
রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও মশা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দল, সরকারি সংস্থা ও নগরবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে এ কথা বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ এই নগর সংলাপের আয়োজন করে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত, আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় শহর এবং মশার নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘জনগণ যদি ৫০ শতাংশ এবং সরকার বা সিটি করপোরেশন যদি বাকি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে শতভাগ সফলতা অর্জন অসম্ভব নয়।’
সংলাপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ঢাকার মোট মশার প্রায় ৯৯ শতাংশই জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশার জন্ম হয়।
এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘আমরা যদি জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে পারি, তাহলে মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।’ জলাবদ্ধতা ও মশার সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মশকনিধনের জন্য কীটনাশক কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলেও মনে করেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মশার জন্য শহরকে অনুকূল পরিবেশ হিসেবে রেখে দিই, তাহলে তারা বংশবিস্তার করবেই। তাই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকা শহরে বৃষ্টির পানি যতটুকু আসে, এটি স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু পানি যাওয়ার জন্য আগে সঠিক ব্যবস্থা ছিল, বিশেষ করে খালগুলো যথাযথ ছিল। ফলে বৃষ্টির পানি খাল হয়ে নদীতে চলে যেত। এ ছাড়া ঢাকা শহরে তিন শতাধিক পুকুর ছিল, যেগুলোয় এই বৃষ্টির পানি চলে যেত। তখন এই জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না। বর্তমানে ১০ মিনিটের বৃষ্টি হলে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলী আফজাল বলেন, ৫৪ বছর আগে ঢাকা শহরে প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল ও লেক ছিল। এখন কতটি আছে, তা সবাই জানেন। একক কোনো সংস্থার পক্ষে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, সারা বছরই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক কখনো বিদ্যুৎ, কখনো গ্যাস, আবার কখনো পানির লাইনের জন্য খোঁড়া হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি নাগরিকের ভোগান্তি হচ্ছে। অথচ সমন্বয় করে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে এমনটি হতো না।
জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান মো. নূরুল্লাহ। তাঁর প্রস্তাবনায় বলা হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের জনবল কাঠামো অনুমোদন করে কার্যক্রম চালু করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে সিটি করপোরেশনে যুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান ‘স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান’ অনুসরণ, সমন্বিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং ওয়ার্ড ও ব্লকভিত্তিক নাগরিক কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।
সংলাপে রাজধানীতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও যত্রতত্র হকার বসার বিষয়টিও আসে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও হকারের সংখ্যা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, এখন থেকে রাজধানীতে কোনো হকার বা রিকশা নিবন্ধনের বাইরে থাকতে পারবে না। কোথায় কতজন হকার বসতে পারবেন, তারও সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন, স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন প্রমুখ।