প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ক্লোন করা প্রাণীর নতুন ক্লোন করা কি সম্ভব

একটি ফটোকপি মেশিন থেকে কোনো ছবির কপি বের করলে তার মান কিছুটা কমে যায়। সেই কপি থেকে আবার কপি করলে মান আরও খারাপ হয়। কোনো প্রাণীর ক্লোন বা হুবহু প্রতিরূপ তৈরির প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও কি এমনটা ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে টানা ২০ বছর গবেষণা করেছেন জাপানের একদল বিজ্ঞানী। তাঁরা একটি ইঁদুরের ১ হাজার ২০০ বার ক্লোন তৈরি করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লোনের পর ক্লোন তৈরির এই ধারা একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের পর আর কার্যকর থাকে না।

জাপানের ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লোনিং বিজ্ঞানী তেরুহিকো ওয়াকায়ামা ২০০৫ সালে একটি নারী ইঁদুরের ক্লোন তৈরি করেন। প্রথম ক্লোনটি দেখতে ও জিনগতভাবে হুবহু মূল ইঁদুরের মতোই হয়েছিল। এরপর ওয়াকায়ামা এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্লোন করা ইঁদুরটি থেকে আবার ক্লোন তৈরি করেন। সেই ক্লোন থেকে তৈরি করেন আরও একটি ক্লোন। এভাবে ক্লোনের পর ক্লোন তৈরির তাত্ত্বিক ধারা শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইঁদুরটির ১ হাজার ২০০ বারের বেশি ক্লোন তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনসে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

গত ২০ বছরে ওয়াকায়ামা ও তাঁর দল ১ হাজার ২০০টি ইঁদুরের সফল ক্লোন তৈরি করতে পেরেছেন। ইঁদুরের ক্লোন তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার নামের একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে একটি দাতা কোষ থেকে নিউক্লিয়াস বের করে নেওয়া হয়। এরপর তা নিউক্লিয়াসবিহীন একটি ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করে ক্লোন ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এভাবে তাঁরা ইঁদুরের মোট ৫৮টি প্রজন্ম তৈরি করতে সক্ষম হন।

শুরুতে বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছিল, প্রতি প্রজন্মে ক্লোনিংয়ের সাফল্যের হার বাড়ছে। প্রথম দিকে এই সাফল্যের হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। কিন্তু ২৬তম প্রজন্মে গিয়ে তা বেড়ে ১৫.৫ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২৭তম প্রজন্ম থেকে সাফল্যের হার দ্রুত কমতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ৫৭ এবং ৫৮তম প্রজন্মে এসে এই সাফল্যের হার ০.৬ শতাংশে নেমে যায়। সাফল্যের হার হঠাৎ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রজন্মের ইঁদুরের জিনোম সিকোয়েন্স বা জিনগত নকশা পরীক্ষা করেন। সেখানে দেখা যায়, প্রতিবার নতুন ক্লোন করার সময় ইঁদুরের শরীরে ক্ষতিকারক জিনগত মিউটেশন বা জিনের পরিবর্তন জমা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, ক্লোন করা প্রাণী মিউটেশন থেকে মুক্ত থাকে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২৭তম প্রজন্মে গিয়ে মিউটেশনের পরিমাণ একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পর থেকেই ক্লোন তৈরির হার কমতে থাকে।

গবেষণার তথ্যমতে, স্তন্যপায়ী প্রাণী ক্লোন করার সময় বিজ্ঞানীরা আসলে মূল প্রাণীর একদম নিখুঁত কপি তৈরি করতে পারেন না। বিষয়টি স্বীকার করে বিজ্ঞানী ওয়াকায়ামা বলেন, ‘আমরা সত্যিই অবাক হয়েছি। আমরা ভেবেছিলাম, ক্লোন ইঁদুরটি হুবহু মূল দাতার মতোই হবে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, সাধারণ ইঁদুরের তুলনায় ক্লোন করা ইঁদুরের শরীরে তিন গুণ বেশি জিনগত মিউটেশন বা ত্রুটি তৈরি হয়। স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি ও ক্লোনিং পদ্ধতির নিজস্ব ত্রুটির কারণেই এমনটা হতে পারে।’

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক