পাল্টে গেল পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিসিওএস রোগের নাম, কেন নতুন নাম এল
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস) রোগটি বিশ্বব্যাপী চেনা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একমত হয়ে পাল্টে ফেলেছেন এ রোগের নাম। নতুন নাম হলো পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিএমওএস)।
এটি আদতে রোগটি সম্পর্কে এক নতুন বোঝাপড়া। কারণ, শুধু নাম বদলায়নি, বদলেছে এই রোগ সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গভীর উপলব্ধি। নতুন নামটি স্পষ্ট করে নির্দেশনা দিচ্ছে, এটি কেবল ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়; এটি শরীরের একাধিক হরমোন গ্রন্থি এবং বিপাকক্রিয়ার (মেটাবলিজম) সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল পরিস্থিতি। এতে রোগটির বিস্তার ও চিকিৎসার পরিধি আরও উন্মুক্ত হয়।
পিএমওএস আদতে কী
এটি নারীর একটি হরমোনজনিত ও বিপাকীয় সমস্যা, যা সাধারণত কিশোরী বয়স থেকে শুরু হয়ে সারা জীবন প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় ১ থেকে ২ জন এ সমস্যায় আক্রান্ত।
অধিকাংশ নারী জানেনই না যে তাঁরা এই রোগে ভুগছেন। এই রোগে হরমোনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কারণ, পিএমওএস মূলত একটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতার রোগ। এতে একসঙ্গে একাধিক হরমোন অস্বাভাবিক আচরণ করে।
১. অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন)
নারীর শরীরে এই হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে মুখে ও শরীরে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ ও মাথার চুল পড়া শুরু হয়।
২. ইনসুলিন
পিএমওএস থাকলে শরীর ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, এটিকে বলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। ফলে রক্তে শর্করা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
৩. এলএইচ ও এফএসএইচ
পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এই দুটি হরমোনের অসামঞ্জস্যের কারণে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু ঠিকমতো নির্গত হয় না বা ডিম্বস্ফুরণ হয় না। মাসিক অনিয়মিত হয় এবং গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দেয়।
৪. থাইরয়েড ও প্রোল্যাকটিন
এই হরমোনগুলোর ভারসাম্যহীনতাও অনেক সময় পিএমওএসের সঙ্গে জড়িত থাকে, যা রোগনির্ণয়কে আরও জটিল করে তোলে।
এই বহুমাত্রিক হরমোনের সমস্যার কারণেই রোগটির নতুন নামে ‘পলিএন্ডোক্রাইন’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে, যার অর্থ একাধিক অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি এতে একসঙ্গে আক্রান্ত।
কীভাবে বুঝবেন পিএমওএস
অনিয়মিত বা দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকা।
মুখে, বুকে বা পেটে অতিরিক্ত লোম।
ওজন দ্রুত বাড়া, বিশেষত পেটের চারপাশে।
ত্বকে কালো দাগ, বিশেষত ঘাড়ে বা বগলে।
ব্রণের সমস্যা।
গর্ভধারণে দেরি হওয়া।
মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি, রক্তে শর্করার অসামঞ্জস্য।
হরমোন–বিশেষজ্ঞ বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ
কেন জরুরিপিএমওএস যে কেবল একটি ডিম্বাশয়ের রোগ বা স্ত্রীরোগমাত্র, তা নয়। এটি একটি জটিল বিপাকীয় অবস্থা, নানা ধরনের হরমোন এতে জড়িয়ে আছে। এই উপলব্ধি রোগটির গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। যেহেতু এটি মূলত একটি হরমোন ও বিপাকের রোগ, তাই এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের (হরমোনবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।সঠিক উপায়ে রক্তের সংশ্লিষ্ট হরমোন পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে সঠিক কারণ নির্ণয় করা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ওজনাধিক্য, থাইরয়েড সমস্যা বা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির জটিলতা থাকলে তার সঠিক চিকিৎসা নেওয়া ও বিপাকক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এ রোগের মূল চিকিৎসা। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও বন্ধ্যত্বের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পিএমওএস নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত সমস্যা। কিন্তু বিপাকীয় ও হরমোনজনিত অসামঞ্জস্যের কারণে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও জীবনব্যাপী। এই সত্যকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে একে কেবল ডিম্বাশয়ের রোগ হিসেবে সীমিত করে রাখা ঠিক নয়। এটি কেবল মাসিক–সংক্রান্ত বা সন্তানধারণজনিত সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ও জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
ডা. মারুফা মোস্তারী, সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়