আলো ঝলমলে নগরের পাশে জৌলুশহীন ভিন্ন এক নগর

বাসিন্দাদের মনে জৌলুশ নেই, নেই ঝলমলে জীবন। দরিদ্র জীবনে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রাম। সম্প্রতি বরিশাল সদর উপজেলার চর কাউয়া ইউনিয়নের হিরন নগরে
ছবি: প্রথম আলো

ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। আকাশে কালো মেঘ। জোয়ারের পানিতে টইটম্বুর কীর্তনখোলা নদী। প্রবল স্রোত আর ঢেউয়ের তোড়ে নদী পার হতে ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোকে বেশ বেগ পেতে হয়। শুক্রবার বিকেলে বরিশাল নগর থেকে কীর্তনখোলা পার হয়ে চর কাউয়ায় পৌঁছে দক্ষিণ দিকে এগোতেই চোখে পড়ে সারি সারি অনেকগুলো ঘর।

কাঠ-বাঁশের অবকাঠামোর ওপর নির্মিত ভাঙাচোরা টিনের ছাউনির ছোট ছোট ঘর। সেখানে প্রায় সাড়ে ৩০০ পরিবারের বসবাস। এ যেন আলো ঝলমলে নগরের পাশে ভিন্ন আরেক নগর। বাসিন্দাদের মনে জৌলুশ নেই, নেই ঝলমলে জীবন। দরিদ্র জীবনে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রাম। এখানে সুউচ্চ তো দূরে থাক, পাকা-আধা পাকা ইমারতও নেই। ঘরগুলো বাসিন্দাদের মতোই কঙ্কালসার। এলাকাটির নাম হিরন নগর।

গরিব মাইনষের আবার রান্ধন-বাড়ন থাহে। হারাদিনে খাইট্টা ১৫০ টাহা পাই। এইয়্যা দিয়া ক্যামনে চলি বোঝেনই তো। জীবনে এত কষ্ট অ্যার চাইতে মরণও ভালো।
বাবুল মিয়া (৫৩), চর কাউয়ার বাসিন্দা

ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, খরা, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিরন নগরের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাঁদের জীবন-জীবিকার সক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। খাবার, বাসস্থান, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের সংকটও প্রকট।

সম্প্রতি এক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রার দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বরিশালের গ্রাম ও বস্তি এলাকার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ নিয়মিত তিন বেলার খাবার জোগাড় করতে পারেন না। একই সঙ্গে ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত করতে অক্ষম এবং ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের আয়বর্ধনমূলক কোনো প্রশিক্ষণ নেই। সদর উপজেলার দুটি গ্রাম ও সিটি করপোরেশনের একটি বস্তির প্রায় ছয় হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (সিডিপি) নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ওই চার এলাকার মধ্যে একটি হিরন নগর।

সুউচ্চ তো দূরে থাক, পাকা-আধা পাকা ইমারতও নেই হিরন নগরে। ঘরগুলো বাসিন্দাদের মতোই কঙ্কালসার। সম্প্রতি বরিশাল সদর উপজেলার চর কাউয়া ইউনিয়নে র্কীতনখোলা নদী তীরে হিরন নগরে

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, শিক্ষার দিক থেকে এসব এলাকার বাসিন্দারা যথেষ্ট পিছিয়ে। ১৭ দশমিক ১ শতাংশ বাসিন্দা নিরক্ষর। স্বাক্ষর করতে পারেন ১৯ দশমিক ৪ ভাগ। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ খানাপ্রধানের পেশা দিনমজুরি। তাঁদের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভূমিহীন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাঁরা যথেষ্ট বিপদাপন্ন। ভবিষ্যতে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ খানার যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত, ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ খানার স্বাস্থ্যহানি, ৯২ শতাংশ খানার নিরাপদ পানিপ্রাপ্তি ও ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ খানার জীবিকার উৎস হারানোর আশঙ্কা করা হয় গবেষণার ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে।

