গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার গলান গ্রামের আমারুলপাড়ায় প্রাচীন হিজলগাছ
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার গলান গ্রামের আমারুলপাড়ায় প্রাচীন হিজলগাছ

মহিরুহ হিজলগুলো

ঢাকার অদূরে পূর্বাচল। যেখানে ভবিষ্যৎ আবাসনের জন্য বলি হয়েছিল বিপুল প্রাণসম্পদ। সেই বিরান ভূমিরেখা ছাড়িয়ে উত্তর প্রান্তে পৌঁছালে একেবারেই আলাদা এক দৃশ্যপট ভেসে উঠবে। আবাসন এলাকার প্রান্ত ছুঁয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে আছে মনোমুগ্ধকর এক জলাভূমি। তার ভেতর ছোপ ছোপ সবুজ গ্রামগুলো যেন অলৌকিক সাম্পানের মতো ভেসে আছে। অবশ্য এই দৃশ্য কেবল বর্ষা থেকে হেমন্তকাল পর্যন্ত চোখে পড়বে। এ সময় জলমগ্ন গ্রামগুলো একেবারেই আলাদা এক সৌন্দর্য-ভুবন তৈরি করে রাখে। তারপর শুকনা মৌসুমে আবার ভিন্ন এক রূপ।

ঋতুর পালাবদলে বদলে যাওয়া সেখানকার এমনই এক গ্রামের নাম গলান, ইউনিয়ন নাগরী। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার এই নিভৃত গ্রাম দিনের আলোয়ও যেন ঘুমিয়ে থাকা শান্ত এক জনপদ। কিন্তু ছায়াঢাকা আর মায়াঘেরা এই নিঝুম গ্রামগুলোর উদ্ভিদ-ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বেশ কিছু স্মারকবৃক্ষ কালের সাক্ষী হয়ে এখনো বেঁচে আছে। এই মায়াবী গ্রামগুলোর গল্প শুনিয়েছিলেন প্রিয়ভাজন উদ্ভিদপ্রেমী যায়েদ আমীন। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর ভিন্ন মাত্রার বোঝাপড়া। কীভাবে যেন বিশেষ উদ্ভিদগুলোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে! গ্রামের সব স্তুতির সঙ্গে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন মহিরুহ হিজলগুলোর কথাও।

একদিন সত্যি সত্যিই এই মহামান্য হিজলদের স্পর্শ পেতে পৌঁছে গেলাম সেখানে। গ্রামের সরু পথ ধরে যেতে যেতে বেশ কিছু পুরোনো উদ্ভিদের দেখা পেলাম। বিশেষত ফলের গাছ, এমন পরিণত গাছ খুব একটা দেখা যায় না। প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত কাগজিলেবুগাছের এতটা বৃহৎ পরিসর আগে কখনো দেখিনি। ছায়াঘন এসব পথ ধীরে ধীরে আমাদের পৌঁছে দিল মূল গন্তব্য গলান গ্রামের আমারুলপাড়ায়। পাড়ার উত্তর ও পশ্চিম প্রান্তজুড়ে গাছগুলোর অবস্থান। নির্জন দুপুরে রূপসী হিজলগুলো স্বাগত জানাল আমাদের। এ যেন এক আবেগঘন সাক্ষাৎ! বারবার ছুঁয়ে দেখেছি প্রতিটি গাছ। ছবি তুলেছি রাশি রাশি! মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করে থাকা এই গাছগুলো যে একটি প্রজন্মের সর্বশেষ প্রতিনিধি। আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে থাকা গাছগুলো নিঃশেষিত হয়ে এখন কেবল কয়েকটি টিকে আছে। বছরের পর বছর ধরে ওরাই তো তুমুল ঢেউয়ের বিপরীতে বুক পেতে বাঁচিয়েছিল গ্রামগুলোকে। যায়েদ আমীনের পর্যবেক্ষণ যথার্থ। সত্যি, এমন বিশাল কাণ্ডের হিজলগাছ আগে কখনো দেখিনি। টাঙ্গুয়ার হাওরের দুর্গম রংচি ইউনিয়নে যে হিজলবন দেখেছি, তার বয়স ৭০-৮০ বছরের বেশি নয়। ধারণা করি, এখানকার গাছগুলোর বয়স ১০০ বছরের বেশি হতে পারে। তবে ছবি দেখে বয়স নির্ণয় করা অনেকটাই কঠিন। কিন্তু গাছগুলো দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়েছি, আবার বিষণ্নও হয়েছি ততটাই। কারণ, আমারুলপাড়ার স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী হোসেন জানান, একসময় গ্রামগুলোর প্রান্তজুড়ে এমন সহস্রাধিক হিজলগাছ ছিল। এসব গাছ মূলত বর্ষায় গ্রামগুলোকে সুরক্ষিত রাখত। কালক্রমে গাছগুলো বিলীন হয়েছে। তাঁর মালিকানায় থাকা এই গাছগুলোই-বা আর কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। পূর্বাচলের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে জায়গার দাম ঊর্ধ্বমুখী। মালিকানা বদলে গাছগুলো কার কাছে যাবে, তিনি সেগুলো রক্ষা করবেন কি না, তা অনিশ্চিত।

ইচ্ছা করলেই এমন একটি গাছ তৈরি করা যায় না। এসব গাছ আমাদের প্রাণসম্পদকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও অনন্য ভূমিকা পালন করে। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ঐতিহ্য-উদ্ভিদ রক্ষায় এগিয়ে আসেন, তাহলে গাছগুলো রক্ষা পেতে পারে। এমনকি সম্মিলিত চেষ্টায়ও তা হতে পারে। বিপন্ন এই হিজলগাছগুলো রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।