বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল রাস্তা। পানিতে একাকার হয়ে যায় রাস্তা ও এর দুই পাশে থাকা আবর্জনার ডোবা। পানি পুরোপুরি না নামায় ডোবার ময়লা-আবর্জনা মিশে বন্যার পানি দূষিত হতে শুরু করে। দূষিত পানি মাড়িয়েই কাজে বেরোতে হচ্ছিল স্থানীয় ব্যক্তিদের। তবে এতে বয়স্কদের কারও কারও পায়ে ঘা হতে শুরু করে। তাই স্থানীয় লোকজন নিজেরাই পারাপারের জন্য বানিয়ে নিয়েছেন একটি ভেলা।
ডাক্তারবাড়ি এলাকায় ১৬টি পরিবার রয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক মানুষের বসবাস। অনেকেই পানির কারণে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। আর যাঁদের বেরোতে হচ্ছে, তাঁদের কারও কারও দূষিত পানির কারণে পায়ের আঙুলে কিংবা পাতায় ঘা হচ্ছে।
এই ভেলা বানানো হয়েছে রাবারের টিউবে বাতাস ভরে। তাতে বাঁধা হয়েছে কাঠের তক্তা। আর ভেলাটিকে দুই পাশে টেনে নেওয়ার জন্য শক্ত রশি দিয়ে দুই অংশে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। টিউব আর তক্তায় তৈরি এমন ভেলায় লোকজনকে পারাপার করতে দেখা গেছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বদিকোনা গ্রাম এলাকায়। আজ রোববার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গ্রামটির ডাক্তারবাড়ি অংশে স্থানীয় বাসিন্দাদের এভাবে পারাপার হতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গৃহিণী রাজিয়া বেগম। আজ দুপুরে তিনি ওই ভেলায় করে নিজের ঘর থেকে রাস্তায় আসছিলেন। তাঁকে এলাকার এক কিশোর পারাপারে সহায়তা করছিল। তিনি রাস্তার কিনারে পৌঁছে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনতা করার নাই, ডাক্তরোর টাইন যাওয়া লাগব। ঘর তনে থুরা পানি নামলেও রাস্তাত এবো কোমরহিমা পানি।’
রিজিয়া বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় গত শুক্রবার তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে কিছু পরীক্ষা করাতে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে পারেননি। আজ সেটাই দিতে যাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডাক্তারবাড়ি এলাকায় ১৬টি পরিবার রয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক মানুষের বসবাস। অনেকেই পানির কারণে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। আর যাঁদের বেরোতে হচ্ছে, তাঁদের কারও কারও দূষিত পানির কারণে পায়ের আঙুলে কিংবা পাতায় ঘা হচ্ছে।
তারিকুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা ওই ভেলায় চড়ে পারাপারের জন্য রাস্তার এক পাশে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, দূষিত পানি মাড়িয়ে যাঁদের নিয়মিত ওই অংশ দিয়ে চলতে হয়, তাঁদের কয়েকজনের পায়ে ঘা হয়েছে। সাদেক মিয়া (৪০), ফারুক মিয়া (৬০) ও তোফাজ্জল মিয়া (৫০) এমনই কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে ফারুক মিয়ার ডায়াবেটিসের সমস্যা রয়েছে। তাই ঘা নিয়ে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে ভেলাটির ব্যবস্থা করেছেন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ওই এলাকায় বন্যার পানি ওঠে ১৭ জুন (শুক্রবার) থেকে। গত কয়েক দিনে সিলেটের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু দক্ষিণ সুরমা এলাকায় পানি খুব ধীরগতিতে কমছে বলে জানান বাসিন্দারা।
ডাক্তারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি শাহীদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ দিন তনে ওলা হালত। ফয়লা বুকহিমা পানি আছিল। ওখনো কোমরহিমা পানি রইছে। দিন যার, পানি কমের না।’
পানি পারাপারে ভেলাটি টেনে নারী ও বয়স্কদের সহায়তা করছিল মাহাদি হাসান নামের এক কিশোর। সে স্থানীয় প্রগতি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার পায়ের দুই আঙুলের মাঝের স্থানেও সাদা হয়ে ঘায়ের সৃষ্টি হয়েছে। সে জানায়, বন্যায় তার স্কুলেও পানি উঠেছে। অনেক মানুষ সেখানে আশ্রয়ও নিয়েছেন। স্কুল বন্ধ থাকায় সে বন্ধুদের নিয়ে এই কাজ করছে।