জার্মানি ১৯৭৪

ডাচদের টোটাল ফুটবল এবং জার্মান-যন্ত্রের জয়

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিলের তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের পর জুলে রিমে ট্রফিটা স্থায়ীভাবে চলে যায় তাদের শোকেসে। ফিফা তাই এক নতুন ট্রফির নকশা প্রতিযোগিতার ডাক দেয়। ৫৩টি নকশার মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হলো ইতালিয়ান ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার তৈরি এক মাস্টারপিস—আজও আমরা যে বিশ্বকাপ ট্রফিটি দেখি। ১৮ ক্যারেটের খাঁটি সোনা আর সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের বেজমেন্টে গড়া পাঁচ কেজি ওজনের ৩৬ সেন্টিমিটারের এই ট্রফি তৈরি করতে ফিফার খরচ হয়েছিল ২০ হাজার ডলার। তবে জুলে রিমের মতো একে আর কেউ স্থায়ীভাবে নিজের করে নিতে পারবে না। চ্যাম্পিয়ন দেশ পায় কেবল একটি রেপ্লিকা। সেই নতুন ট্রফি উঁচিয়ে ধরার নতুন লড়াইয়ে সেবার বিশ্বকে মোহিত করেছিল ডাচদের এক মায়াবী ফুটবল-দর্শন, যার নাম ‘টোটাল ফুটবল’।

আবার নতুন নিয়ম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভক্ত জার্মানির পশ্চিমাংশ, অর্থাৎ পশ্চিম জার্মানি সেবার আয়োজন করেছিল দশম বিশ্বকাপের। এই টুর্নামেন্টে ফিফা এক জটিল ফরম্যাট নিয়ে আসে। ১৬টি দলকে ৪টি গ্রুপে ভাগ করে শুরু হয় প্রথম রাউন্ড। প্রতি গ্রুপ থেকে দুটি করে দল কোয়ালিফাই করে দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে আবার চার দলের দুটি গ্রুপ বানিয়ে চলে সেমিফাইনাল পর্ব। এই পর্বের ‘অল এগেইনস্ট অল’ লড়াই শেষে দুই গ্রুপের শীর্ষ দুই দল যায় ফাইনালে, আর দ্বিতীয় হওয়া দল দুটি খেলে তৃতীয় স্থানের জন্য।

টোটাল ফুটবলের মোহিনী জাদু

গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ডাচরা, আর ডাচদের চমকে দিয়েছিল জার্মানি।

নেদারল্যান্ডসের সেই অদ্ভুত সুন্দর খেলার নাম সংবাদমাধ্যম দিয়েছিল ‘টোটাল ফুটবল’। খেলোয়াড়দের পজিশন বদলের অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা আর মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানোর এই কৌশলের অন্যতম মস্তিষ্ক ছিলেন একজন—ইয়োহান ক্রুইফ। আমস্টারডামের আয়াক্স আর স্পেনের বার্সেলোনায় একের পর এক ট্রফি জেতা সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার গোল করতে আর করাতে ছিলেন ক্লান্তিহীন। ক্রুইফের জাদুতে ডাচরা ফাইনালে উঠেছিল অপরাজিত থেকে, প্রতিপক্ষকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। এমনকি ফাইনালের আগে কোনো প্রতিপক্ষ তাদের জালে বলও জড়াতে পারেনি, একমাত্র গোলটি খেয়েছিল নিজেদের ডিফেন্ডার রুড ক্রোলের ভুলে, আত্মঘাতী।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের হাতে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ট্রফি।

কিন্তু ১৯৫৪ বিশ্বকাপের পুসকাসের হাঙ্গেরির মতো, এবারও রূপকথা অধরাই রয়ে গেল। ফাইনালে ডাচদের সেই শৈল্পিক কমলা স্রোতকে থামিয়ে দিল পশ্চিম জার্মানির ইস্পাতকঠিন মানসিকতা ও জেদ। টুর্নামেন্টের সেরা দল না হয়েও ট্রফি উঁচিয়ে ধরল জার্মানরা।

জার্মানি বনাম জার্মানি

২২ জুন হামবুর্গে মুখোমুখি হলো পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানি। ১৯৫৪ সালের বাছাইপর্বে পশ্চিম জার্মানি একবার ‘সার’ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত তৃতীয় জার্মানি) দলের মুখোমুখি হয়েছিল। এবার লড়তে হলো কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ইয়ুর্গেন স্পারওয়াসারের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়েছিল পূর্ব জার্মানি।

টিকিটের সঙ্গে জীবনবিমা

এই বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্যের সঙ্গেই দর্শকদের জন্য বিমার টাকা অন্তর্ভুক্ত করা ছিল। সুরক্ষার এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ঘটে যাওয়া এক ট্র্যাজেডির কারণে। ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামের এক ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে সেখানে ইসরায়েলের ১১ জন অ্যাথলেট খুন হয়েছিলেন। সেই আতঙ্ক থেকেই এই ব্যবস্থা।

খেলার নামে প্রহসন

১৯৭৩ সালের ২১ নভেম্বর চিলির সান্তিয়াগো জাতীয় স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক হাস্যকর ঘটনা ঘটে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচটিতে চিলি খেলতে নেমেছিল এমন এক দলের বিপক্ষে, যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না মাঠে! সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্লে-অফ খেলার কথা ছিল তাদের। মস্কোর প্রথম ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। কিন্তু ফিরতি ম্যাচের আগে চিলির সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন ফ্যাসিস্ট জেনারেল আগুস্ত পিনোশে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাই সেখানে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবি করে। ফিফা ভেন্যু পরিবর্তন না করায় সোভিয়েত দল চিলিতে যায়নি। ম্যাচের দিন রেফারি চিলিকে জয়ী ঘোষণা করলেও মাঠে এক অদ্ভুত প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। চিলির ১১ জন খেলোয়াড় মাঠে নেমে ফাঁকা জালে গোল করেন, আর গ্যালারির ১৫ হাজার দর্শক সেই গোল দেখে উল্লাসে ফেটে পড়েন!

ক্রুইফের হুমকি

কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ

ইয়োহান ক্রুইফ নেদারল্যান্ডস ফুটবল ফেডারেশনকে হুমকি দিয়েছিলেন, অফিশিয়াল কমলা জার্সি পরে তিনি বিশ্বকাপে খেলবেন না! তখন ক্রীড়াসামগ্রী তৈরির দুই বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পুমা আর অ্যাডিডাস বিশ্ব ফুটবলকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছিল। ডাচ দলের স্পন্সর ছিল অ্যাডিডাস। অন্যদিকে পুমা ক্রুইফকে বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বানিয়েছিল। তারা চায়নি তাদের সেরা তারকা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডিডাসের লোগো বুকে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নামুক। ক্রুইফ এক অভিনব সমাধান বের করলেন। ডাচ দল অ্যাডিডাসের জার্সিই পরল, কিন্তু ক্রুইফের জার্সির হাতায় অ্যাডিডাসের চিরাচরিত তিনটি স্ট্রাইপের বদলে থাকল কেবল দুটি স্ট্রাইপ, আর বুকে কোনো লোগো ছিল না!

প্রথম লাল কার্ড

পশ্চিম জার্মানি ও চিলির ম্যাচে চিলির কার্লোস ক্যাসজেলিকে লাল কার্ড দেখিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান তুর্কি রেফারি দোগান বাবাকান। ১৯৭০ বিশ্বকাপে কার্ডের নিয়ম চালু হলেও সেবার কেউ লাল কার্ড দেখেননি।

আফ্রিকান জাদুবিদ্যা

জায়ারের (বর্তমান ডি আর কঙ্গো) ফুটবলারদের সাহায্য করতে জার্মানি গিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন আফ্রিকান ওঝা। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ায় ব্রাজিলের বিপক্ষে অলৌকিক শক্তির সাহায্য চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু জায়ারের যুগোস্লাভিয়ান কোচ ব্লাগোইয়ে ভিদিনিচ তাঁদের হোটেলে ঢুকতে দেননি। ওঝারা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কোচ নিজের দেশকে জেতাতেই তাদের বাধা দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ওঝাদের তন্ত্রমন্ত্র ছাড়াই খেলতে হলো জায়ারকে। যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডস দল।

অতি-আত্মবিশ্বাসের খেসারত

কমলা বাহিনীর ওপর ডাচ সরকারের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বড়সড় আর্থিক লোকসান ডেকে এনেছিল। ফাইনালের কয়েক দিন আগেই নেদারল্যান্ডস ডাক বিভাগ ‘নেদারল্যান্ডস বিশ্ব ফুটবল চ্যাম্পিয়ন’ লেখা ১ লাখ স্মারক ডাকটিকিট ছাপিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পরদিন ডাক বিভাগকে সেই সব টিকিট পুড়িয়ে নষ্ট করতে হয়।

আগে স্ত্রীর সম্মান

বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে গার্ড মুলার (ডানে)।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির জয়সূচক গোলটি করেছিলেন গার্ড মুলার। কিন্তু ট্রফি জয়ের সেই আনন্দের রাতেই জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন এই স্ট্রাইকার। কারণটা ছিল অদ্ভুত। ফেডারেশনের কর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অফিশিয়াল গালা ডিনারে ফুটবলারদের স্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে না। হোটেলে যখন ফুটবলাররা খাচ্ছিলেন, তাঁদের স্ত্রীরা তখন ভবনের অন্য অংশে অপেক্ষা করছিলেন। এই অপমানের প্রতিবাদে গার্ড মুলার আর কখনোই জার্মানির সাদা জার্সি গায়ে জড়াননি।

তবে মুলারের স্ত্রী নাকি এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি হয়েছিলেন।