২০১২ সালে নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটার খাল বস্তির বাসিন্দাদের সদর উপজেলার চর কাউয়ায় পুনর্বাসন করা হয়। সেখানে হিরন নগর নামের একটি কলোনি তৈরি করেছিলেন প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন ওরফে হিরন। সেখানে ৩৫০ পরিবারে দেড় হাজার মানুষের বসবাস। সবাই দিন আনে দিনে খায়।

এহন ভাত খাওনেই কষ্ট। কবে যে একটু মাছ-গোশত খাইছি, মনেও নাই।
চর কাউয়ার বাসিন্দা ইমা বেগম (৪২)

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন বাবুল মিয়া (৫৩) ও ইমা বেগম (৪২) দম্পতি। ভাঙাচোরা টিনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। ঘরদোর কাদাপানিতে একাকার। রান্নার চুলাটাও রক্ষা পাচ্ছে না। চালের ওপর পুরোনো একটি ত্রিপল বিছিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। বছর সাতেক আগে আঘাত পেয়ে বাবুলের বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নেন চর কাউয়ায়। চরে অভ্যন্তরীণ রুটে চলা পরিবহনের যাত্রী ডাকার কাজ করেন তিনি। বিনিময়ে দৈনিক দেড় শ টাকা পান। তাই দিয়েই খেয়ে না খেয়ে দিন চলে। তবে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি বিপাকে ফেলেছে তাঁকে।

বাবুলের পৈতৃক বাড়ি ছিল পাশেরই তালুকদার হাট এলাকায়। চার-পাঁচবারের ভাঙনে বিলীন হয়েছে কীর্তনখোলায়। শেষমেশ বাবুলের আশ্রয় হিরন নগরের বস্তি। আশ্রয় জুটলেও ঘর করতে পারেননি। ভাঙাচোরা খুপরিতে উঠতেই দেখা গেল, কাদাপানিতে মেঝে একাকার। চৌকির ওপর অগোছালো কাঁথা-বালিশ। রান্না হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতেই বাবুল হেসে বলেন, ‘গরিব মাইনষের আবার রান্ধন-বাড়ন থাহে। হারাদিনে খাইট্টা ১৫০ টাহা পাই। এইয়্যা দিয়া ক্যামনে চলি বোঝেনই তো। জীবনে এত কষ্ট অ্যার চাইতে মরণও ভালো।’ স্বামীর কথা শুনে ইমা বেগম বললেন, ‘এহন ভাত খাওনেই কষ্ট। কবে যে একটু মাছ-গোশত খাইছি, মনেও নাই।’

এমন অসহায়ত্ব বাবুলের একার নয়। বস্তির সবারই আকুতি একই রকম। সর্বত্রই দারিদ্র্যের মলিন চেহারা। বাবুলের ঘরের কাছেই ছাপরাঘরে থাকেন হারুন মিয়া ও দুলু বেগম। আগে থাকতেন ভাটার খাল বস্তিতে। উচ্ছেদের পর হিরন নগরে আশ্রয় হয়। সন্তানসহ তাঁদের তিনজনের সংসার। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আগে শসা কেটে ফেরি করে বিক্রি করতেন হারুন। দৈনিক ৪০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু করোনাকালে সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বেকার। ভারী কাজও করতে পারেন না। স্ত্রীর আয়েই চলে সংসার। বরিশাল নগরের একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে পাঁচ হাজার টাকা পান। সংসার কেমন চলে প্রশ্ন শুনে হারুন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘না চইল্লা উপায় কী? এক বেলা মাছ-গোশত খাইছি কবে, মনে নাই।’ তাঁর চোখমুখ যেন খেদ আর আক্ষেপে ঝলসে ওঠে।

বস্তির বাসিন্দা বিলকিস বেগম, শাহানাজ, আবদুল হাকিমসহ অনেকের মানবেতর জীবনের কষ্টগাথা শুনতে শুনতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। গোধূলির ছায়া, আষাঢ়ের কালো মেঘ ও বাসিন্দাদের দুঃখগাথা মিলেমিশে যেন গাঢ় আঁধার নামায় প্রকৃতিতে।