
দেশের করব্যবস্থা পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে।
আজ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় এ কথা বলেন বক্তারা। আলোচনার বিষয় ছিল ‘পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরশীলতা ও অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব’। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমএমসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
মূল প্রবন্ধে স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, পরোক্ষ করের পুরো চাপ জনগণের ওপর গিয়ে পড়ে। একজন রিকশাচালক ও একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী একই হারে পরোক্ষ কর দেন। দিনে দিনে এই করের পরিমাণ বাড়ছে এবং বর্তমানে তা প্রায় ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, বর্তমানে উৎসে কর (টিডিএস) এমনভাবে আরোপ করা হচ্ছে যে কোম্পানিগুলো পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই চাপ সমন্বয় করছে। টিডিএসের চাপ বেশি হলে সেবা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে অর্থ না এনে বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে হিসাব খুলে অর্থ রাখবে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, পুরোনো আইনের যেসব সমস্যা ছিল, নতুন আইনেও তা রয়ে গেছে। কার্যত নতুন ও পুরোনো আইনের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। এ জন্য যৌক্তিক মূসক হার নির্ধারণ এবং ধাপে ধাপে উৎসে কর প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে টিডিএস নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার কথাও বলেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাস্তবে দেশে পরোক্ষ করের পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। করনীতি হওয়া উচিত বৈষম্য কমানোর হাতিয়ার, যেখানে বাজার মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে থাকবে না, কিন্তু বাংলাদেশে তা হচ্ছে না।
সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে মাসরুর রিয়াজ বলেন, এখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সময় নয়। যদিও বেসরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তুলনা করলে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে, সরকার এখন অর্থসংকটে আছে। তাই প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় করতে হবে, কোনোভাবেই পরোক্ষ কর বাড়ানো যাবে না।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের সাবেক হেড অব ট্যাক্স সাইদ আহমেদ খান বলেন, করব্যবস্থায় সংস্কার করতেই হবে। তবে এ পর্যন্ত যেসব সংস্কার হয়েছে, তা ভোক্তা পর্যায়ে তেমন সুফল আনতে পারেনি।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার মালা গোলটেবিলে অংশ নেন। তিনি বলেন, রাজস্ব–ঘাটতির কারণে নানা খাত থেকে কর আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আদায়ের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য পোর্টাল থাকলেও তা কার্যকর নয়।
দৌলত আক্তার আরও বলেন, ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কর আধুনিকায়ন করা হলেও তা কার্যত শুধু রিটার্ন জমা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এত ছোট কাজের জন্য এত টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, দেশে ব্যবসা করা একধরনের শাস্তি, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারও চাটুকারদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে।
ইমরান হাসান আরও বলেন, দেশের পোশাক খাতের সংকটও দীর্ঘদিন ধরে কাটছে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (ভ্যাট) মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন বলেন, ভ্যাটের একাধিক হার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করব্যবস্থা নিয়ে দুটি প্রতিবেদন করা হয়েছে, যেখানে সমস্যা ও সমাধানের পথ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো অনুসরণ করলেই করব্যবস্থার বড় অংশের সমস্যা দূর করা সম্ভব।
মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন আরও বলেন, গত সরকারের সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এসব প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করা হলেও কেউ আগ্রহ দেখাননি। অথচ সেখানে সমস্যার সমাধানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী ও দৈনিক ওয়াদার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ।
আলোচকেরা বলেন, পরোক্ষ করের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁরা করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল করব্যবস্থা চালু ও নীতিগত সংস্কারে গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাসরুর।