা বিক্ষোভে নামে, কাজে ফেরার লক্ষ্যে ব্যবসা–বাণিজ্য খুলে দেওয়ার দাবি জানায়, তখন ট্রাম্প এক টুইটে তাদের ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে আখ্যা দেন।
এর আগে ১৭ এপ্রিল সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজধানীতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দেয়।
মিশিগানের গভর্নর গ্রিচেন হুইটমার বলেন, ‘আমি প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করি, কিন্তু এখানে সমবেত হাজার হাজার মানুষ নিজেদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ এপ্রিল প্রথমে মিশিগানের রাজধানী ল্যান্সিংয়ে গভর্নর গ্রিচেন হুইটমারের ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে হাজারো নাগরিক বিক্ষোভ শুরু করেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্ষোভকারীরা ল্যান্সিংয়ে সমবেত হন। এই বিক্ষোভের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন গ্রিডলক’। আয়োজকেরা বিক্ষোভের জন্য একটি গাইড লাইন তৈরি করেছিলেন, এতে গাড়িতে বসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অনুরোধ জানানো হয়। তবে কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
টম হুগে নামে একজন বিক্ষোভকারী ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে কাজ করেন, পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও। তিনি বলেন, ‘বুঝতে পারছি করোনাভাইরাস ভয়ঙ্কর। এটা সামাল দেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা আর কতদিন ঘরের মধ্যে বন্দী থাকব। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চলব কীভাবে।’
গভর্নর গ্রিচেন হুইটমার ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যে ‘স্টে হোম’ আদেশের সময় বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে কেউ কোথাও ভ্রমণ করতে পারবেন না। এ ছাড়া কেউ বাইরে অযথা ঘুরতে পারবেন না এবং কারও বাসায় কোনো অতিথি আসা যাবে না।
নিক সম্বার নামের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘বিক্ষোভে আসা সবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তারপরও আমরা একে অন্যের থেকে ছয় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছি।’
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজের জারি করা ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে সেন্ট পলে গভর্নরের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে রাজ্যের নাগরিকেরা। এই রাজ্যে আগামী ৩ মে পর্যন্ত ‘স্টে হোম’ বাড়িয়েছে গভর্নর টিম ওয়ালজ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিক্ষোভকারীদের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘স্টে হোম’ আদেশের কারণে মিনেসোটায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। এ কারণে আরও অন্যান্য সমস্যাসহ সাধারণ মানুষ হতাশায় ভুগছে। তাই বাধ্য হয়ে মানুষ এই আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে।
একইভাবে গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা, ইউটাহ, ভার্জিনিয়াসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে লকডাউন, বা স্টে–হোম আদেশ অমান্য করে বিক্ষোভ হয়েছে। তাদের সবার দাবি, অবরোধ তুলে দিয়ে সব ব্যবসা–বাণিজ্য খুলে দিতে হবে।
এ অবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্তৃপক্ষ একটি মধ্যবর্তী সমাধানের পথ খুঁজছে। নিউইয়র্কেই যেমন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো করোনাভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে করোনারোধী অ্যান্টিবডি শনাক্তের পরীক্ষার সংখ্যাও বাড়াতে চান। লক্ষ্য, এরই মধ্যে যেসব ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তাদের শনাক্ত করা। আর এটি সম্ভব হলে অর্থনীতির কিছু অংশ খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। একই পথে হাঁটতে চান মেরিল্যান্ডের রিপাবলিকান গভর্নর ল্যারি হোগান। তবে এ ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যাপ্ত পরীক্ষার যে দাবি করেছেন, তা ভুৃয়া।’ একই কথা বলেছেন ভার্জিনিয়ার ডমোক্রেটিক গভর্নর রালফ নর্টহ্যাম।
মেরিল্যান্ড, ওয়াশিংটন ডিসি ও ভার্জিনিয়ায় গত কয়েক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বোস্টন ও শিকাগোর অবস্থাও খারাপের দিকে যাচ্ছে। অথ্যাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটির সংক্রমণ এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েছে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। এ অবস্থায় এভাবে লকডাউনসহ অঙ্গরাজ্য সরকারের নানা নির্দেশ অমান্যে সাধারণ মানুষ যেভাবে বিক্ষোভ করছে, তাতে সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সবাইকে নতুন করে বিস্মিত করছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক গভর্নরের নেতৃত্বে থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোয় এ ধরনের বিক্ষোভে তিনি সরাসরি উসকানি দিচ্ছেন। মিশিগানসহ এ ধরনের অঙ্গরাজ্যে হওয়া বিক্ষোভের পক্ষে তিনি ‘লিবার্টি’র মতো শব্দ ব্যবহার করছেন টুইটারে। প্রেসিডেন্টের এমন আচরণে বিরক্ত এখন তাঁর দলেরই গভর্নররা।